হাসান হামিদ
সি ইউ ই টি
ঠাকুরগাঁও প্রেস ক্লাবের নবনির্বাচিত কার্যনির্বাহী কমিটির সংবর্ধনা অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের একটি বক্তব্য বাংলাদেশের গণতন্ত্র ও গণমাধ্যমের সম্পর্ক নিয়ে দীর্ঘদিনের একটি মৌলিক ধারণাকে সামনে এনেছে। তিনি বলেছেন, “গণমাধ্যম যত শক্তিশালী হবে, গণতন্ত্রও তত শক্তিশালী হবে।”
সাংবাদিকদের প্রতি তাঁর আহ্বান ছিল, “যা সত্য, তা সত্য হিসেবে তুলে ধরতে হবে; কালোকে কালো এবং সাদাকে সাদা বলতে হবে।” পাশাপাশি তিনি স্বীকার করেছেন, রাজনীতিবিদরাও সমালোচনার ঊর্ধ্বে নন। গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের দৃষ্টিকোণ থেকে এই বক্তব্য নিঃসন্দেহে ইতিবাচক।
তবে একই সঙ্গে এই বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে আনে। বাংলাদেশে সাংবাদিকরা বাস্তবে কোন পরিবেশে কাজ করছেন এবং কোন কাঠামোগত বাধাগুলো একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী গণমাধ্যমের বিকাশে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে?
এই নিবন্ধে মন্ত্রীর বক্তব্যের অন্তর্নিহিত দর্শন বিশ্লেষণের পাশাপাশি বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যমের বাস্তব চ্যালেঞ্জগুলো নিয়ে আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
বাংলাদেশে মুক্ত গণমাধ্যমের চ্যালেঞ্জ
মুক্ত গণমাধ্যমের সবচেয়ে তাৎক্ষণিক এবং দৃশ্যমান চ্যালেঞ্জ হলো সাংবাদিকদের নিরাপত্তা। মির্জা ফখরুল নিজেও তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশের কারণে সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হয়রানির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। এই উদ্বেগ কেবল তাত্ত্বিক নয়।
বিশেষ করে রাজধানীর বাইরে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে কর্মরত সাংবাদিকরা প্রভাবশালী স্থানীয় ব্যক্তি ও গোষ্ঠীর স্বার্থের বিরুদ্ধে প্রতিবেদন প্রকাশ করলে নিয়মিতভাবে হুমকি, হামলা এবং আইনি হয়রানির মুখোমুখি হন।
বিস্তৃত ও অস্পষ্ট ভাষায় প্রণীত সাইবার অপরাধসংক্রান্ত আইনি বিধান এই চাপ আরও বাড়িয়েছে। অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের মাধ্যমে যাঁদের স্বার্থ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাঁরা অনেক সময় তথ্যের জবাব দেওয়ার পরিবর্তে আইনি ব্যবস্থাকে চাপ তৈরির মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেন।
দ্বিতীয় বড় চ্যালেঞ্জ হলো মালিকানা কাঠামো এবং বাণিজ্যিক চাপের কারণে সম্পাদকীয় স্বাধীনতার সংকোচন। বাংলাদেশের মূলধারার অনেক গণমাধ্যমের মালিকানা এমন ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর হাতে, যাদের ব্যাংকিং, আবাসন, টেলিযোগাযোগসহ বিভিন্ন খাতে ব্যবসায়িক স্বার্থ রয়েছে।
এই ধরনের আন্তঃসম্পর্ক অনেক সময় বিজ্ঞাপনদাতা, নিয়ন্ত্রক সংস্থা কিংবা রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী ব্যবসায়িক ব্যক্তিদের অসন্তুষ্ট করতে পারে এমন প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সীমাবদ্ধতা তৈরি করে। এর ফলে এক ধরনের আত্মনিয়ন্ত্রণ বা আত্মসংযমের সংস্কৃতি তৈরি হয়, যা পরিমাপ করা কঠিন হলেও গণমাধ্যম পেশার সঙ্গে যুক্ত অনেকেই এর অস্তিত্ব স্বীকার করেন।
তৃতীয় চ্যালেঞ্জ হলো নিয়ন্ত্রক অনিশ্চয়তা। মানহানি, জাতীয় নিরাপত্তা এবং অনলাইন কনটেন্ট নিয়ন্ত্রণসংক্রান্ত বিভিন্ন আইন বাংলাদেশে কার্যকর রয়েছে। কিন্তু এসব আইনের অনেক বিধান তুলনামূলকভাবে বিস্তৃত ভাষায় লেখা, যার ফলে প্রয়োগকারী সংস্থার হাতে ব্যাপক ব্যাখ্যার সুযোগ তৈরি হয়।
এ ধরনের আইনি অনিশ্চয়তা সাংবাদিক ও সম্পাদকদের মধ্যে ভীতি তৈরি করে। আইনের সীমারেখা কোথায়, তা নিয়ে অনিশ্চিত থাকলে অনেকেই ঝুঁকিপূর্ণ অনুসন্ধানী প্রতিবেদন থেকে সরে আসেন, যাতে মামলা বা আইনি জটিলতার মুখোমুখি হতে না হয়।
সম্প্রতি বাংলাদেশের তথ্য সুরক্ষা আইন নিয়েও যে আলোচনা হয়েছে, তা দেখিয়েছে, কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে তৈরি নিয়ন্ত্রক কাঠামো কখনো কখনো অনিচ্ছাকৃতভাবে সাংবাদিকতার অনুসন্ধানী কার্যক্রম সীমিত করতে পারে।
সাংবাদিকতার অর্থনৈতিক দুর্বলতাও একটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত সমস্যা। কম বেতন, চুক্তিভিত্তিক চাকরি এবং পেশাগত সুরক্ষার অভাব অনেক সাংবাদিককে রাজনৈতিক প্রভাব ও সম্পাদকীয় চাপের কাছে দুর্বল করে তোলে। যখন একজন সাংবাদিকের জীবিকা ক্ষমতাশালী ব্যক্তিদের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার ওপর নির্ভর করে, তখন স্বাধীন সাংবাদিকতা অনেকের জন্য কঠিন হয়ে পড়ে।
মির্জা ফখরুলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য ছিল, মানুষকে তার পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়, বরং তার কাজের ভিত্তিতে মূল্যায়ন করা উচিত। এই বক্তব্য বাংলাদেশের গণমাধ্যমে বিদ্যমান রাজনৈতিক মেরুকরণের বিষয়টিকেও সামনে আনে।
ঐতিহাসিকভাবে গণমাধ্যমের কিছু অংশ রাজনৈতিক অবস্থানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত থেকেছে। এর ফলে পুরো পেশার ওপর সাধারণ মানুষের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ক্ষমতাসীনদের জন্য সমালোচনামূলক প্রতিবেদনকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করা সহজ হয়েছে।
করণীয় ও নীতিগত পদক্ষেপ
এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবিলায় আইনি সংস্কার, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা এবং পেশাগত উন্নয়নকে সমন্বিতভাবে এগিয়ে নিতে হবে।
প্রথমত, গণমাধ্যম সম্পর্কিত আইনি কাঠামোর পুনর্মূল্যায়ন প্রয়োজন। এমন সব বিধান সংশোধন করতে হবে, যেগুলো অতিরিক্ত বিস্তৃত হওয়ায় সাংবাদিকদের হয়রানির সুযোগ তৈরি করে। সাংবাদিকদের তথ্যসূত্রের গোপনীয়তা রক্ষার জন্য নির্দিষ্ট আইনি সুরক্ষা এবং গণমাধ্যমকর্মীদের বিরুদ্ধে মানহানি ও সাইবার অপরাধের মামলা করার ক্ষেত্রে উচ্চতর যাচাই ব্যবস্থা চালু করা হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার ওপর আইনের অপব্যবহার কমবে।
দ্বিতীয়ত, সাংবাদিকদের ওপর হামলা ও হুমকির ঘটনা তদন্ত এবং বিচারের জন্য একটি স্বাধীন ব্যবস্থা প্রয়োজন। সাংবাদিকদের ওপর হামলার ঘটনায় নিয়মিত জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে অপরাধীদের মধ্যে এক ধরনের দায়মুক্তির সংস্কৃতি তৈরি হয়।
একটি স্বতন্ত্র, পর্যাপ্ত অর্থায়নপ্রাপ্ত এবং কার্যকর প্রতিষ্ঠান, যা বিদ্যমান রাজনৈতিক চাপের সম্ভাব্য প্রভাব থেকে মুক্ত থাকবে, এই বার্তা দিতে পারে যে গণমাধ্যমের ওপর আক্রমণ কেবল একটি পেশাগত ঝুঁকি নয়, বরং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ওপর আক্রমণ।
তৃতীয়ত, গণমাধ্যমের মালিকানা কাঠামোতে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার জন্য আরও শক্তিশালী নিয়ম প্রয়োজন। যেসব ব্যবসায়িক গোষ্ঠীর গণমাধ্যমের বাইরে বিভিন্ন খাতে স্বার্থ রয়েছে, তাদের সম্পাদকীয় সিদ্ধান্তে প্রভাবের মাত্রা প্রকাশ ও সীমিত করার জন্য কার্যকর নীতিমালা প্রণয়ন করা যেতে পারে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ে মালিকানা স্বচ্ছতা ও ক্রস ওনারশিপ নিয়ন্ত্রণের যেসব মডেল রয়েছে, বাংলাদেশের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সেগুলো বিবেচনা করা যেতে পারে।
চতুর্থত, সাংবাদিকতার পেশাগত ভিত্তি শক্তিশালী করতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। টেকসই কর্মসংস্থান কাঠামো, প্রশিক্ষণ, নৈতিক সাংবাদিকতার মানদণ্ড এবং স্বনিয়ন্ত্রিত পেশাগত প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হলে সাংবাদিকতার স্বাধীনতা আরও শক্তিশালী হবে।
মির্জা ফখরুলের বক্তব্যের মূল বক্তব্য সঠিক: গণতন্ত্রের সাফল্য অনেকাংশে নির্ভর করে গণমাধ্যমের শক্তির ওপর। তবে শক্তিশালী গণমাধ্যম কেবল আহ্বান বা বক্তব্যের মাধ্যমে তৈরি হয় না। এর জন্য প্রয়োজন এমন একটি আইনি, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবেশ, যেখানে সাংবাদিকরা নির্ভয়ে কাজ করতে পারেন। নির্ভীক সাংবাদিকতা মানে বিবেচনাহীনতা নয়। বরং সত্য অনুসন্ধান, দায়িত্বশীলতা এবং জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকারের মধ্য দিয়েই একটি স্বাধীন গণমাধ্যম গড়ে ওঠে।
মন্ত্রীর বক্তব্য তাই শুধু প্রশংসার দাবি রাখে না, এর বাস্তবায়নের জন্য কার্যকর পদক্ষেপও প্রয়োজন।
