ইফফাত জাহান
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
২০২৬ সালের ৮ মে পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নাকভি এবং বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় একটি সমঝোতা স্মারকে স্বাক্ষর করেন। চুক্তিটি নিয়ে প্রকাশিত সংবাদে মূল আলোচনার বিষয় ছিল মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ, কিন্তু এর অন্তর্নিহিত বার্তা ছিল ভূরাজনৈতিক।
প্রথম দৃষ্টিতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে এ ধরনের চুক্তি দুই দেশের প্রশাসনিক সহযোগিতার একটি স্বাভাবিক উদ্যোগ। প্রতিবছর বিভিন্ন দেশ এ ধরনের সমঝোতায় পৌঁছায়। কিন্তু পাকিস্তান ও বাংলাদেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে বিষয়টি এতটা সরল নয়। ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে দুই দেশের সম্পর্কের ওপর প্রভাব বিস্তার করে আসছে। ফলে একটি কারিগরি সহযোগিতা চুক্তিও এখানে বিশেষ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। এই বিশ্লেষণের উদ্দেশ্য হলো, চুক্তির ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর বাইরে গিয়ে দুই সরকারের কূটনৈতিক অভিপ্রায় এবং ভারতসহ আঞ্চলিক দেশগুলো বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে, তা পর্যালোচনা করা।
চুক্তিতে যা বলা হয়েছে
পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, মাদকদ্রব্যের অবৈধ পরিবহন ও চোরাচালান বন্ধ এবং মাদকের ক্রমবর্ধমান অপব্যবহার মোকাবিলায় দুই সরকার যৌথভাবে কাজ করবে। এ লক্ষ্যে মাদক বিক্রি ও সরবরাহের নেটওয়ার্ক ভেঙে দিতে একটি যৌথ কৌশল প্রণয়ন, মাদক কারবারিদের বিষয়ে সময়মতো গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং প্রশিক্ষণ, আধুনিক প্রযুক্তি ও কার্যকর অভিজ্ঞতা আদান-প্রদানের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ কার্যক্রম তদারকির জন্য সচিব পর্যায়ে একটি যৌথ কর্মীগোষ্ঠী গঠন করা হবে।
তবে সফরটি শুধু মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের আলোচনায় সীমাবদ্ধ ছিল না। দুই দেশের মন্ত্রীরা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা, বেসামরিক সশস্ত্র বাহিনীর প্রশিক্ষণ, সন্ত্রাসবাদ দমন, মানব পাচার, সাইবার অপরাধ, সংঘবদ্ধ অপরাধ এবং আর্থিক জালিয়াতির মতো বিষয় নিয়েও আলোচনা করেন। পুলিশ একাডেমিগুলোতে প্রশিক্ষণার্থীদের জন্য আসন বরাদ্দের বিষয়টিও আলোচনায় আসে। এ ছাড়া বাংলাদেশের সেফ সিটি প্রকল্প বাস্তবায়নে পূর্ণ সহযোগিতার আশ্বাস দেন নাকভি এবং তাঁর বাংলাদেশি প্রতিপক্ষকে পাকিস্তান সফরের আমন্ত্রণ জানান।
বর্তমান সম্পর্কের প্রেক্ষাপট
এই সমঝোতা দুই দেশের সম্পর্কের ক্রমশ উষ্ণ হয়ে ওঠার সর্বশেষ দৃষ্টান্ত। শেখ হাসিনার শাসনামলে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বেশ অস্বস্তিকর অবস্থায় ছিল। ২০২৪ সালে তাঁর ক্ষমতাচ্যুতির পর পরিস্থিতির দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। ২০২৫ সালের আগস্টে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ঢাকায় মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বৈঠক করেন। দীর্ঘ ১৪ বছর বিরতির পর দুই দেশের মধ্যে সরাসরি বিমান চলাচল পুনরায় শুরু হয়। খালেদা জিয়ার জানাজা এবং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের শপথ গ্রহণ অনুষ্ঠানেও পাকিস্তানের নেতারা অংশ নেন। আঞ্চলিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাংলাদেশের সরকারি কর্মকর্তাদের লাহোরে প্রশিক্ষণ দেওয়ার ব্যবস্থাও হয়েছে। এসব ঘটনা ইঙ্গিত দেয়, দুই দেশের সহযোগিতা এখন কূটনৈতিক যোগাযোগের গণ্ডি ছাড়িয়ে প্রশাসনিক কাঠামোতেও বিস্তৃত হচ্ছে।
তবে এই চুক্তির বাস্তব প্রয়োগের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো অভিন্ন স্থলসীমান্ত নেই। ফলে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশের যে পথগুলো সবচেয়ে সরাসরি প্রভাব ফেলে, সেগুলো ভারতের সঙ্গে স্থলসীমান্ত এবং মিয়ানমার সীমান্তকেন্দ্রিক। ঢাকা ও ইসলামাবাদের মধ্যে চুক্তি গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, প্রশিক্ষণ এবং অর্থ পাচারকারী চক্রের বিরুদ্ধে কার্যক্রম জোরদার করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের নিকটতম প্রতিবেশীদের সঙ্গে কার্যকর সহযোগিতার বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না। এ কারণে চুক্তিটির গুরুত্ব শুধু আইন প্রয়োগের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নয়, বরং রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক বার্তা দেওয়ার ক্ষেত্রেও নিহিত।
রাজনৈতিক অভিসন্ধি
পাকিস্তানের উদ্দেশ্য অনেকটাই স্পষ্ট। ইসলামাবাদ আঞ্চলিক রাজনীতিতে নিজের অবস্থান আরও শক্তিশালী করতে চায়। বাংলাদেশে এমন একটি সরকার ক্ষমতায় আসার পর, যার সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক আগের সরকারের মতো বৈরী নয়, ইসলামাবাদের সামনে নতুন সুযোগ তৈরি হয়েছে। নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সহযোগিতা এ ক্ষেত্রে একটি স্বাভাবিক সূচনা। এ ধরনের উদ্যোগের বিরোধিতা করা কঠিন, আবার এর মধ্য দিয়ে এমন প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব, যা সরকার পরিবর্তনের পরও টিকে থাকতে পারে।
বাংলাদেশের হিসাব অবশ্য কিছুটা জটিল। তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার ‘বাংলাদেশ ফার্স্ট’ নীতিকে সামনে রেখে চীন, যুক্তরাষ্ট্র, পাকিস্তান ও ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের পরিসর বাড়ানোর চেষ্টা করছে। দীর্ঘদিন ধরে ঢাকার ওপর দিল্লির বিশেষ প্রভাব থাকার পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতিতে আরও স্বাধীন অবস্থান তুলে ধরার চেষ্টাও এতে প্রতিফলিত হয়। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পৃক্ততা সেই স্বাধীন অবস্থানেরই একটি প্রকাশ। একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে যেকোনো ধরনের নতিস্বীকারের ইঙ্গিত নিয়ে সতর্ক থাকা দেশের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক মহল, বিশেষ করে ইসলামপন্থী দলগুলোর কাছেও এই উদ্যোগের তাৎপর্য রয়েছে।
তবে প্রধানমন্ত্রী ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের প্রশ্নে পাকিস্তানের সমালোচনাও করেছেন। এতে তাঁর রাজনৈতিক অবস্থানের একটি ভারসাম্যপূর্ণ দিক ফুটে ওঠে। পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ করা যেতে পারে, কিন্তু তার জন্য জাতীয় ইতিহাস ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতির সঙ্গে আপস করা যাবে না। এই দুই ধরনের বার্তার মধ্যেই তাঁর কূটনৈতিক অবস্থানের ভারসাম্য খুঁজে পাওয়া যায়। তবে এসব পদক্ষেপ কতটা সুপরিকল্পিত কৌশলের অংশ, আর কতটা রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রয়োজনে নেওয়া, তা এখনো পুরোপুরি স্পষ্ট নয়।
ভারতের অবস্থান
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের সম্পর্কের এই পরিবর্তন ভারত নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। ঢাকার সঙ্গে ইসলামাবাদের ঘনিষ্ঠতা বাড়াকে দিল্লি কৌশলগতভাবে নিজেদের জন্য একটি নেতিবাচক পরিবর্তন হিসেবে দেখছে। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ার প্রেক্ষাপটে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় সীমান্তের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তবে দুই দেশের সম্পর্ককে কেবল বৈরিতার দৃষ্টিতে দেখার সুযোগ নেই। ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী দিল্লি সফর করেছেন। ঢাকাও প্রকাশ্যে আশ্বস্ত করেছে যে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ভারতের নিরাপত্তা স্বার্থের জন্য হুমকি হবে না কিংবা দিল্লির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। এসব আশ্বাস থেকে বোঝা যায়, বাংলাদেশ প্রতিবেশীদের মধ্যে কাউকে বেছে নেওয়ার পরিবর্তে নিজের কূটনৈতিক বিকল্পগুলো বাড়াতে চাইছে।
তবে দুই দেশের সম্পর্কে বেশ কিছু অমীমাংসিত বিষয় এখনো রয়ে গেছে। শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতে অবস্থান করছেন। তিস্তার পানিবণ্টন চুক্তিও দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে আছে। ভারতের সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ এবং সীমান্তে বাংলাদেশিদের হত্যার ঘটনা বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি করে চলেছে। প্রধানমন্ত্রীর প্রথম ভারত সফরও পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। এসব বিষয় থেকে স্পষ্ট, পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক ঘনিষ্ঠ হওয়ার আগেই ঢাকা ও দিল্লির দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কে টানাপোড়েন ছিল। পাকিস্তান প্রসঙ্গের সমাধান হলেও এই অমীমাংসিত বিষয়গুলো থেকে যাবে।
সম্ভাবনা ও ভবিষ্যৎ
মাদকবিরোধী এই সমঝোতা কার্যকর থাকবে এবং ধীরে ধীরে এর পরিধি বাড়তে পারে। কারণ, দুই সরকারই এ সহযোগিতা থেকে উপকৃত হতে পারে এবং সরাসরি অন্য কোনো দেশের স্বার্থে আঘাত হানার আশঙ্কাও কম। তবে এর বৃহত্তর তাৎপর্য অনেকাংশে নির্ভর করবে ভারতের প্রতিক্রিয়ার ওপর। দিল্লি যদি এই চুক্তিকে বৃহত্তর কোনো নিরাপত্তা সমীকরণের অংশ হিসেবে দেখে, তাহলে তার সন্দেহ আরও গভীর হতে পারে। এর ফলে সীমান্ত ও পানিবণ্টন নিয়ে আগে থেকেই জটিল বিরোধগুলোর সমাধান আরও কঠিন হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, ঢাকা যদি পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ককে পুলিশি সহযোগিতা, বাণিজ্য এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির মতো বাস্তব বিষয়ে সীমাবদ্ধ রাখে এবং একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে মাদক নিয়ন্ত্রণ ও সীমান্ত নিরাপত্তায় সমপর্যায়ের সহযোগিতা গড়ে তোলে, তাহলে এই চুক্তিকে একটি ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতির অংশ হিসেবে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব।
এই ভারসাম্য রক্ষা করাই ঢাকার জন্য প্রকৃত পরীক্ষা। শেখ হাসিনার আমলের তুলনায় বাংলাদেশের সামনে এখন কূটনৈতিক বিকল্প বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে ভারতের সঙ্গে বৈরী সম্পর্ক গড়ে তোলার সুযোগ নেই, কারণ বাংলাদেশের দীর্ঘতম স্থলসীমান্ত এই দেশটির সঙ্গেই। মাদক নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো প্রতিটি সীমান্তে সহযোগিতা জোরদার করা, কেবল একটি রাজধানীতে বন্ধুত্বপূর্ণ সমঝোতায় স্বাক্ষর করা নয়। কোনো একটি সমঝোতা স্মারকের ভাষার চেয়েও সরকার কীভাবে এই কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখে, তার ওপরই নির্ভর করবে নতুন পররাষ্ট্রনীতি বাংলাদেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারবে, নাকি আঞ্চলিক সন্দেহ ও অবিশ্বাস আরও বাড়িয়ে তুলবে।
তথ্যসূত্র:
