মিনহাজ-উস-সালেকীন ফাহমী
গেইম এক্স আর ও এসএএএস উদ্যোক্তা
একটি গেম প্রকাশের পর এক ধরনের বিশেষ নীরবতা নেমে আসে। মাসের পর মাস আপনি তার ভেতরেই বাস করেন। কখনও একটি চরিত্রের লাফের গতিপথ নিয়ে তর্ক করেন, কখনও রাত তিনটায় বসে মেনু নতুন করে আঁকেন, কখনও কোনো বন্ধুর নামে একটি বস চরিত্রের নাম রাখেন। তারপর গেমটি প্রকাশ করেন এবং অপেক্ষা করতে থাকেন। সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্ত হলো কোনো অচেনা মানুষের কাছ থেকে শোনা, সে সারা রাত জেগে আপনার গেম খেলেছে। আর সবচেয়ে কষ্টের মুহূর্ত হলো কয়েক দিন পর এমন কোনো ওয়েবসাইটে গেমটির ভাঙা ও বিনামূল্যের সংস্করণ খুঁজে পাওয়া, যার নামও আপনি আগে শোনেননি। আপনার জীবনের কয়েক মাসের শ্রম তখন এক টাকাও ফেরত না দিয়ে অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ গেম ডেভেলপারই এই দুই অভিজ্ঞতার সঙ্গে পরিচিত। আমরা সবসময় সৃষ্টি করতে বেশি দক্ষ ছিলাম, কিন্তু সেই সৃষ্টিকে ধরে রাখতে পারিনি। পরিসংখ্যান বলছে, এখন হওয়ার কথা ছিল আমাদের সোনালি সময়। প্রতিযোগিতামূলক গেমিংয়ে পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি মানুষ যুক্ত, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ই-স্পোর্টস একটি সরকারি স্বীকৃত খেলাধুলা, বাজার বছরে ১০ শতাংশেরও বেশি হারে বাড়ছে, আর পেছনে রয়েছে ২০০৩ সালের ঢাকা রেসিং থেকে শুরু হওয়া একটি ইতিহাস।
তাহলে আমরা বাজারমূল্যের বিচারে ১০০ দেশের মধ্যে ৬১তম স্থানে কেন? ভারত যেখানে এক দশকে ২৫টি গেম স্টুডিও থেকে ২৫০টিতে পৌঁছেছে, সেখানে আমরা কেন আমাদের স্টুডিওগুলো দুই হাতের আঙুলে গুনেছি? কারণ আমরা প্রতিভা তৈরি করেছি, কিন্তু সেই প্রতিভার জন্য প্রয়োজনীয় ঘর তৈরি করতে ভুলে গেছি।
সবচেয়ে মৌলিক অনুপস্থিতি দিয়েই শুরু করা যাক। বাংলাদেশের একটি বিশ্ববিদ্যালয়েও গেম ডেভেলপমেন্টকে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাবিষয় হিসেবে পড়ানো হয় না। একটিও নয়। আমি নিজে সহ আমার পরিচিত প্রত্যেক ডেভেলপার ইউটিউব টিউটোরিয়াল দেখে এবং বারবার ব্যর্থ হওয়ার জেদ থেকে এই দক্ষতা অর্জন করেছে। আমরা প্রতিভা তৈরি করি মরুভূমিতে ফুল ফোটার মতো, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে, কিন্তু কখনোই বৃহৎ পরিসরে নয়।
ফিনল্যান্ড অ্যাংরি বার্ডস ও ক্ল্যাশ অব ক্ল্যানস তৈরি করেছে বাস্তব পাঠ্যক্রম, গবেষণাগার এবং শিক্ষকদের ভিত্তিতে। আর আমরা প্রতি বছর প্রায় ৫০ হাজার কম্পিউটার বিজ্ঞান ও চারুকলার স্নাতককে কর্মবাজারে পাঠাই, অথচ তাদের জন্য “গেমস” লেখা কোনো দরজাই খোলা থাকে না। যারা তবুও এই জগতে প্রবেশ করতে চায়, তাদের অনেকেই শেষ পর্যন্ত চলে যায় নিরাপদ সফটওয়্যার চাকরিতে বা অন্য দেশে।
এরপর আসে চুরির প্রসঙ্গ। দেশে ব্যবহৃত ব্যবসায়িক সফটওয়্যারের প্রায় ৯০ শতাংশই পাইরেটেড, আর গেমও সেই সংস্কৃতির শিকার। একটি স্টুডিও মাসের পর মাস সময় ব্যয় করে একটি গেম তৈরি করে, তারপর দেখে সেটি আয় করার আগেই নকল হয়ে গেছে। ফলে ডেভেলপাররা বিদেশি বাজারের জন্য কাজ করে, অথবা একসময় গেম বানানোই বন্ধ করে দেয়। বেরিয়ে যাওয়ার পথও ছিল রুদ্ধ। ব্যাংকগুলো গেমকে ব্যবসা হিসেবে বোঝে না, ফলে বিনিয়োগ চলে যায় আউটসোর্সিং খাতে। ২০১৭ সালের আগে পর্যন্ত গুগল বাংলাদেশি ডেভেলপারদের প্লে স্টোর অ্যাকাউন্ট খোলার সুযোগও দেয়নি। আমরা একটি পুরো প্রজন্মকে শিখিয়েছি, এই দেশে কিছু তৈরি করা মানে ভদ্রভাবে লুট হওয়ার ঝুঁকি নেওয়া।
এসবের কোনোটিই প্রতিভার সংকট নয়। আমাদের শিল্পী ও প্রোগ্রামাররা বিশ্বের যেকোনো দেশের মানুষের সঙ্গে সমানতালে প্রতিযোগিতা করতে পারে। সমস্যা হলো কাঠামোগত, আর সমাধানও জানা। অন্তত পাঁচটি বিশ্ববিদ্যালয়ে গেম ডেভেলপমেন্টকে পূর্ণাঙ্গ ডিগ্রি হিসেবে চালু করতে হবে। ডিজিটাল সৃষ্টিকর্মের জন্য মেধাস্বত্ব আইনকে ওষুধ ও তৈরি পোশাক শিল্পের মতো কঠোরভাবে কার্যকর করতে হবে। এমন একটি জাতীয় তহবিল গড়ে তুলতে হবে, যার আকার যথেষ্ট বড় এবং যার পরিচালনায় থাকবে পণ্যটি সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞানসম্পন্ন মানুষ।
বয়সভিত্তিক রেটিং, ইন-অ্যাপ ক্রয়ব্যবস্থা, এবং ই-স্পোর্টস কোথায় শেষ হয়ে জুয়া কোথায় শুরু হয় সে বিষয়ে স্পষ্ট আইনি কাঠামো দরকার। একক জানালা সেবা চালু করতে হবে, যাতে বিদেশি বিনিয়োগ দীর্ঘ প্রশাসনিক প্রক্রিয়ায় আটকে না যায়। গেমিংকে অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত শিল্পখাত হিসেবে স্বীকৃতি দিতে হবে এবং আউটসোর্সিং খাতকে দেওয়া প্রণোদনার আওতায় আনতে হবে।
আমি একসময় এই শিল্প গড়ে তোলার কাজ করেছি একেবারে শূন্য থেকে। তখন কোনো সংগঠন ছিল না, কোনো নিয়মিত মিলনমেলা ছিল না, পরামর্শ নেওয়ার মতো মানুষও ছিল না। আমরা আইজিডিএ বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি, দেশের বৃহত্তম গেম ডেভেলপার মিটআপ আয়োজন করেছি, প্রতিভাদের সামনে নিয়ে এসেছি। আমি এমনকি একজন বাংলাদেশি লেখকের লেখা প্রথম গেম ডেভেলপমেন্টবিষয়ক বইও লিখেছিলাম, যদিও কয়েক মাস পর জানতে পেরেছিলাম সেটি সত্যিই প্রথম ছিল। কেউ হিসাব রাখছিল না। এই একটি তথ্যই অনুপস্থিত অর্ধেক গল্পকে স্পষ্ট করে দেয়।
খেলোয়াড় তৈরি করা ছিল প্রথম নির্মাণ, আর সেটিই ছিল সহজ অংশ। দ্বিতীয় নির্মাণ হলো সেই ঘর, যেখানে প্রতিভা টিকে থাকবে, উপার্জন করবে এবং নিজের সৃষ্টির মালিকানা ধরে রাখতে পারবে। খেলোয়াড় আমরা তৈরি করেছি। এখন গড়ে তুলতে হবে সেই ভিত্তি, যা দীর্ঘস্থায়ী হবে।
