ফারাহ জেহির
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
দুই দশকের বেশি সময় ধরে বাংলাদেশে ডেঙ্গুর প্রাদুর্ভাব ঘটছে। এখন ডেঙ্গু শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক রোগ নয়, আবার বর্ষাকালের মধ্যেও তার বিস্তার সীমাবদ্ধ নেই। ২০২৬ সালের ৬ অক্টোবর পর্যন্ত দেশে ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৯০ হাজার ৩৫৬ জন এবং মারা গেছেন ২৮১ জন। ৬ অক্টোবর এক দিনেই ১ হাজার ৯৯৬ জন হাসপাতালে ভর্তি হন এবং মারা যান ১০ জন, যা চলতি বছরে এক দিনে সর্বোচ্চ মৃত্যুর সংখ্যা। শুধু সেপ্টেম্বরেই ডেঙ্গুতে ১৪৮ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
ডেঙ্গুর চিকিৎসা কীভাবে করতে হয়, বাংলাদেশ তা জানে। প্রশ্ন হচ্ছে, দুই দশকের অভিজ্ঞতা, সরকারি ব্যয়, মশা নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচি এবং চিকিৎসা নির্দেশিকা থাকার পরও প্রতিবছর বড় আকারের প্রাদুর্ভাব কেন ফিরে আসে?
চিকিৎসা জানা আছে, প্রতিরোধে ঘাটতি
ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো অ্যান্টিভাইরাল চিকিৎসা নেই। দ্রুত রোগ শনাক্ত করা, বিপদের লক্ষণ পর্যবেক্ষণ এবং প্রয়োজন অনুযায়ী সহায়ক চিকিৎসাই ব্যবস্থাপনার মূল ভিত্তি। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (WHO) মতে, সময়মতো রোগ শনাক্ত করা এবং যথাযথ চিকিৎসা নিশ্চিত করা গেলে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর হার ১ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনা সম্ভব। বাংলাদেশে ২০২৫ সালে ডেঙ্গু চিকিৎসার জাতীয় নির্দেশিকা হালনাগাদ করা হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরও নিয়মিত রোগী ও মৃত্যুর তথ্য সংগ্রহ করছে।
তবে সংক্রমণ ঠেকানোই বড় চ্যালেঞ্জ। ডেঙ্গুর প্রধান বাহক Aedes aegypti মশা। বাড়িঘর, নির্মাণাধীন ভবন, অফিস, স্কুল, হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্থানে অল্প পরিমাণ জমে থাকা পানিতেও এই মশার বংশবিস্তার হতে পারে। ফগিং প্রাপ্তবয়স্ক মশা সাময়িকভাবে কমাতে পারে, কিন্তু মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করতে পারে না। তাই WHO সমন্বিত মশা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ওপর গুরুত্ব দেয়, যেখানে প্রজননস্থল ধ্বংস, লার্ভা নিয়ন্ত্রণ, নিয়মিত নজরদারি, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা এবং মানুষের সংস্পর্শ কমানোর ব্যবস্থা একসঙ্গে কাজ করে।
বাংলাদেশের বড় দুর্বলতা এখানেই। ডেঙ্গু মোকাবিলা ও মশা নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব স্বাস্থ্য বিভাগ, সিটি করপোরেশন এবং স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ছড়িয়ে আছে। রাজধানীর বাইরে সমস্যা আরও প্রকট হতে পারে, কারণ সব এলাকায় নজরদারি, পরীক্ষাগার সুবিধা, প্রশিক্ষিত জনবল এবং মশা নিয়ন্ত্রণের সক্ষমতা সমান নয়।
মৃত্যুর ভৌগোলিক চিত্র বদলাচ্ছে
২০২৬ সালের তথ্য বলছে, ডেঙ্গুকে শুধু ঢাকার সমস্যা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ৬ অক্টোবর পর্যন্ত স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হিসাবে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ৭৫ জন এবং ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন এলাকায় ৩৫ জন মারা গেছেন। খুলনা বিভাগে মৃত্যু হয়েছে ৫৫ জনের। চট্টগ্রামে ২৫, বরিশালে ২৪, ময়মনসিংহে ২৩, রাজশাহীতে ১৯, ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায় ১৭, রংপুরে ৬ এবং সিলেটে ২ জনের মৃত্যু হয়েছে।
তবে সংখ্যাগুলোকে বিভাগভিত্তিক মৃত্যুহার বলা ঠিক হবে না। মৃত্যুহার বা কেস ফ্যাটালিটি রেট তুলনা করতে হলে প্রতিটি এলাকার মোট সংক্রমণ, হাসপাতালে ভর্তি, জনসংখ্যা, রোগী স্থানান্তরের ধরন এবং চিকিৎসাসেবায় প্রবেশাধিকারের মতো তথ্য একসঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
তবু প্রবণতাটি গুরুত্বপূর্ণ। খুলনা বিভাগে ৫৫ জনের মৃত্যু দেখিয়ে দিচ্ছে যে ঢাকার বাইরে ডেঙ্গুর ঝুঁকি যথেষ্ট বড়। একই সঙ্গে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন মিলিয়ে মৃত্যুর সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। ফলে ডেঙ্গু নীতি শুধু রাজধানীকে ঘিরে তৈরি করলে চলবে না।
সরকারের পদক্ষেপ কতটা কার্যকর?
বাংলাদেশে ডেঙ্গু মোকাবিলার জন্য বেশ কিছু ব্যবস্থা চালু আছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর নিয়মিত রোগী ও মৃত্যুর তথ্য প্রকাশ করে। হাসপাতালগুলোতে ডেঙ্গু চিকিৎসার জাতীয় নির্দেশিকা রয়েছে। স্থানীয় কর্তৃপক্ষ লার্ভিসাইডিং, প্রাপ্তবয়স্ক মশা নিয়ন্ত্রণ, প্রজননস্থল ধ্বংস, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম এবং কোথাও কোথাও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করছে।
মশা নিয়ন্ত্রণকে তথ্যনির্ভর করার উদ্যোগও দেখা গেছে। ২০২৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন ও জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (UNDP) একটি ডেঙ্গু ড্যাশবোর্ড চালু করে, যার লক্ষ্য ছিল রোগের প্রবণতা চিহ্নিত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া।
সমস্যা শুধু কর্মসূচির অভাবে নয়। বড় প্রশ্ন হলো এসব উদ্যোগ কতটা নিয়মিত, সমন্বিত এবং সময়োপযোগী। ২০২৫ সালের এক পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন নয় বছরে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৭০৭ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। তারপরও ডেঙ্গুর বড় প্রাদুর্ভাব বন্ধ হয়নি। পুরোনো পদ্ধতি, দুর্বল সমন্বয়, কীটনাশকের কার্যকারিতা নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং ব্যক্তিমালিকানাধীন স্থাপনায় মশার প্রজননস্থলে পৌঁছানোর সীমাবদ্ধতাকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
ভ্যাকসিন কি সমাধান হতে পারে?
বাংলাদেশে জাতীয় ডেঙ্গু টিকাদান কর্মসূচি না থাকলেও বিশ্বে ডেঙ্গুর ভ্যাকসিন রয়েছে। WHO নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে উচ্চ সংক্রমণপ্রবণ এলাকায় ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য TAK-003 বা Qdenga ব্যবহারের সুপারিশ করেছে। তবে ভ্যাকসিন সব ধরনের ডেঙ্গু সংক্রমণ ঠেকাতে পারে না। তাই টিকাদানকে সমন্বিত ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার একটি অংশ হিসেবেই দেখতে হবে।
বাংলাদেশে এখনো জাতীয় পর্যায়ে ডেঙ্গু টিকাদান কর্মসূচি চালু হয়নি। ২০২৬ সালের অক্টোবরে সরকার দেশে ডেঙ্গু ভ্যাকসিনের পরীক্ষামূলক প্রয়োগ বা ট্রায়াল নিয়ে ভাবার কথা জানিয়েছে। নিরাপত্তা, কার্যকারিতা, ডেঙ্গুর বিভিন্ন সেরোটাইপ, ব্যয় এবং বাংলাদেশের জনসংখ্যার ওপর ভ্যাকসিনের সম্ভাব্য প্রভাব যাচাই না করে জাতীয় কর্মসূচিতে যাওয়া ঠিক হবে না।
তাই আপাতত শুধু ভ্যাকসিনের ওপর নির্ভর করলে হবে না। টিকা নিয়ে গবেষণা ও মূল্যায়নের পাশাপাশি সংক্রমণ প্রতিরোধের বিদ্যমান ব্যবস্থাকেও শক্তিশালী করতে হবে।
মূল ঘাটতি কোথায়?
বাংলাদেশে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা অনেক সময় সংক্রমণ বাড়ার পর জোরদার হয়। কার্যকর ব্যবস্থাপনার জন্য সারা বছর ধরে কাজ করা দরকার।
প্রথমত, সারা বছর Aedes মশার নজরদারি চালাতে হবে। কোথায় মশার প্রজনন হচ্ছে, কোন এলাকায় ঝুঁকি বাড়ছে এবং ব্যবহৃত কীটনাশক কতটা কার্যকর, এসব তথ্য নিয়মিত সংগ্রহ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও স্থানীয় সরকারের তথ্যব্যবস্থাকে সমন্বিত করতে হবে। ওয়ার্ড ও জেলা পর্যায়ে সংক্রমণের প্রবণতা শনাক্ত হওয়ার পর ব্যবস্থা নেওয়ার সক্ষমতা তৈরি করতে হবে।
তৃতীয়ত, শুধু ফগিংকে মশা নিয়ন্ত্রণের প্রধান পদ্ধতি হিসেবে দেখলে চলবে না। নির্মাণাধীন ভবন, ছাদ, ড্রেন, পরিত্যক্ত পাত্র, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এবং বাড়ির আশপাশে জমে থাকা পানি নিয়মিত অপসারণ করতে হবে। কোন ওয়ার্ডে কতটি স্থাপনা পরিদর্শন হয়েছে, কতটি প্রজননস্থল ধ্বংস করা হয়েছে এবং পরবর্তী সময়ে সেখানে আবার পরিদর্শন হয়েছে কি না, সেই তথ্যও প্রকাশ করা যেতে পারে।
চতুর্থত, চিকিৎসাসেবা ঢাকাকেন্দ্রিক না রেখে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে প্রস্তুতি বাড়াতে হবে। IEDCR-এর ১১৯ জন ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যুর পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এক-তৃতীয়াংশের বেশি রোগী হাসপাতালে ভর্তির এক দিনের মধ্যে মারা গেছেন। দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ, সঠিকভাবে ঝুঁকিপূর্ণ রোগী বাছাই এবং দ্রুত রেফারাল ব্যবস্থা শক্তিশালী করার প্রয়োজন এখানেই স্পষ্ট।
ডেঙ্গু নীতিতে জলবায়ু ও নগরায়ণের পরিবর্তনকেও গুরুত্ব দিতে হবে। বৃষ্টিপাত, তাপমাত্রা, জলাবদ্ধতা এবং ঋতুর পরিবর্তন ডেঙ্গুর বিস্তারে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই জলবায়ু সংবেদনশীল রোগ নজরদারি নগর স্বাস্থ্য পরিকল্পনার অংশ হওয়া প্রয়োজন।
এসডিজির সঙ্গে ডেঙ্গুর সম্পর্ক
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সবচেয়ে সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে এসডিজি ৩: সুস্বাস্থ্য ও কল্যাণ-এর। বিশেষ করে লক্ষ্য ৩.৩ সংক্রামক রোগের মহামারি মোকাবিলার কথা বলে এবং লক্ষ্য ৩.ডি জাতীয় পর্যায়ে আগাম সতর্কতা, ঝুঁকি কমানো এবং স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়।
এর সঙ্গে এসডিজি ১১: টেকসই নগর ও জনপদ এবং এসডিজি ১৩: জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলা-ও সরাসরি যুক্ত। স্বাস্থ্যকর নগর পরিবেশ, কার্যকর বর্জ্য ও পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মোকাবিলার সঙ্গে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণের সম্পর্ক গভীর।
বাংলাদেশের জন্য তাই ডেঙ্গু শুধু স্বাস্থ্য খাতের বিষয় নয়। এর সঙ্গে নগর ব্যবস্থাপনা, স্থানীয় সরকার, পরিবেশ, জলবায়ু সহনশীলতা এবং জনসম্পৃক্ততা সরাসরি জড়িত।
প্রতিবছর রোগী বাড়ার পর মৌসুমি প্রচারণা চালিয়ে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন একটি স্থায়ী জাতীয় ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনা কাঠামো, যেখানে নিয়মিত নজরদারি, জবাবদিহিমূলক স্থানীয় সরকার, শক্তিশালী প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, বৈজ্ঞানিক মশা নিয়ন্ত্রণ এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণ থাকবে। লক্ষ্য হওয়া উচিত একটাই: ডেঙ্গু প্রতিরোধকে প্রতিবছরের জরুরি কর্মসূচি না বানিয়ে নিয়মিত জনসেবা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
তথ্যসূত্র
- Directorate General of Health Services (DGHS), Ministry of Health and Family Welfare, Government of Bangladesh. Dengue Dynamic Dashboard and Daily Dengue Situation Reports. 2026. DGHS Dengue Dashboard
- Directorate General of Health Services (DGHS), Government of Bangladesh. National Guideline for Clinical Management of Dengue, 5th Edition. 2025. DGHS Guidelines
- Institute of Epidemiology, Disease Control and Research (IEDCR), Government of Bangladesh. Dengue surveillance, epidemiological information and mortality investigations. IEDCR
- World Health Organization (WHO). Dengue and severe dengue. Information on transmission, prevention, clinical management and disease burden. WHO: Dengue and severe dengue
- World Health Organization (WHO). Dengue vaccines: Questions and answers. Guidance on dengue vaccination, including TAK-003 (Qdenga), eligibility and limitations. WHO: Dengue vaccines
- World Health Organization (WHO). Global Vector Control Response 2017–2030. Framework for integrated vector management, surveillance, environmental management and community participation. WHO: Global Vector Control Response
- United Nations Development Programme (UNDP) Bangladesh. Data-driven dengue surveillance and response initiatives in Dhaka. UNDP Bangladesh
- United Nations. Sustainable Development Goals: Goal 3, Good Health and Well-being. Targets 3.3 and 3.d on communicable diseases, early warning, risk reduction and health emergencies. UN Sustainable Development Goal 3
- United Nations. Sustainable Development Goals: Goal 11, Sustainable Cities and Communities. Relevant to healthy, resilient and sustainable urban environments. UN Sustainable Development Goal 11
- United Nations. Sustainable Development Goals: Goal 13, Climate Action. Relevant to climate-related health risks and adaptation. UN Sustainable Development Goal 13
