নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতকে গত দুই দশকের অন্যতম উন্নয়ন সাফল্য হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মাতৃমৃত্যু ও শিশুমৃত্যুর হার হ্রাস, টিকাদান কর্মসূচির সম্প্রসারণ, চিকিৎসা শিক্ষার বিস্তার এবং স্বাস্থ্যসেবা অবকাঠামোর উন্নয়ন আন্তর্জাতিক মহলেও প্রশংসিত হয়েছে। কিন্তু এই সাফল্যের আড়ালে এমন একটি কাঠামোগত সংকট বিদ্যমান, যা দীর্ঘমেয়াদে স্বাস্থ্যখাতের গুণগত উন্নয়ন ও টেকসই অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করছে। সেই সংকট হলো স্বাস্থ্যখাতে বিদ্যমান লিঙ্গবৈষম্য।
বাংলাদেশে নারীরা আজ চিকিৎসা শিক্ষা, নার্সিং, জনস্বাস্থ্য এবং বিভিন্ন স্বাস্থ্যসেবা পেশায় আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি অংশগ্রহণ করছেন। তবুও সিদ্ধান্ত গ্রহণ, নেতৃত্ব, গবেষণা, উদ্যোক্তা উন্নয়ন এবং নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে তাদের উপস্থিতি এখনও সীমিত। ফলে প্রশ্ন উঠছে-স্বাস্থ্যখাতে নারীর অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেলেও কেন তাদের ক্ষমতায়ন একই হারে এগোচ্ছে না? এই প্রশ্নের সূত্র ধরে কিছু বিষয় উঠে আসে যা বিস্তারিত আলোচনার আবশ্যকতা রাখে।
সংখ্যাগত অগ্রগতি হলেও ক্ষমতায়নে বৈষম্য
বাংলাদেশে মেডিকেল কলেজগুলোতে নারী শিক্ষার্থীর উপস্থিতি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে নারী ও পুরুষ শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় সমান। উপরিভাগে এটি লিঙ্গসমতার একটি ইতিবাচক চিত্র তৈরি করে। কিন্তু পেশাগত জীবনের উচ্চস্তরে পৌঁছালে সম্পূর্ণ ভিন্ন বাস্তবতা দেখা যায়। হাসপাতালের পরিচালক, বিভাগীয় প্রধান, মেডিকেল কলেজের নীতিনির্ধারক, বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব কিংবা পেশাজীবী সংগঠনের শীর্ষ পদগুলোতে নারীদের প্রতিনিধিত্ব এখনও অত্যন্ত সীমিত।
এটি নির্দেশ করে যে সমস্যাটি নারীদের শিক্ষায় প্রবেশাধিকারের নয়; বরং ক্ষমতা, নেতৃত্ব এবং প্রভাব বিস্তারের সুযোগে বৈষম্যের। অর্থাৎ স্বাস্থ্যখাতে নারীরা অংশগ্রহণ করছেন, কিন্তু সমানভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা অর্জন করতে পারছেন না।
স্বাস্থ্যখাতে ‘গ্লাস সিলিং’-এর বাস্তবতা
নারীদের অগ্রগতির পথে অন্যতম বড় বাধা হলো তথাকথিত “গ্লাস সিলিং”, একটি অদৃশ্য সীমারেখা, যা আনুষ্ঠানিকভাবে দৃশ্যমান না হলেও বাস্তবে তাদের উচ্চপদে পৌঁছানোর পথ সংকুচিত করে। বাংলাদেশের সামাজিক কাঠামো এখনও নারীদের ওপর পারিবারিক ও গৃহস্থালি দায়িত্বের প্রধান বোঝা চাপিয়ে দেয়। একজন নারী চিকিৎসককে হাসপাতালের দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, জরুরি দায়িত্ব এবং পেশাগত উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবার, সন্তান এবং সামাজিক দায়িত্বও সামলাতে হয়। ফলে কর্মজীবনের এমন একটি পর্যায় আসে, যখন অনেক নারী উচ্চতর প্রশিক্ষণ, গবেষণা কিংবা প্রশাসনিক নেতৃত্বের সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন না। এটি ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়; বরং সামাজিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর সীমাবদ্ধতা।
উদ্যোক্তা হিসেবে বৈষম্যের শিকার
বাংলাদেশে ক্ষুদ্রঋণ, তৈরি পোশাক শিল্প এবং সামাজিক ব্যবসায় নারীদের সাফল্য আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। কিন্তু স্বাস্থ্যখাতে নারী উদ্যোক্তার সংখ্যা এখনও তুলনামূলকভাবে কম। ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার, ফার্মাসিউটিক্যাল ব্যবসা কিংবা স্বাস্থ্যপ্রযুক্তিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে প্রয়োজন মূলধন, নেটওয়ার্ক এবং প্রশাসনিক সহায়তা। বাস্তবে এসব ক্ষেত্রে নারীরা প্রায়শই বৈষম্যের মুখোমুখি হন।
অনেক আর্থিক প্রতিষ্ঠান এখনও নারী উদ্যোক্তাদের ঋণ প্রদানে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্যখাতের ব্যবসায়িক নেটওয়ার্ক, সরবরাহ ব্যবস্থা এবং বিনিয়োগ কাঠামো মূলত পুরুষ নিয়ন্ত্রিত হওয়ায় নারীদের জন্য প্রবেশ ও বিকাশের সুযোগ সীমিত হয়ে পড়ে। এর ফলে স্বাস্থ্যখাতে নতুন সেবা মডেল, রোগীকেন্দ্রিক উদ্ভাবন এবং নারীবান্ধব উদ্যোক্তা উদ্যোগের সম্ভাবনা পূর্ণভাবে বিকশিত হয় না।
পেশাগত ক্ষেত্রে বিভাজন
বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতে একটি সুস্পষ্ট লিঙ্গভিত্তিক পেশাগত বিভাজন লক্ষ্য করা যায়। নারীরা প্রধানত নার্সিং, ধাত্রীবিদ্যা ও কমিউনিটি স্বাস্থ্যসেবায় বেশি কেন্দ্রীভূত, আর পুরুষরা আধিপত্য বিস্তার করে সার্জারি, হাসপাতাল প্রশাসন, বিশেষায়িত চিকিৎসা এবং স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনায়। এই বিভাজনকে অনেক সময় স্বাভাবিক বা পছন্দভিত্তিক বলে উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবে এটি দীর্ঘদিনের সামাজিক ধারণা, পেশাগত সংস্কৃতি এবং প্রাতিষ্ঠানিক পক্ষপাতের ফল। নারী সার্জনদের ক্ষেত্রে রোগী কিংবা সহকর্মীদের আস্থাহীনতা, পদোন্নতিতে বৈষম্য এবং পেশাগত নেটওয়ার্কে সীমিত প্রবেশাধিকার এখনও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। ফলে অনেক মেধাবী নারী চিকিৎসক এমন বিশেষায়িত ক্ষেত্রগুলো থেকে দূরে সরে যান, যেখানে তাদের আরও বেশি অবদান রাখার সুযোগ ছিল।
স্বাস্থ্যসেবার মানের ওপর প্রভাব
লিঙ্গবৈষম্যের প্রভাব কেবল কর্মীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এটি সরাসরি স্বাস্থ্যসেবার মান ও কার্যকারিতার ওপরও প্রভাব ফেলে। গবেষণায় দেখা গেছে, বৈচিত্র্যময় নেতৃত্বসম্পন্ন প্রতিষ্ঠানগুলো সাধারণত বেশি উদ্ভাবনী, অধিক জবাবদিহিমূলক এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবা প্রদান করতে সক্ষম হয়। যখন স্বাস্থ্যখাতের নেতৃত্বে নারীদের উপস্থিতি কম থাকে, তখন নারী ও শিশুর স্বাস্থ্য, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, প্রজনন স্বাস্থ্য এবং লিঙ্গসংবেদনশীল সেবার মতো বিষয়গুলো পর্যাপ্ত গুরুত্ব নাও পেতে পারে। অন্যদিকে স্বাস্থ্যখাতের অর্ধেকেরও বেশি মানবসম্পদ যদি কাঠামোগত বৈষম্যের কারণে তাদের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে না পারে, তবে পুরো ব্যবস্থার দক্ষতা ও উৎপাদনশীলতাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
উপরোক্ত আলোচনার প্রেক্ষিতে সৃষ্ট এইসব বৈষম্যের যেসব ক্ষেত্রে সংশোধন বা সংস্কার প্রয়োজন, অবিলম্বে সেসব অংশে কার্যকরী এবং সুদূরপ্রসারী পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন। প্রকৃতপক্ষে স্বাস্থ্যখাতে লিঙ্গসমতা প্রতিষ্ঠার জন্য বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ নয়, বরং সমন্বিত ও কাঠামোগত সংস্কার প্রয়োজন।
প্রথমত, সরকারি ও বেসরকারি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব পর্যায়ে নারীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে সুনির্দিষ্ট প্রতিনিধিত্ব নীতি গ্রহণ করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, নারী চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য ক্যারিয়ার উন্নয়ন, গবেষণা এবং নেতৃত্ব প্রশিক্ষণ কর্মসূচি সম্প্রসারণ করতে হবে।
তৃতীয়ত, নারী স্বাস্থ্য উদ্যোক্তাদের জন্য স্বল্প সুদের ঋণ, স্টার্টআপ তহবিল এবং বিশেষ বিনিয়োগ সহায়তা চালু করা জরুরি।
চতুর্থত, কর্মক্ষেত্রে হয়রানি প্রতিরোধ, মাতৃত্ব ও পিতৃত্বকালীন ছুটি এবং শিশু যত্নসেবার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।
পঞ্চমত, চিকিৎসা শিক্ষায় লিঙ্গসমতা ও পেশাগত বৈচিত্র্য বিষয়ক পাঠ অন্তর্ভুক্ত করে ভবিষ্যৎ চিকিৎসকদের মধ্যে বৈষম্যবিরোধী দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে তুলতে হবে।
সার্বিক পর্যালোচনা শেষে যা স্পষ্ট তা হল, বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যখাতের ভবিষ্যৎ শুধু নতুন হাসপাতাল নির্মাণ, আধুনিক যন্ত্রপাতি ক্রয় বা চিকিৎসকের সংখ্যা বৃদ্ধির ওপর নির্ভর করে না। এটি নির্ভর করে স্বাস্থ্যখাত কতটা অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক এবং বৈচিত্র্যকে গ্রহণ করতে সক্ষম তার ওপর। নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো যথেষ্ট নয়; তাদের নেতৃত্ব, উদ্ভাবন এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে। কারণ লিঙ্গবৈষম্য কেবল নারীদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে না, এটি একটি দেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার সামগ্রিক অগ্রগতিকেও বাধাগ্রস্ত করে। তাই স্বাস্থ্যখাতের দীর্ঘস্থায়ী উন্নয়নের জন্য লিঙ্গসমতা কোনো সামাজিক বিলাসিতা নয়; এটি একটি উন্নয়নগত অপরিহার্যতা।
