জুনায়েদ হাবিব
ইউনিভার্সিটি অব মিডলসেক্স
আমাদের পায়ের নিচে, নীরবে বদলে যাচ্ছে পৃথিবীর ভারসাম্য। যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসার জেট প্রপালশন ল্যাবরেটরির বিজ্ঞানীরা পৃথিবীর ভরকেন্দ্র, অর্থাৎ যে বিন্দুকে ঘিরে পৃথিবীর মহাকর্ষীয় আকর্ষণ কাজ করে, তা নির্ণয়ের পদ্ধতিকে আরও নিখুঁত করেছেন। তাঁদের গবেষণায় দেখা গেছে, পৃথিবীতে পানি, বরফ ও বায়ুর বৈশ্বিক বণ্টন বদলানোর সঙ্গে সঙ্গে ভরকেন্দ্রও প্রতিবছর কয়েক মিলিমিটার করে সরে যায়। প্রতি মার্চে উত্তর আমেরিকার তুষার পৃথিবীর ভরকেন্দ্রকে সামান্য উত্তরের দিকে ঠেলে দেয়, এপ্রিল মাসে আমাজন অববাহিকার বৃষ্টির পানি তাকে দক্ষিণমুখী করে, আর নভেম্বরের দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মৌসুমি বায়ু ও বৃষ্টিপাতও পৃথিবীর ভারসাম্যে নিজস্ব টান তৈরি করে।
শুনতে বিষয়টি নিছক ভূপরিমাপবিদ্যার জটিল আলোচনা মনে হতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের মতো নিচু বদ্বীপভূমির দেশের জন্য এমন সূক্ষ্ম পরিমাপ কোনো একাডেমিক কৌতূহলের বিষয় নয়। বন্যার পূর্বাভাস, উপগ্রহভিত্তিক উচ্চতা মানচিত্র এবং পলি জমে প্রতিনিয়ত বদলে যাওয়া ভূখণ্ড উষ্ণ পৃথিবীর ভবিষ্যতে কীভাবে টিকে থাকবে, তা বোঝার পেছনে এই পরিমাপের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
পানি ও উচ্চতাই যে দেশের পরিচয়
গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদীর বিস্তৃত অববাহিকার নিম্নাঞ্চলজুড়ে বাংলাদেশের অবস্থান। পৃথিবীর অন্যতম বৃহৎ বদ্বীপ গড়ে উঠেছে এই নদীব্যবস্থাকে ঘিরে। দেশের ৮০ শতাংশের বেশি ভূমি সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ১০ মিটার বা তারও কম উচ্চতায় অবস্থিত। দক্ষিণের উপকূলীয় অঞ্চলের অনেক জায়গা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে মাত্র এক বা দুই মিটার ওপরে। ফলে পৃথিবীর ভরকেন্দ্রকে ভিত্তি ধরে উচ্চতা পরিমাপ ও তথ্যের সমন্বয় করার মতো নাসার গবেষণায় ব্যবহৃত উপগ্রহ প্রযুক্তির গুরুত্ব বাংলাদেশের ক্ষেত্রে সরাসরি প্রাসঙ্গিক।
ভরকেন্দ্র নির্ধারণে সামান্য ভুলও বাংলাদেশের উপকূলরেখা সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কতটা কাছাকাছি, তা মানচিত্রে দেখানোর ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য তৈরি করতে পারে। সমুদ্রপৃষ্ঠ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে প্লাবনের পূর্বাভাস দেওয়ার ক্ষেত্রে এই সামান্য ব্যবধানও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। বরফ গলে যাওয়া এবং সমুদ্রের পানির বণ্টনে পরিবর্তনের মতো যে প্রক্রিয়াগুলো পৃথিবীর ভরের বণ্টন বদলে দিচ্ছে, সেগুলোই সমুদ্রপৃষ্ঠ বৃদ্ধির সঙ্গে যুক্ত। ফলে বাংলাদেশের জন্য এই হিসাব নিছক বৈজ্ঞানিক কৌতূহল নয়, বরং কোথায় কতটা পানি উঠতে পারে, তা বুঝে ভবিষ্যৎ প্রস্তুতি নেওয়ার প্রশ্ন।
যে নদী জীবন দেয়, সেই নদীই কেড়ে নেয়
বাংলাদেশের উর্বর সমভূমি গড়ে দিয়েছে যে তিনটি বৃহৎ নদী, মৌসুমি অস্থিরতার প্রধান উৎসও তারাই। প্রতি বর্ষায় নাসার গবেষকেরা পৃথিবীর ভরবণ্টনের পরিবর্তনের সঙ্গে যে বায়ুমণ্ডলীয় জলীয়বাষ্পের গতিপ্রকৃতির সম্পর্ক দেখেছেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মৌসুমি বায়ুর সঙ্গে যুক্ত প্রায় ৬০০ গিগাটন পানি সেই একই বৃহৎ জলচক্রের অংশ হয়ে বঙ্গোপসাগর ও হিমালয়সংলগ্ন নদী অববাহিকায় এসে জমা হয়। ফুলে ওঠে ব্রহ্মপুত্র ও গঙ্গা। একসময় নদী উপচে প্লাবিত হয় বাংলাদেশের বিস্তীর্ণ সমভূমি।
বাংলাদেশে বন্যা কোনো ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়। শত শত বছর ধরে বর্ষার বন্যা কৃষি ও মানুষের জীবনযাত্রার ছন্দের অংশ হয়ে আছে। তবে সেই ছন্দের তীব্রতা ও অনিশ্চয়তা বদলাচ্ছে। হিমালয়ের হিমবাহ গলে যাওয়া, বৃহত্তর বায়ুমণ্ডলীয় পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত মৌসুমি বৃষ্টির সময়ের পরিবর্তন, সমুদ্রের তাপমাত্রা ও পানির পরিমাণের ওঠানামা এবং বদ্বীপের মধ্য দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি ও পলি প্রবাহিত হওয়া, সবকিছু মিলেই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
নাসার মতো সংস্থার উন্নত উপগ্রহভিত্তিক পর্যবেক্ষণ এই পরিবর্তনগুলোকে আরও নির্ভুলভাবে বুঝতে এবং ভবিষ্যৎ মডেল তৈরিতে বিজ্ঞানীদের সহায়তা করতে পারে।
পলির নিচে ভূমিকম্পের প্রশ্ন
বাংলাদেশের ঝুঁকি শুধু আকাশ থেকে নামা পানিতে সীমাবদ্ধ নয়। ভারতীয় ও ইউরেশীয় ভূত্বকীয় পাতের সংযোগস্থলের কাছাকাছি বাংলাদেশের অবস্থান। দেশের আশপাশের অঞ্চল একটি সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক এলাকার নিকটে, যেখানে বড় ধরনের ভূমিকম্প সৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। গত এক দশকের বিভিন্ন গবেষণায় এই অঞ্চলের ভূগর্ভে উল্লেখযোগ্য চাপ জমে থাকার কথা উঠে এসেছে। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্পের আশঙ্কা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
সমস্যা আরও জটিল করে তুলেছে বদ্বীপের নরম ও পানিসিক্ত পলিমাটি। শক্ত শিলার ওপর গড়ে ওঠা ভূখণ্ডের তুলনায় এই ধরনের মাটি ভূমিকম্পের কম্পনকে ভিন্নভাবে বাড়িয়ে দিতে পারে। ফলে বড় ধরনের ভূমিকম্প হলে তার প্রভাব কতটা বিস্তৃত হতে পারে, তা নির্ভুলভাবে অনুমান করা কঠিন।
পৃথিবীর ভরবণ্টনে মিলিমিটার মাত্রার পরিবর্তন শনাক্ত করতে নাসার বিজ্ঞানীরা যে উচ্চনির্ভুল ভূপরিমাপ পদ্ধতি ব্যবহার করেন, তার সঙ্গে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণেরও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। উপগ্রহভিত্তিক লেজার পরিমাপ, জিপিএস নেটওয়ার্ক এবং ভূত্বকের ক্ষুদ্র পরিবর্তন পর্যবেক্ষণের মতো প্রযুক্তি ব্যবহার করে ভূমিকম্পবিদেরাও ভূগর্ভে ধীরে ধীরে জমতে থাকা চাপ ও ভূত্বকের নড়াচড়া পর্যবেক্ষণ করেন। উন্নত বৈশ্বিক ভূপরিমাপ ব্যবস্থা সেই ক্ষুদ্র পরিবর্তনগুলো শনাক্ত করা সহজ করে, যেগুলো বড় ধরনের ভূতাত্ত্বিক পরিবর্তনের আগে দেখা দিতে পারে।
ফসল, মাটি আর যাদের জীবন দুটির ওপর নির্ভরশীল
বাংলাদেশের যে নদীগুলো বন্যার ঝুঁকি তৈরি করে, তারাই আবার দেশের মাটিকে উর্বর করে তোলে। প্রতিবছরের বন্যায় নদীবাহিত পুষ্টিসমৃদ্ধ পলি প্লাবনভূমিতে ছড়িয়ে পড়ে। সেই মাটিতে ধান, পাট ও নানা ধরনের সবজি উৎপাদন হয়। ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের চেয়েও ছোট একটি ভূখণ্ডে ১৭ কোটির বেশি মানুষের জীবনযাত্রা অনেকাংশে এই মাটির ওপর নির্ভরশীল।
তবে এই উর্বরতা খুবই সূক্ষ্ম এক ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। অতিরিক্ত বন্যা কিংবা ভুল সময়ে বন্যা হলে জমিতে পুষ্টি যোগ হওয়ার বদলে দাঁড়িয়ে থাকা ফসল নষ্ট হয়ে যায়। অন্যদিকে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জোয়ারের নদী ও ভূগর্ভস্থ পানির মাধ্যমে লবণাক্ত পানি আরও ভেতরের দিকে ঢুকে পড়ছে। ফলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকায় মাটির গুণমান ধীরে ধীরে কমছে।
খুলনা ও সাতক্ষীরার কিছু এলাকায় লবণাক্ততার কারণে কৃষকেরা ধান চাষ ছেড়ে চিংড়ি চাষে ঝুঁকেছেন। সেই পরিবর্তনেরও নিজস্ব পরিবেশগত ক্ষতি রয়েছে। একই সময়ে বসবাসযোগ্য ভূমির পরিসর সীমিত হওয়ায় উচ্চ জনঘনত্ব কৃষিজমির ওপর চাপ আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। জলবায়ু ও ভূমির উচ্চতা সম্পর্কে আরও নির্ভুল মডেল তৈরি করা গেলে নীতিনির্ধারকেরা এই জনমিতিক ও পরিবেশগত চাপের পূর্বাভাস আগে থেকেই পেতে পারেন, কেবল বিপর্যয়ের পর প্রতিক্রিয়া দেখানোর ওপর নির্ভর করতে হয় না।
কেন এত সূক্ষ্ম পরিমাপ গুরুত্বপূর্ণ
পৃথিবীর ভরকেন্দ্র কীভাবে নির্ণয় করা হচ্ছে, নাসার সেই পদ্ধতির উন্নতি বরিশালের একজন কৃষক কিংবা সুন্দরবনের একজন জেলের দৈনন্দিন জীবনের বাস্তবতা থেকে অনেক দূরের বিষয় বলে মনে হতে পারে। কিন্তু যোগসূত্রটা সরাসরি। উপগ্রহভিত্তিক ভূপরিমাপের প্রতিটি অগ্রগতি বন্যার পূর্বাভাস, উপকূলভাঙন পর্যবেক্ষণ, ভূমিকম্পের ঝুঁকি নিরূপণ এবং কৃষি পরিকল্পনার মতো ক্ষেত্রগুলোকে আরও নির্ভুল করে তুলতে পারে। এসব ক্ষেত্রেই বাংলাদেশের প্রয়োজন দ্রুত বাড়ছে।
মৌসুমি বৃষ্টি, বরফ গলে যাওয়া এবং সমুদ্রের পানির বণ্টন বদলে যাওয়ার সঙ্গে পৃথিবীর ভরকেন্দ্র প্রতিবছর সামান্য করে নড়ছে। তিনটি বিশাল নদীর মিলনভূমি এবং সক্রিয় ভূতাত্ত্বিক অঞ্চলের কাছে থাকা বাংলাদেশের জন্য তাই বিজ্ঞানের এমন অগ্রগতি নজরে রাখা জরুরি। কারণ নদী, ফসল আর মানুষের ঘরবাড়ির নিচে যে মাটি, সেই মাটির বাস্তবতাকে বুঝতে যত নিখুঁত তথ্য পাওয়া যাবে, ভবিষ্যতের বাংলাদেশ সম্পর্কে পরিকল্পনাও তত বেশি বাস্তবভিত্তিক হবে।
