অ্যাডভোকেট রেজাউল আলম
হোসেন চেম্বার্স, ঢাকা
বাংলাদেশে ডিজিটাল অধিকার নিয়ে আলোচনা আবারও নতুন মোড় নিয়েছে। ২০২৬ সালের ১৩ জুলাই ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক মন্ত্রী ঘোষণা দেন যে, সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছে, যাতে আন্তর্জাতিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মানহানিকর কনটেন্ট অপসারণে বাধ্য হয়। এ লক্ষ্যে পাঁচ সদস্যের একটি মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করা হয়েছে, যারা প্রস্তাবিত সংশোধনগুলো পর্যালোচনা করবে।
সরকারের ঘোষিত উদ্দেশ্য হলো ব্যক্তির সুনাম রক্ষা করা। কিন্তু আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, এই সংশোধন কি সত্যিই নাগরিকের অধিকার সুরক্ষিত করবে, নাকি ভিন্নমত দমনের জন্য আরও কার্যকর একটি আইনি কাঠামো তৈরি করবে? এই নিবন্ধে সেই প্রশ্নের উত্তর অনুসন্ধানের চেষ্টা করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংস্কারে কী রয়েছে
প্রস্তাবিত সংশোধনের অন্যতম লক্ষ্য হলো ইউটিউব, টিকটকসহ আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সময়সীমাভিত্তিক কনটেন্ট অপসারণ চুক্তি করা। মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, জাতীয় নিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা বা ধর্মীয় অনুভূতির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ক্ষতিকর কনটেন্ট সরিয়ে নিতে এসব প্ল্যাটফর্ম ইতোমধ্যে কিছু ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে। তবে ব্যক্তিগত মানহানির অভিযোগে কনটেন্ট অপসারণের ক্ষেত্রে সেই সহযোগিতা তুলনামূলকভাবে সীমিত।
এই ব্যবধান দূর করতে নতুন আইনে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার মাধ্যমে তৈরি বা সম্পাদিত মানহানিকর কনটেন্ট প্রচারকে স্পষ্টভাবে ফৌজদারি অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রয়েছে এবং এ ধরনের অপরাধের জন্য আরও কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হবে।
একই সঙ্গে প্রথমবারের মতো আইনে মানহানির একটি সুস্পষ্ট সংজ্ঞা যুক্ত করার পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রকে বিভ্রান্ত করা কিংবা ক্ষতিগ্রস্ত করার উদ্দেশ্যে ইচ্ছাকৃতভাবে মিথ্যা, বিকৃত বা বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানোর বিষয়ও আইনের আওতায় আনা হবে।
এই বিধান কার্যকর করতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং অন্যান্য অনুমোদিত সংস্থাকে কনটেন্ট ব্লক করা ও সরাসরি প্ল্যাটফর্মগুলোর কাছে ব্যবহারকারীর তথ্য চাওয়ার ক্ষমতা দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।
অতীতের অভিজ্ঞতার ভার
বাংলাদেশে ডিজিটাল আইন প্রয়োগের ইতিহাস স্বাভাবিকভাবেই সতর্কতার দাবি জানায়। ২০১৮ সালের ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আওতায় ২০১৮ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে সাড়ে চার হাজারেরও বেশি মানুষের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। তাঁদের মধ্যে অন্তত ৩৯৬ জন সাংবাদিক ছিলেন, যাঁদের বিরুদ্ধে ২২২টি নথিভুক্ত মামলা দায়ের করা হয়।
রাজনীতিবিদ, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক এবং সাধারণ নাগরিকের বিরুদ্ধেও অনলাইন মতপ্রকাশের কারণে মামলা হয়েছে, যদিও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার মানদণ্ড অনুযায়ী এসব বক্তব্যের অনেকটাই সুরক্ষিত মতপ্রকাশের আওতায় পড়ে। পরবর্তীতে ২০২৩ সালে প্রণীত সাইবার নিরাপত্তা আইনও দেশীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষকদের কাছে কঠোর ও দমনমূলক আইন হিসেবে সমালোচিত হয়।
২০২৫ সালের মে মাসে অন্তর্বর্তী সরকার সেই আইন বাতিল করে সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশ জারি করে। সেখানে অনলাইন হয়রানি মোকাবিলায় কিছু ইতিবাচক সুরক্ষা যুক্ত হলেও কনটেন্ট অপসারণ, অনলাইন বক্তব্যের জন্য ফৌজদারি শাস্তি এবং নজরদারিসংক্রান্ত বেশ কিছু বিতর্কিত বিধান বহাল রাখা হয়। প্রতিটি নতুন আইনই সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নিয়ে এসেছে, কিন্তু প্রতিবারই রাষ্ট্রের ডিজিটাল মতপ্রকাশ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মূলত অক্ষুণ্ন থেকেছে।
নাগরিকের কোন অধিকার ঝুঁকিতে
সবচেয়ে বড় ঝুঁকির মুখে রয়েছে মতপ্রকাশের স্বাধীনতা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সম্প্রতি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে মানহানিকর বক্তব্য অনেক সময় মতপ্রকাশের স্বাধীনতার আড়ালে ছড়িয়ে পড়ছে। এই ধরনের বক্তব্যের মাধ্যমে জনস্বার্থে করা সমালোচনা এবং মানহানিকে এক কাতারে ফেলার আশঙ্কা তৈরি হয়, যদিও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইন এই দুই বিষয়কে স্পষ্টভাবে পৃথক করে।
জনপ্রতিনিধি ও উচ্চপদস্থ সরকারি ব্যক্তিদের সাধারণ নাগরিকের তুলনায় বেশি মাত্রার সমালোচনা সহ্য করার দায়িত্ব রয়েছে। ব্যক্তিগত সুনাম রক্ষার দায়িত্ব পালনের নামে রাষ্ট্র নাগরিকের জবাবদিহি নিশ্চিত করার অধিকার সীমিত করতে পারে না। প্রস্তাবিত আইনে মানহানির সংজ্ঞা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর কনটেন্টকে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার ভাষাও যথেষ্ট স্পষ্ট নয়।
‘বিভ্রান্তিকর তথ্য’ বা ‘মিথ্যা তথ্য’র মতো বিস্তৃত শব্দগুচ্ছ আইন প্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যাপক বিবেচনার সুযোগ দেয়। রাষ্ট্র যদি এককভাবে নির্ধারণ করে কোন বক্তব্য বিভ্রান্তিকর, এবং সেই সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে ফৌজদারি শাস্তি আরোপ করা হয়, তাহলে প্রকৃতপক্ষে সুরক্ষার চেয়ে আত্মনিয়ন্ত্রণের সংস্কৃতি তৈরি হবে। বিশেষ করে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা এবং রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
ব্যবহারকারীর তথ্য সংগ্রহ এবং আদালতের অনুমতি ছাড়াই কনটেন্ট ব্লক করার ক্ষমতা নিয়েও গুরুতর উদ্বেগ রয়েছে। বাংলাদেশের সংবিধান ব্যক্তি যোগাযোগ ও পত্রালাপের গোপনীয়তার নিশ্চয়তা দেয়। আন্তর্জাতিক আইনের আলোকে যেকোনো নজরদারি বা তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে বৈধতা, প্রয়োজনীয়তা এবং আনুপাতিকতার নীতি অনুসরণ করা আবশ্যক। কিন্তু নির্বাহী সংস্থাকে এককভাবে তথ্য সংগ্রহ ও কনটেন্ট অপসারণের ক্ষমতা দেওয়া হলে সেই সাংবিধানিক সুরক্ষা দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।
স্বাধীন ও কার্যকর আপিল ব্যবস্থার অভাবও আরেকটি বড় উদ্বেগ। যদি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কোনো কনটেন্ট সরিয়ে ফেলা হয় এবং পরে ব্যবহারকারীকে প্রমাণ করতে হয় যে তাঁর বক্তব্য বৈধ ছিল, তাহলে বিচারিক প্রক্রিয়ার মৌলিক নীতি উল্টে যায়। এমন পরিস্থিতিতে নাগরিককে নিজের বক্তব্যের বৈধতা প্রমাণ করতে হয়, অথচ রাষ্ট্রকে তার দমনমূলক পদক্ষেপের যৌক্তিকতা প্রমাণ করতে হয় না।
কী পরিবর্তন জরুরি
এই সংশোধন সত্যিকার অর্থে নাগরিকের স্বার্থ রক্ষা করতে চাইলে কয়েকটি বিষয় নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
প্রথমত, মানহানির সংজ্ঞায় ব্যক্তিগত ক্ষতি এবং জনস্বার্থে সরকারি ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের সমালোচনার মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য থাকতে হবে। জনপ্রতিনিধিদের সমালোচনার ক্ষেত্রে আইনি সুরক্ষা আরও শক্তিশালী হওয়া উচিত। দ্বিতীয়ত, অনলাইন বক্তব্যের জন্য ফৌজদারি শাস্তির পরিবর্তে দেওয়ানি প্রতিকারের ব্যবস্থা গুরুত্ব পাওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে এমন সুপারিশ করে আসছে।
তৃতীয়ত, কোনো কনটেন্ট অপসারণের আগে আদালতের অনুমোদন বাধ্যতামূলক হওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত যেকোনো ব্যবহারকারীর জন্য স্বাধীন, স্বচ্ছ এবং কার্যকর আপিল ব্যবস্থা থাকতে হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সম্পর্কিত বিধানও এমনভাবে প্রণয়ন করতে হবে, যাতে কেবল ইচ্ছাকৃতভাবে প্রতারণামূলক কনটেন্টের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া যায়। ব্যঙ্গ, রম্যরচনা, প্যারোডি কিংবা সৃজনশীল শিল্পকর্ম কোনোভাবেই এই বিধানের আওতায় পড়া উচিত নয়।
রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ব্যবহারকারীর তথ্য চাওয়ার ক্ষেত্রেও আদালতের পরোয়ানা বাধ্যতামূলক হওয়া উচিত এবং সেই ক্ষমতা কেবল গুরুতর অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এত গুরুত্বপূর্ণ আইন সংশোধনের আগে প্রকৃত অর্থে সংসদীয় বিতর্ক এবং জনপরামর্শ নিশ্চিত করতে হবে। তড়িঘড়ি করে আইন প্রণয়নের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক পর্যালোচনার সুযোগ সীমিত করা উচিত নয়।
বাংলাদেশে ডিজিটাল আইন সংস্কারের ইতিহাসে বহুবার সুরক্ষার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে মতপ্রকাশের পরিসর সংকুচিত হয়েছে। অনলাইনে কথা বলা, প্রশ্ন তোলা এবং ভিন্নমত প্রকাশ করা রাষ্ট্রের অনুগ্রহ নয়; সংবিধানপ্রদত্ত নাগরিক অধিকার। সেই বাস্তবতা উপেক্ষা করে কোনো সংস্কার টেকসই হতে পারে না। বরং অতীতের পুনরাবৃত্তিই ঘটবে।
