আরিফ রেশাদ
ইউনিভার্সিটি অব এসেক্স, যুক্তরাজ্য
রিমশা সিথির “পর্নোগ্রাফি, নীতি ও বাংলাদেশের দ্বিধা: আইন, মানসিক স্বাস্থ্য এবং নিষেধাজ্ঞার সীমাবদ্ধতা” প্রবন্ধের পরবর্তী আলোচনা, অনিকেত বুলেটিন, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সিথির প্রবন্ধে যে দ্বিধার কথা উঠে এসেছে, তার কাঠামো বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত হলেও দক্ষিণ এশিয়ার জন্য তা মোটেই একক কোনো সমস্যা নয়। বাংলাদেশ ২০১২ সালের পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এবং সাইবার আইনের আওতায় পর্নোগ্রাফিকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে গণ্য করেছে। কিন্তু ভিপিএন ও বিকল্প ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সেই নিষেধাজ্ঞা এড়িয়ে যাওয়া ঠেকাতে আইন প্রয়োগের ব্যবস্থা কার্যত দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফলে চাহিদা চলে যায় আড়ালে। সেখানে গড়ে ওঠে এমন এক অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতি, যেখানে জবরদস্তি, শোষণ এবং সম্মতি ছাড়া ছবি বা ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। একই সীমান্তের দুই দেশ বাংলাদেশ ও ভারত, যাদের ঔপনিবেশিক আইনব্যবস্থার উত্তরাধিকার এবং অনেকটাই অভিন্ন ডিজিটাল অবকাঠামো রয়েছে, সেই সমস্যার মোকাবিলায় দুই ধরনের পথ বেছে নিয়েছে।
দুই দেশের আইন পাশাপাশি রাখলে এবং অবৈধ ব্লগ ও ওয়েবসাইটে প্রচারিত যৌনসেবার বিজ্ঞাপনের মতো সংশ্লিষ্ট সমস্যাটিকেও আলোচনায় আনলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়। সামাজিক কল্যাণের ফলাফল শুধু কোনো আইন কী নিষিদ্ধ করছে তার ওপর নির্ভর করে না, আইনের পেছনে থাকা সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দৃষ্টিভঙ্গিও সেখানে বড় ভূমিকা রাখে।
একই আচরণ নিয়ে দুই আইনি দর্শন
বাংলাদেশের আইন ব্যক্তিগতভাবে পর্নোগ্রাফি দেখাকেও অপরাধের আওতায় আনে। সিথির আলোচনায় দেখা যায়, পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন এর উৎপাদন, বিতরণ ও দখলকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করেছে। এর সঙ্গে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি বিষয়ক আইন যুক্ত করেছে ওয়েবসাইট বন্ধ করার ব্যবস্থা।
ভারত তুলনামূলকভাবে সীমিত পরিসরের পথ নিয়েছে। দেশটির তথ্যপ্রযুক্তি আইনের ৬৭ ও ৬৭এ ধারায় ব্যক্তিগতভাবে প্রাপ্তবয়স্কদের পর্নোগ্রাফিক বিষয়বস্তু দেখা বা ডাউনলোড করা অপরাধ নয়। অপরাধের আওতায় পড়ে তা প্রকাশ, আপলোড বা অন্যের কাছে পাঠানো। হোয়াটসঅ্যাপের মতো মাধ্যমে এমন বিষয়বস্তু শেয়ার করলে শাস্তি হতে পারে, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে দেখা অপরাধ নয়। শুধু নিজের কাছে রাখার জন্যও শাস্তির বিধান নেই।
শিশু পর্নোগ্রাফির ক্ষেত্রে অবশ্য ব্যতিক্রম রয়েছে। সেখানে দেখাও অপরাধ, তা অন্য কারও সঙ্গে শেয়ার করা হোক বা না হোক। ভারতীয় আইনে ১৮ বছরের কম বয়সী প্রত্যেক ব্যক্তিই শিশু হিসেবে বিবেচিত।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ কাঠামোগত পার্থক্য দেখা যায়। বাংলাদেশে নিজের কাছে পর্নোগ্রাফি রাখাটাই অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। ভারতে মূলত তা অন্যের কাছে প্রকাশ বা পাঠানোর বিষয়টি অপরাধের আওতায় পড়ে। বাংলাদেশের আইনি কাঠামো ধরে নেয়, একজন ব্যক্তির নিজের যন্ত্রে কী ঘটছে, রাষ্ট্র তা নিয়ন্ত্রণ করতে পারে এবং করা উচিত। ভারতের অবস্থান, যার পেছনে দেশটির সুপ্রিম কোর্টের সাংবিধানিক গোপনীয়তার অধিকার স্বীকৃতিরও প্রভাব রয়েছে, তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। সেখানে ব্যক্তিগত ব্যবহারে রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপের সীমা বেশি, আর নিয়ন্ত্রণের জোর দেওয়া হয় বিষয়বস্তুর প্রকাশ ও প্রচারের ওপর।
আড়ালে যৌনসেবার বিজ্ঞাপন
যৌনসেবার বিজ্ঞাপনের বিষয়টি সামনে এলে দুই দেশের পার্থক্য আরও পরিষ্কার হয়। বাংলাদেশ যেভাবে পর্নোগ্রাফি নিজের কাছে রাখাকেও অপরাধ করেছে, সেই অর্থে কোনো দেশই বাণিজ্যিক যৌনসেবাকে সরাসরি একইভাবে নিষিদ্ধ করেনি।
ভারতের অনৈতিক পাচার প্রতিরোধ আইন বা আইটিপিএ যৌনকর্মকে নিজে অপরাধ হিসেবে ঘোষণা করে না। তবে পতিতালয় পরিচালনা, যৌনকর্মের আয় থেকে জীবিকা নির্বাহ এবং প্রকাশ্যে যৌনসেবার জন্য গ্রাহক খোঁজার মতো সংশ্লিষ্ট কর্মকাণ্ডকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করে। এসব অপরাধের ক্ষেত্রে পরোয়ানা ছাড়াই গ্রেপ্তারের সুযোগ রয়েছে।
অবৈধ ব্লগ ও ওয়েবসাইটে যৌনসেবার বিজ্ঞাপন দুই দেশেই অনেকটা ধূসর আইনি এলাকায় পড়ে। সরাসরি এ ধরনের বিজ্ঞাপনের বিরুদ্ধে মামলা খুব বেশি না হলেও, বাস্তবে তা রাস্তায় প্রকাশ্যে গ্রাহক খোঁজার পুরোনো পদ্ধতির ডিজিটাল রূপ হয়ে উঠেছে। পার্থক্য হলো, অনলাইনে সেই কর্মকাণ্ড আগের মতো চোখে পড়ে না, ফলে আইন প্রয়োগও কঠিন হয়ে যায়।
ভারতের একটি অধিকারকর্মী সংগঠনের তথ্যপত্রে এই ব্যবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরা হয়েছে। যৌনসেবার জন্য গ্রাহক খোঁজাকে অপরাধ হিসেবে বিবেচনা করায় যৌনকর্মীরা আইনি সুরক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের শোষণের ঝুঁকিতে আরও বেশি পড়ছেন।
বাংলাদেশের পরিস্থিতি আরও অস্পষ্ট। যৌনকর্মকে ঘিরে কার্যকর কোনো নিয়ন্ত্রক কাঠামো বা নীতিগত আলোচনা নেই বললেই চলে। ফলে অবৈধ ব্লগে যৌনসেবার বিজ্ঞাপনও একই বিস্তৃত অশ্লীলতা ও সাইবার অপরাধ আইনের আওতায় চলে যায়। সিথির আলোচনায় যেমন দেখা গেছে, ভিপিএন ব্যবহার করে এসব নিষেধাজ্ঞা পাশ কাটানো ঠেকাতেই যেখানে আইন প্রয়োগ হিমশিম খায়, সেখানে অনলাইন বিজ্ঞাপনের নিয়ন্ত্রণ আরও জটিল হয়ে পড়ে।
দুই দেশের সামাজিক বাস্তবতা কেন আলাদা
দুই দেশের আইনি ব্যবধানের পেছনে শুধু প্রযুক্তিগত সক্ষমতার পার্থক্য নেই। সামাজিক ও ধর্মীয় কাঠামোর পার্থক্যও বড় কারণ। বাংলাদেশ ধর্মীয়ভাবে তুলনামূলকভাবে সমজাতীয় একটি সমাজ। যৌনতা নিয়ে জনপরিসরের আলোচনায় ইসলামী মূল্যবোধের প্রভাবও যথেষ্ট শক্তিশালী। ফলে পর্নোগ্রাফি বা যৌনকর্মকে নিষিদ্ধ না করে নিয়ন্ত্রিত কর্মকাণ্ড হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টি আইন ও রাজনীতিতে গ্রহণযোগ্য করে তোলা কঠিন।
সিথি যে বিষয়টি তুলে ধরেছেন, তার সঙ্গে এই বাস্তবতার যোগ রয়েছে। তাঁর মতে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো কোনো দেশে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যে ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্য রয়েছে, বাংলাদেশে তেমন একক ধর্মীয় কর্তৃত্ব নেই, যার মাধ্যমে সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা বিশ্বাসযোগ্যভাবে কার্যকর করা সম্ভব। তবে একই সঙ্গে বাংলাদেশের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রবণতায় নিষেধাজ্ঞার প্রতি একটি শক্তিশালী ঝোঁক রয়েছে।
অন্যদিকে ভারতের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্য দেশটির আইনব্যবস্থাকে দীর্ঘদিন ধরে তুলনামূলকভাবে প্রক্রিয়াভিত্তিক ও অধিকারকেন্দ্রিক পথে ঠেলে দিয়েছে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠীর পাশাপাশি বড় মুসলিম জনগোষ্ঠী এবং আরও বহু ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উপস্থিতি ব্যক্তিগত আচরণ নিয়ে একক নৈতিক অবস্থানকে আইনের মাধ্যমে সবার ওপর প্রয়োগ করা কঠিন করে তোলে।
বিচারিক দর্শনের পার্থক্যও গুরুত্বপূর্ণ। ভারতের আদালতগুলো সাম্প্রতিক দশকগুলোতে গোপনীয়তার অধিকারকে সংবিধানিক অধিকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখেছে, যা ব্যক্তিগত জীবনে রাষ্ট্রের অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেয়। বাংলাদেশে বিচার বিভাগ ও আইনসভায় এর সমতুল্য কোনো সুস্পষ্ট আইনি মতবাদ গড়ে ওঠেনি। ফলে আইন প্রয়োগ করা কঠিন হলেও নিষেধাজ্ঞাই অনেক ক্ষেত্রে প্রধান নীতি হিসেবে থেকে গেছে।
সামাজিক কল্যাণের প্রশ্ন
সামাজিক কল্যাণের দৃষ্টিকোণ থেকে মূল বিষয় হলো, দুই দেশের কোনো একটি ব্যবস্থা সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। দুই কাঠামোতেই ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে, তবে সেই ক্ষতি তৈরি হয় ভিন্ন পথে।
সিথির যুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশের পদ্ধতি সাধারণ মানুষের কৌতূহল ও অপূর্ণ যৌন আকাঙ্ক্ষাকে গোপনীয়তা, অপরাধবোধ এবং এমন এক ভূগর্ভস্থ শিল্পের দিকে ঠেলে দিতে পারে, যেখানে জবরদস্তি ও শোষণের ঝুঁকি বেশি। ভারতের তুলনামূলক সীমিত নিষেধাজ্ঞা ব্যক্তিগত আচরণকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করলেও যৌনসেবা ও যৌনকর্মকে আইনি অনিশ্চয়তার মধ্যে রাখে। ফলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা মানুষদের শোষণের আশঙ্কা বাড়ে। ভারতের আইটিপিএ বিষয়ক তথ্যপত্রেও সেই ঝুঁকির কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই দেশেই সামাজিক কল্যাণকেন্দ্রিক সংস্কারের জন্য শুধু নিষেধাজ্ঞাকে নীতির প্রধান হাতিয়ার হিসেবে দেখলে চলবে না। প্রয়োজন এমন একটি নিয়ন্ত্রিত মধ্যপথ, যেখানে বাস্তবসম্মত আইনি সীমারেখার পাশাপাশি থাকবে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা, ডিজিটাল সচেতনতা এবং জবরদস্তির সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে থাকা মানুষের জন্য সুরক্ষা ব্যবস্থা।
সম্পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা কিংবা সম্পূর্ণ অবাধ অনুমোদন, কোনোটিকেই এই কঠিন কাজের বিকল্প হিসেবে দেখলে সমস্যার সমাধান হবে না।
তথ্যসূত্র:
