জুনায়েদ হাবিব
মিডলসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাজ্য
সম্প্রতি দ্য ডেইলি স্টার পত্রিকায় প্রকাশিত একটি মতামতধর্মী নিবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের সাইবার আইন সংস্কারের লক্ষ্য হওয়া উচিত ডিজিটাল অধিকার রক্ষা করা, সেগুলো খর্ব করা নয়। নিবন্ধটিতে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে যে সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ সংশোধনের প্রস্তাব আগের আইনগুলোর মতোই অস্পষ্ট অপরাধের সংজ্ঞা, কঠোর শাস্তি এবং নির্বাহী বিভাগের ব্যাপক ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে পারে। মানবাধিকারের নীতির ভিত্তিতে গড়ে ওঠা এই যুক্তি যথেষ্ট গ্রহণযোগ্য।
এই নিবন্ধের উদ্দেশ্য হলো মূল লেখাটির সমালোচনামূলক পর্যালোচনা করা, এর বিশ্লেষণে যেসব ঘাটতি রয়ে গেছে সেগুলো চিহ্নিত করা এবং আইনের সংস্কারে কীভাবে সেই ঘাটতিগুলো দূর করা যায়, তা ব্যাখ্যা করা। সাইবার জগতে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা দুটিই রক্ষা করতে হলে আইনকে কীভাবে আরও কার্যকর করা যায়, সেই প্রশ্নও এখানে গুরুত্বপূর্ণ।
মূল নিবন্ধে যা উঠে এসেছে
লেখক দেখিয়েছেন, বাংলাদেশের অতীতের সাইবার আইনগুলো কীভাবে ভিন্নমতকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করার পরিসর বাড়িয়েছে, মানুষের মধ্যে স্বেচ্ছায় আত্মনিয়ন্ত্রণ ও মতপ্রকাশে ভীতি তৈরি করেছে এবং বাক্স্বাধীনতার চেয়ে সরকারের ভাবমূর্তিকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছে। অন্তর্বর্তী সরকারের সাইবার সুরক্ষা অধ্যাদেশ, ২০২৫-এ আগের কয়েকটি বিতর্কিত বিধান বাদ দেওয়া হয়েছিল। তবে প্রস্তাবিত সংশোধনীর মাধ্যমে মানহানি, অপমান ও অনলাইন হয়রানিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা, সর্বোচ্চ কারাদণ্ড পাঁচ বছর করা এবং গুজব ও অপতথ্য ছড়ানোর ক্ষেত্রে তা দশ বছর পর্যন্ত বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে বলে নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে নির্বাহী সংস্থাগুলোকে অনলাইন বিষয়বস্তু বন্ধ বা অপসারণের ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়ার কথাও রয়েছে। পাশাপাশি, কোন বিষয়বস্তু বন্ধ করা হয়েছে তা জনসমক্ষে প্রকাশ এবং তিন দিনের মধ্যে ট্রাইব্যুনালের অনুমতি নেওয়ার মতো সুরক্ষাব্যবস্থা বাদ দেওয়ার প্রস্তাব এসেছে। জাতীয় সাইবার সুরক্ষা পরিষদ থেকে জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যানকে বাদ দেওয়ার বিষয়টিও সমালোচনার মুখে পড়েছে।
নিবন্ধে যেসব সুপারিশ করা হয়েছে, সেগুলো যুক্তিসংগত। সংশোধনী থেকে ফৌজদারি মানহানির বিধান বাদ দেওয়া, অপরাধের সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট করা, সদুদ্দেশ্যে সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে অব্যাহতি নিশ্চিত করা, শাস্তির মাত্রা কমানো এবং অনলাইন বিষয়বস্তু বন্ধের ক্ষমতাকে স্পষ্ট আইনি ভিত্তির মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি, এ ধরনের সিদ্ধান্তের দায়িত্ব স্বাধীন কর্তৃপক্ষের হাতে দেওয়া, লিখিত কারণ জানানো, স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনা এবং সাংবাদিকদের সুরক্ষায় আলাদা আইন প্রণয়নের সুপারিশও রয়েছে।
অনলাইন ক্ষতির প্রকৃত শিকারদের সুরক্ষা
নিবন্ধে বলা হয়েছে, অপতথ্য, গুজব, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তু এবং অনলাইন হয়রানি মোকাবিলার প্রয়োজনীয়তার কথা উল্লেখ করে সরকার সংশোধনীর পক্ষে যুক্তি দিয়েছে। তবে এসব ক্ষতির প্রকৃত শিকারদের কীভাবে সুরক্ষা দেওয়া হবে, সে বিষয়ে নিবন্ধটিতে বিস্তারিত আলোচনা নেই।
অনলাইন হয়রানি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি ভুয়া ছবি, ভিডিও বা অডিও বাস্তব জীবনে গুরুতর ক্ষতি করতে পারে। বিশেষ করে নারী ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর সদস্যরা এমন ঘটনার শিকার হলে তাঁদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা, সামাজিক মর্যাদা ও মানসিক সুস্থতা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
আইন থেকে বিতর্কিত বিধান বাদ দেওয়ার ওপরই যদি সংস্কারের পুরো মনোযোগ সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে উদ্যোগটি একপেশে বলে মনে হতে পারে। বরং আইনে ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর প্রতিকারের ব্যবস্থা থাকা দরকার। এর মধ্যে দেওয়ানি আদালতে ক্ষতিপূরণ দাবি, স্বাধীন কর্তৃপক্ষের তত্ত্বাবধানে ক্ষতিকর বিষয়বস্তু অপসারণের আবেদন এবং ছদ্মবেশ ধারণ বা হুমকি দেওয়ার মতো সুনির্দিষ্ট আচরণের জন্য স্পষ্ট অপরাধের বিধান রাখা যেতে পারে। তবে মতপ্রকাশের বিস্তৃত শ্রেণিকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা উচিত নয়।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিষয়বস্তুর সুনির্দিষ্ট নিয়ন্ত্রণ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে তৈরি বিভ্রান্তিকর বিষয়বস্তুর কথা সংশোধনীর পক্ষে যুক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হলেও, এ ধরনের বিষয়বস্তুকে আইন কীভাবে বিবেচনা করবে, তা নিয়ে নিবন্ধটিতে আলোচনা নেই।
এ ক্ষেত্রে আইনে বিষয়বস্তুর সংজ্ঞা সুনির্দিষ্ট ও সীমিত হওয়া দরকার। শুধু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে কোনো ছবি, ভিডিও বা অডিও তৈরি হয়েছে বলেই তাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য করা ঠিক হবে না। বরং কাউকে প্রতারিত করার উদ্দেশ্য এবং তার ফলে সুনির্দিষ্ট ক্ষতি ঘটানোর বিষয়টি প্রমাণের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
ফৌজদারি শাস্তির বিকল্প হিসেবে কৃত্রিমভাবে তৈরি বিষয়বস্তু চিহ্নিত করার বাধ্যবাধকতা বা স্পষ্ট পরিচিতি যুক্ত করার ব্যবস্থাও বিবেচনা করা যেতে পারে। অনেক ক্ষেত্রে এমন ব্যবস্থা জনস্বার্থ রক্ষা করতে পারে, অথচ মতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর অপ্রয়োজনীয় বিধিনিষেধ আরোপ করে না।
আইন প্রয়োগের সক্ষমতা ও জবাবদিহি
নিবন্ধে নির্বাহী বিভাগের অতিরিক্ত ক্ষমতার সমালোচনা করা হয়েছে। তবে সাইবার সুরক্ষা সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বাস্তব দক্ষতা ও সক্ষমতা নিয়ে তেমন আলোচনা নেই।
আইনের ভাষা যতই সুস্পষ্ট হোক, তদন্তকারীরা যদি ডিজিটাল প্রমাণ সংগ্রহ, সংরক্ষণ ও যাচাই এবং মানবাধিকারের মানদণ্ড সম্পর্কে যথাযথ প্রশিক্ষণ না পান, তাহলে আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করা কঠিন হবে। তাই আইন সংস্কারের সঙ্গে বাধ্যতামূলক প্রশিক্ষণ, সংস্থার অভ্যন্তরে অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা এবং নিয়মিত জনসমক্ষে প্রতিবেদন প্রকাশের বিধান যুক্ত করা দরকার।
এসব প্রতিবেদনে কতটি মামলা হয়েছে, কতটি অনলাইন বিষয়বস্তু বন্ধ করা হয়েছে এবং সেসব মামলার পরিণতি কী হয়েছে, তা জানানো উচিত। পাশাপাশি, আইনটি বাস্তবে কীভাবে প্রয়োগ করা হচ্ছে, তা পর্যালোচনায় সংসদেরও সুস্পষ্ট ভূমিকা থাকা প্রয়োজন।
যাঁরা ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন, তাঁদের প্রতিকার
লেখক অতীতের সাইবার আইনের অধীনে কর্মী, সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের গ্রেপ্তারের কথা উল্লেখ করেছেন। তবে তাঁদের জন্য কী ধরনের প্রতিকার থাকা উচিত, সে বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট প্রস্তাব দেননি।
আইন সংস্কারের অংশ হিসেবে পুরোনো বা বাতিল হওয়া আইনের অস্পষ্ট বিধানের অধীনে দায়ের করা চলমান মামলাগুলো পর্যালোচনা করা যেতে পারে। যেসব মামলা অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা ও শাস্তির আনুপাতিকতার মানদণ্ড পূরণ করে না, সেগুলো প্রত্যাহারের উদ্যোগ নেওয়া দরকার। অন্যায়ভাবে মামলা ও বিচারের শিকার ব্যক্তিদের জন্য সহজলভ্য ক্ষতিপূরণ এবং প্রতিকার পাওয়ার ব্যবস্থাও গড়ে তোলা উচিত।
সাংবাদিকদের বাইরেও সুরক্ষা নিশ্চিত করা
নিবন্ধের শেষাংশে সাংবাদিকদের অধিকার সুরক্ষায় একটি বিশেষ আইন প্রণয়নের সুপারিশ করা হয়েছে। সাংবাদিকদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এমন উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাধারণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারী, শিক্ষার্থী, গবেষক এবং নাগরিক সমাজের কর্মীরাও একই ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়েন। প্রস্তাবিত সুরক্ষা যদি শুধু সাংবাদিকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে অন্যদের জন্য সমান সুরক্ষা নিশ্চিত হবে না।
সাইবার আইনেই এমন একটি সাধারণ সুরক্ষাব্যবস্থা রাখা যেতে পারে, যা সব নাগরিকের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য হবে। জনস্বার্থে এবং সদুদ্দেশ্যে তথ্য প্রকাশের জন্য সুরক্ষা বা আইনি অব্যাহতির বিধান থাকলে তা মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে আরও সমানভাবে রক্ষা করবে।
ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ও তথ্য সুরক্ষা
নিবন্ধে ব্যক্তিগত গোপনীয়তাকে উদ্বেগের একটি ক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হলেও বিষয়টি বিস্তারিতভাবে আলোচিত হয়নি। অনলাইন তথ্য অপসারণ বা বন্ধ করার ক্ষমতার পাশাপাশি নজরদারি, ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ এবং সংরক্ষণের প্রশ্নও জড়িত।
আইন সংস্কারে তথ্য সংগ্রহের ওপর কঠোর সীমা নির্ধারণ করা জরুরি। ব্যক্তিগত তথ্য ব্যবহারের আগে বিচারিক অনুমোদন নেওয়ার বিধান থাকা উচিত। সংগৃহীত তথ্য যে উদ্দেশ্যে নেওয়া হয়েছে, তা ছাড়া অন্য কোনো কাজে ব্যবহার করা যাবে না, সেই নিশ্চয়তাও আইনে থাকতে হবে। এসব সুরক্ষাব্যবস্থা ছাড়া সাইবার নিরাপত্তার নামে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা ক্ষুণ্ন হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় জনগণের অংশগ্রহণ
সংশোধনী কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সে বিষয়ে নিবন্ধটিতে আলোচনা নেই। অথচ অতীতের সাইবার আইনগুলো নিয়ে জনমনে যে অবিশ্বাস তৈরি হয়েছে, তা দূর করতে আইন প্রণয়নের প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জনসম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা জরুরি।
গণমাধ্যমের প্রতিনিধিদের পাশাপাশি প্রযুক্তিবিদ, আইনজীবী, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের সঙ্গে উন্মুক্ত আলোচনা করে সংশোধনীর খসড়া তৈরি করা উচিত। খসড়াটি জনসমক্ষে প্রকাশ করে মতামত দেওয়ার জন্য পর্যাপ্ত সময় রাখতে হবে। এরপর সংসদে বিতর্ক ও পর্যালোচনার মধ্য দিয়ে আইন চূড়ান্ত করা হলে তার গ্রহণযোগ্যতা বাড়বে।
মূল নিবন্ধটি মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে সাইবার আইন সংস্কারের একটি শক্তিশালী সমালোচনা তুলে ধরেছে এবং প্রয়োজনীয় কিছু সংশোধনের পথও দেখিয়েছে। তবে এর সীমাবদ্ধতা হলো, রাষ্ট্রের ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণের ওপর বেশি গুরুত্ব দেওয়া হলেও অনলাইন নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের সুরক্ষা, নতুন প্রযুক্তির নিয়ন্ত্রণ, আইন প্রয়োগকারী প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং অতীতের অন্যায়ের প্রতিকার নিয়ে আলোচনা তুলনামূলকভাবে কম।
দীর্ঘমেয়াদে কার্যকর আইন সংস্কারের জন্য এই দুই দিকের মধ্যে ভারসাম্য থাকা জরুরি। অপরাধের সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা, অপরাধের মাত্রার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ শাস্তি এবং স্বাধীন তদারকির পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ব্যক্তিদের জন্য কার্যকর প্রতিকার, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় তৈরি বিষয়বস্তুর সুস্পষ্ট নিয়ন্ত্রণ, ব্যক্তিগত গোপনীয়তার সুরক্ষা এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক পরামর্শ প্রক্রিয়া নিশ্চিত করতে হবে।
সাইবার জগতে নিরাপত্তা ও স্বাধীনতাকে পরস্পরের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। আইনকে একই সঙ্গে নাগরিকের অধিকার রক্ষা করতে হবে এবং প্রকৃত ক্ষতির প্রতিকার নিশ্চিত করতে হবে। এই ভারসাম্য প্রতিষ্ঠিত হলেই সাইবার আইন জনআস্থা অর্জন করতে পারবে এবং ডিজিটাল পরিসরে স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা দুটিই রক্ষা করতে সক্ষম হবে।
তথ্যসূত্র:
