নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
সম্প্রতি শিক্ষা বিষয়ক একটি সংবাদ আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে উঠে এসেছে। প্রকাশিত এই সংবাদটির ক্ষেত্রে আলোচনা এবং সমালোচনা দুটোই সমানভাবে জরুরী। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবনায় আরও যে বিষয়গুলো সংযুক্ত হয়েছে তা হল, অভিন্ন প্রশ্নপত্র, সিসিটিভি নজরদারি ও বিষয়সংখ্যা কমানোর ভাবনা,সংস্কারের সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। আলোচনায় প্রথম যে প্রশ্ন উঠে আসে তা হল- বছর শেষে এসএসসি-এইচএসসি পরীক্ষ নেয়ার যে সিদ্ধান্ত সেটা আসলে শিক্ষার্থীদের জন্য সময় বাঁচানোর উদ্যোগ, নাকি নতুন চাপের সূচনা?
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা একটি মৌলিক সমস্যাকে সামনে এনে দিয়েছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক উদ্যোগ, এসএসসি ও এইচএসসি পরীক্ষা প্রতিবছর ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার প্রস্তাব। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালু, পরীক্ষাকক্ষে সিসিটিভি নজরদারি এবং বিষয়সংখ্যা কমানোর মতো গুরুত্বপূর্ণ সংস্কার ভাবনা। প্রথম দৃষ্টিতে এগুলো আধুনিক, সময়োপযোগী ও প্রয়োজনীয় মনে হলেও গভীরে গেলে দেখা যায়, এই উদ্যোগ একই সঙ্গে সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জের জটিল সমীকরণ তৈরি করছে।
বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় সমালোচনা হলো এর দীর্ঘসূত্রতা। একজন শিক্ষার্থীকে এসএসসি ও এইচএসসি সম্পন্ন করতে গিয়ে কার্যত প্রায় দুই বছর সময় হারাতে হয়, যা বৈশ্বিক প্রতিযোগিতার যুগে একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। সে দিক থেকে বছর শেষে পরীক্ষা সম্পন্ন করার পরিকল্পনা শিক্ষাজীবনের গতি বাড়াতে পারে। এটি উচ্চশিক্ষায় দ্রুত প্রবেশ, কর্মক্ষেত্রে দ্রুত অংশগ্রহণ এবং সামগ্রিকভাবে মানবসম্পদের দক্ষতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। অর্থাৎ, এটি কেবল শিক্ষাগত নয়, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকেও তাৎপর্যপূর্ণ একটি পদক্ষেপ।
তবে নীতিগত এই অগ্রগতির বাস্তবায়ন কাঠামোগত সীমাবদ্ধতার মুখে পরবে এটা মোটামোটি নিশ্চিত। কারণ বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় এখনো শিক্ষকসংকট, শ্রেণিকক্ষের অতিরিক্ত চাপ, পাঠ্যক্রমের ভারসাম্যহীনতা এবং কোচিং নির্ভরতা বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে বিদ্যমান। ডিসেম্বরের মধ্যে পরীক্ষা শেষ করতে হলে পাঠ্যক্রম সম্পন্নের সময়সীমা কমে আসবে, যা শিক্ষার্থীদের ওপর চাপ বাড়াবে নিঃসন্দেহে এবং গঠনমূলক শিক্ষার পরিবর্তে দ্রুত শেষ করার প্রবণতা কে উৎসাহিত করবে।
অভিন্ন প্রশ্নপত্র চালুর প্রস্তাব মূল্যায়নে সমতা আনার লক্ষ্যে গুরুত্বপূর্ণ হলেও, এটি বাস্তবতার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। দেশের বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডে শিক্ষার মান, শিক্ষক দক্ষতা এবং অবকাঠামোর মধ্যে যে বৈষম্য রয়েছে, তা উপেক্ষা করে একক প্রশ্নপত্র প্রয়োগ করলে প্রান্তিক অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ার ঝুঁকিতে থাকবে। ফলে কাঙ্ক্ষিত সমতা প্রতিষ্ঠার বদলে নতুন বৈষম্য তৈরি হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
অন্যদিকে, পরীক্ষাকক্ষে সিসিটিভি স্থাপনের উদ্যোগ স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সহায়ক হতে পারে। নকল ও অনিয়ম রোধে এটি কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর আর্থিক ব্যয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ, বিশেষ করে গ্রামীণ ও অনুন্নত অঞ্চলের কেন্দ্রগুলোতে।
বিষয়সংখ্যা কমানোর প্রস্তাবটিও দ্বিমুখী প্রভাব ফেলতে পারে। একদিকে এটি শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমাতে সহায়ক হবে, অন্যদিকে শিক্ষার বিস্তৃতি ও বহুমাত্রিকতা সীমিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি করবে। ফলে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে কেবল পরীক্ষার চাপ নয়, সামগ্রিক শিক্ষাগত মান ও দক্ষতা উন্নয়নের বিষয়টিও বিবেচনায় নিতে হবে।
সার্বিকভাবে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের এই সংস্কার উদ্যোগ একটি প্রয়োজনীয় নীতিগত অগ্রগতি, যা সময়ের দাবি মেটাতে সহায়ক। কিন্তু বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়া না করে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি, পাইলট প্রকল্প এবং অঞ্চলভিত্তিক বৈষম্য কমানোর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে এই উদ্যোগ প্রত্যাশিত সুফল না দিয়ে উল্টো নতুন সংকটের জন্ম দিতে পারে। শিক্ষা ব্যবস্থার এই রূপান্তর তাই কেবল সময়সূচি পরিবর্তনের প্রশ্ন নয়, এটি একটি গভীর কাঠামোগত সংস্কারের সূচনা, যা সফল করতে হলে সমন্বিত ও বাস্তবভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি অপরিহার্য।
