নীলেশ হালদার
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
সম্প্রতি বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমিতে শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী আলোকচিত্র প্রদর্শনী ‘রাইজিং হিলস, বিয়ন্ড দ্য ফ্রেম’। পার্বত্য চট্টগ্রামের আদিবাসী জনগোষ্ঠীর দৈনন্দিন জীবন, অর্থনৈতিক সংকট ও ঘুরে দাঁড়ানোর সংগ্রাম উঠে এসেছে প্রদর্শনীর ছবিগুলোতে। মানুষের জন্য ফাউন্ডেশনের আয়োজনে অনুষ্ঠিত এই প্রদর্শনীতে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি, জাতিসংঘ নারী, ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিদল এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তারা অংশ নেন।
প্রদর্শনীতে বক্তারা পার্বত্য অঞ্চলের দীর্ঘদিনের সমস্যাগুলো নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন। পার্বত্য চট্টগ্রাম শান্তিচুক্তির কয়েক দশক পরও পাহাড়ি এলাকাগুলোতে দুর্বল সড়কব্যবস্থা, পানির সংকট এবং সীমিত স্বাস্থ্যসেবা মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করছে। এক আন্তর্জাতিক বক্তা বলেন, দৃশ্যভিত্তিক গল্প বলার মাধ্যমে দীর্ঘদিন উপেক্ষিত জনগোষ্ঠীর কথাও বৃহত্তর সমাজের সামনে তুলে ধরা সম্ভব।
এই একটি বক্তব্যেই আলোচনার মূল জায়গাটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বাংলাদেশে আদিবাসী সংস্কৃতি ও জনগোষ্ঠী সাধারণত মাঝেমধ্যে আয়োজিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত প্রকল্পের মাধ্যমে আলোচনায় আসে। নিয়মিত মূলধারার সাংবাদিকতায় তাদের জীবন, অধিকার ও বাস্তব সংকটের ধারাবাহিক প্রতিফলন খুব কমই দেখা যায়।
খণ্ডকালীন দৃশ্যমানতার চেনা চিত্র
বাংলাদেশের মূলধারার গণমাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠী নিয়ে সংবাদ প্রকাশের ধরন অনেকটা অনুমানযোগ্য। আন্তর্জাতিক দিবস, সাংস্কৃতিক উৎসব কিংবা ভূমি বিরোধের মতো কোনো ঘটনা ঘটলে হঠাৎ করে তাদের নিয়ে সংবাদ ও আলোচনা বেড়ে যায়। তারপর আবার পরবর্তী বড় কোনো ঘটনা না ঘটা পর্যন্ত সেই মনোযোগ প্রায় সম্পূর্ণ হারিয়ে যায়।
গণমাধ্যম বিশ্লেষণে এই ধরনের প্রবণতাকে ঘটনানির্ভর সংবাদ কাভারেজ বলা হয়। কোনো জনগোষ্ঠী তখনই সংবাদযোগ্য হয়ে ওঠে, যখন তাদের ঘিরে নাটকীয় বা আনুষ্ঠানিক কোনো ঘটনা ঘটে। অথচ তাদের জীবন, অধিকার ও বাস্তবতার ধারাবাহিক ও প্রেক্ষাপটনির্ভর সংবাদ কাভারেজ প্রয়োজন। দীর্ঘদিনের স্বাস্থ্যসেবা সংকট, শিক্ষার সুযোগের সীমাবদ্ধতা কিংবা ভূমির অধিকার নিয়ে বিরোধের মতো বিষয়গুলো নিয়ে প্রথম সংবাদ প্রকাশের পর নিয়মিত অনুসরণমূলক প্রতিবেদন খুব কমই দেখা যায়।
সম্প্রতি অনুষ্ঠিত আলোকচিত্র প্রদর্শনীও এই প্রবণতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। একটি ইতিবাচক ও প্রয়োজনীয় উদ্যোগের মাধ্যমে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বাস্তব জীবন ঢাকার বৃহত্তর দর্শকের সামনে এসেছে। কিন্তু সেই কাজটি নিয়মিত সংবাদ কাভারেজের মাধ্যমে নয়, বরং দাতা সংস্থার অর্থায়নে পরিচালিত একটি সাংস্কৃতিক কর্মসূচির মাধ্যমে সম্ভব হয়েছে।
অন্তর্ভুক্তি ও প্রতিনিধিত্বের নৈতিকতা
এই প্রবণতা গণমাধ্যমে অন্তর্ভুক্তির প্রশ্নটি সামনে নিয়ে আসে। নৈতিক সাংবাদিকতার অন্যতম দায়িত্ব হলো একটি সমাজের বৈচিত্র্যকে কেবল বিশেষ কোনো উপলক্ষের ‘রঙ’ হিসেবে নয়, বরং জাতীয় আলোচনার নিয়মিত অংশ হিসেবে তুলে ধরা।
গণমাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠী যদি মূলত সাংস্কৃতিক প্রদর্শনীর অংশ হিসেবে উপস্থিত হয়, যেমন উৎসবের ছবি, হস্তশিল্প নিয়ে প্রতিবেদন কিংবা পর্যটনকেন্দ্রিক লেখা, তাহলে তাদের জীবন্ত সমাজ হিসেবে দেখার সুযোগ সীমিত হয়ে যায়। তাদের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক উদ্বেগগুলো আড়ালে পড়ে গিয়ে তারা অনেক সময় কেবল একটি নান্দনিক পটভূমিতে পরিণত হন।
বিষয়টি সূক্ষ্ম হলেও এর প্রভাব গভীর। দর্শক ও পাঠকের মনে এমন একটি ধারণা তৈরি হতে পারে যে তারা আদিবাসী সংস্কৃতি সম্পর্কে যথেষ্ট জানেন, অথচ সেই জনগোষ্ঠী যে কাঠামোগত সমস্যার মুখোমুখি, সে সম্পর্কে তাঁদের ধারণা থেকে যায় সীমিত। গণমাধ্যমের নৈতিকতায় প্রকৃত অন্তর্ভুক্তি বলতে বোঝায় অনুপাতসম্মত ও ধারাবাহিক প্রতিনিধিত্ব। নির্দিষ্ট কোনো দিবস বা উপলক্ষে প্রতীকী স্বীকৃতি দেওয়াই যথেষ্ট নয়।
শিল্পকলা একাডেমির ভূমিকা কোথায়
চারু ও পরিবেশনশিল্পের প্রসারে দেশের জাতীয় প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির এই ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ, তবে সীমিত ভূমিকা রয়েছে। প্রদর্শনীটি আয়োজনের মাধ্যমে একাডেমি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর গল্প বলার জন্য প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও মর্যাদাপূর্ণ একটি পরিসর তৈরি করেছে। এর ফলে নীতিনির্ধারক, কূটনীতিক এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সামনে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জীবন ও বাস্তবতা তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ রাষ্ট্রীয় সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর নিয়মিত কার্যক্রমে পার্বত্য অঞ্চলের জনগোষ্ঠীর জন্য আলাদা পরিসর খুব বেশি দেখা যায় না।
তবে শিল্পকলা একাডেমির ভূমিকা মূলত সাংস্কৃতিক সংরক্ষণ ও অনুষ্ঠানকেন্দ্রিক। কোনো সহযোগী প্রতিষ্ঠান বা সংগঠন কর্মসূচির আয়োজন করলে একাডেমি সেখানে সংস্কৃতি প্রদর্শনের সুযোগ দিতে পারে। কিন্তু প্রতিদিন সংবাদমাধ্যমগুলো কীভাবে আদিবাসী বিষয়গুলো কাভার করবে, সে বিষয়ে সংবাদকক্ষগুলোর ওপর প্রভাব বিস্তারের মতো কোনো দায়িত্ব বা কাঠামো একাডেমির নেই।
তাই একাডেমির উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাংবাদিকতার কাঠামোগত পরিবর্তনের বিকল্প হতে পারে না। আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে গণমাধ্যম কীভাবে উপস্থাপন করবে, সেই পরিবর্তন সংবাদমাধ্যমের নিজস্ব নীতি ও চর্চার মধ্য থেকেই আসতে হবে।
নৈতিক নীতিমালা ও আইনে যে ঘাটতি, জরুরি মনোযোগ প্রয়োজন
আরও গভীর সমস্যাটি কোনো একক প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সমস্যা রয়েছে সেই আইনগত ও নিয়ন্ত্রণ কাঠামোর মধ্যেও, যার মাধ্যমে বাংলাদেশে আদিবাসী পরিচয় ও জনগোষ্ঠীকে গণমাধ্যমে কীভাবে বর্ণনা করা হবে, তার পরিসর নির্ধারিত হয়।
অতীতে সরকারি পরিপত্রের মাধ্যমে গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ ও সম্প্রচারমাধ্যমকে বাংলাদেশের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীকে বোঝাতে ‘আদিবাসী’ বা ‘ইন্ডিজেনাস’ শব্দ ব্যবহার না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে সংবিধানে ব্যবহৃত ‘উপজাতি’, ‘ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী’ বা ‘জাতিসত্তা’ ধরনের পরিভাষা ব্যবহারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এই অবস্থান আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের সঙ্গে সরাসরি একটি টানাপোড়েন তৈরি করে। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার কনভেনশন ১৬৯ এর মতো আন্তর্জাতিক কাঠামোতে জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় বা নিজেদের পরিচয় নিজেরা নির্ধারণ করার অধিকারকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের সাংবাদিকদের যখন কোনো জনগোষ্ঠী নিজেরা যে পরিচয় ব্যবহার করতে পছন্দ করে, সেই ভাষা ব্যবহারে কার্যত নিরুৎসাহিত করা হয়, তখন কোনো প্রতিবেদন লেখা হওয়ার আগেই পরিচয় নিয়ে নৈতিক সাংবাদিকতার পরিসর সংকুচিত হয়ে যায়।
বাংলাদেশের বিদ্যমান সংবাদপত্র ও সম্প্রচারমাধ্যমের নৈতিক নীতিমালাতেও জাতিগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠী নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের ক্ষেত্রে সাধারণ ন্যায্যতার নীতির বাইরে নির্দিষ্ট নির্দেশনা খুব সীমিত। ফলে সাংবাদিকদের জন্য ধারাবাহিক, সম্মানজনক ও যথাযথ গবেষণাভিত্তিক সংবাদ কাভারেজের সুস্পষ্ট মানদণ্ড থাকে না।
পাহাড়ি অঞ্চল ও অন্যান্য সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর কণ্ঠ যেন কেবল নির্দিষ্ট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান বা দিবসকে ঘিরে সংবাদচক্রে আসে, বরং নিয়মিত সংবাদ কাভারেজের অংশ হয়, এমন কোনো আনুষ্ঠানিক বা অনানুষ্ঠানিক সম্পাদকীয় বৈচিত্র্য নিশ্চিত করার ব্যবস্থাও নেই।
এই ঘাটতি দূর করতে অন্তত দুটি পদক্ষেপ জরুরি। প্রথমত, সংবাদমাধ্যমের জন্য বিদ্যমান নির্দেশনা সংশোধন করে জনগোষ্ঠীগুলোকে নিজেদের পছন্দের পরিচয় ও পরিভাষায় বর্ণনা করার সুযোগ দিতে হবে, যা আন্তর্জাতিক আত্মপরিচয়ের মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, জাতীয় গণমাধ্যমের নৈতিক নীতিমালায় সংখ্যালঘু ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বের জন্য নির্দিষ্ট মানদণ্ড যুক্ত করতে হবে। তাহলে তাদের নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ কোনো সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানের অনুষ্ঠানে মাঝেমধ্যে করা প্রতীকী উদ্যোগ বা দাতব্য কাজ হিসেবে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বরং তা হয়ে উঠবে সংবাদমাধ্যমের নিয়মিত সম্পাদকীয় দায়িত্বের অংশ।
বাংলাদেশের গণমাধ্যমে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি তাই শুধু কতবার তাদের নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশ করা হলো, সেই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো, তাঁদের নিজেদের কণ্ঠ, পরিচয়, অধিকার ও বাস্তব জীবনের সংকটকে জাতীয় কথোপকথনের নিয়মিত অংশ হিসেবে কতটা জায়গা দেওয়া হচ্ছে।
