তানজীনা ফেরদৌস
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
পে স্কেলের সঙ্গে পেনশন সংস্কার না হলে সমীকরণ অসম্পূর্ণ
একজন সরকারি কর্মচারীর কর্মজীবন শেষ হয় অবসরে, কিন্তু তাঁর ব্যয় শেষ হয় না। বরং বয়স বাড়ার সঙ্গে চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধ, নির্ভরশীল পরিবারের সদস্য এবং জীবনযাত্রার নিরাপত্তার প্রয়োজন অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধি পায়। তাই নতুন পে স্কেল নিয়ে আলোচনায় পেনশনকে আলাদা কোনো বিষয় হিসেবে দেখলে চলবে না। মূল বেতন বাড়লে পেনশন কাঠামোতেও তার দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ে। ফলে আজকের বেতন সিদ্ধান্ত আগামী কয়েক দশকের সরকারি ব্যয়ের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
এখানে প্রয়োজন পেনশন মূল্যস্ফীতি সমন্বয়, অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি বা নির্দিষ্ট জীবনযাত্রার সূচকের সঙ্গে পেনশনের একটি যৌক্তিক সমন্বয়। কারণ অবসরপ্রাপ্ত একজন মানুষের জন্য ২০ বছর আগের ৩০ হাজার টাকা এবং বর্তমান ৩০ হাজার টাকা একই অর্থ বহন করে না। পেনশনের নামমাত্র অঙ্ক অপরিবর্তিত রেখে প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা হারিয়ে গেলে রাষ্ট্র তার সাবেক কর্মচারীর প্রতি দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক দায় পূরণ করতে পারে না।
সরকারি চাকরি কি এখনও মেধাবীদের জন্য প্রতিযোগিতামূলক?
নবম পে স্কেলকে শুধু বিদ্যমান কর্মচারীদের আয় বৃদ্ধির দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা হলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন বাদ পড়ে যাবে, আগামী প্রজন্মের মেধাবীদের জন্য সরকারি চাকরি কতটা আকর্ষণীয়?
একজন দক্ষ সফটওয়্যার প্রকৌশলী, চিকিৎসক, প্রকৌশলী, অর্থনীতিবিদ, আইনজীবী, গবেষক কিংবা প্রযুক্তিবিদ বেসরকারি বা আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে যে আয় ও সুযোগ পেতে পারেন, তার তুলনায় সরকারি চাকরির মোট পারিশ্রমিক, কর্মপরিবেশ, পদোন্নতির গতি এবং পেশাগত স্বাধীনতা কতটা প্রতিযোগিতামূলক, তা পরিমাপ করা প্রয়োজন।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গবেষণায়ও সরকারি পারিশ্রমিক ব্যবস্থার ক্ষেত্রে বেসরকারি খাতের সঙ্গে তুলনা এবং প্রতিযোগিতামূলক পারিশ্রমিকের গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। রাষ্ট্র যদি সেরা মেধাকে ধরে রাখতে চায়, তবে শুধু নিরাপদ চাকরি যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন ন্যায্য বেতন, দক্ষতার মূল্যায়ন, দ্রুত পদোন্নতি, গবেষণার সুযোগ, প্রশিক্ষণ, পেশাগত স্বাধীনতা এবং সামাজিক মর্যাদা। অন্যথায় বেতন বাড়লেও মেধা ধরে রাখার সংকট থেকে যেতে পারে।
বেতন বাড়লেই দুর্নীতি কমবে, এমন সরল সমীকরণ বিপজ্জনক
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানোর পক্ষে প্রায়ই একটি যুক্তি দেওয়া হয়, ভালো বেতন দুর্নীতি কমাবে। যুক্তিটির একটি অর্থনৈতিক ভিত্তি রয়েছে। একজন কর্মচারীর বৈধ আয় যদি তাঁর জীবনযাত্রার তুলনায় অত্যন্ত কম হয়, তাহলে অনৈতিক আয়ের প্রলোভন বাড়তে পারে। কিন্তু এটিকে একমাত্র কারণ হিসেবে দেখা ভুল। কারণ দুর্নীতি শুধু কম বেতনের ফল নয়।
এর সঙ্গে যুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহি, শাস্তির নিশ্চয়তা, নিয়োগ ও পদোন্নতির স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক ক্ষমতার মাত্রা, রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্নীতির সুযোগ এবং নজরদারি ব্যবস্থা। তাই নবম পে স্কেলকে দুর্নীতি প্রতিরোধের একটি অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে, পূর্ণাঙ্গ সমাধান হিসেবে নয়। উচ্চ বেতন দুর্নীতির প্রণোদনা কমাতে পারে, কিন্তু দুর্নীতির সুযোগ ও দায়মুক্তি বন্ধ না করলে শুধু বেতন দিয়ে সততা কেনা যায় না।
নারী সরকারি কর্মচারীদের বাস্তব ব্যয় কোথায়?
সরকারি বেতন কাঠামোর আলোচনায় আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু প্রায় অনুপস্থিত বিষয় হলো নারী কর্মচারীর জীবনযাত্রার বিশেষ ব্যয়। কর্মজীবী নারীর ক্ষেত্রে নিরাপদ যাতায়াত, শিশু পরিচর্যা, কর্মস্থলের দূরত্ব, মাতৃত্ব, শিশুর দিবাযত্ন, পরিবারের বয়স্ক সদস্যের যত্ন এবং দ্বৈত দায়িত্ব, এসব অর্থনৈতিক বাস্তবতা।
একই বেতন দুইজন কর্মচারীর জন্য সমান অর্থ বহন করলেও তাদের বাস্তব ব্যয় সমান নয়। তাই ভবিষ্যতের পারিশ্রমিক কাঠামোয় শুধু নারী পুরুষ নির্বিশেষে একই বেতন নয়, বরং নারী কর্মীদের বাস্তব প্রয়োজন বিবেচনায় কর্মক্ষেত্রের বিশেষ সুবিধাও বিবেচনা করা প্রয়োজন। সরকারি চাকরিকে নারীবান্ধব করতে শিশু দিবাযত্ন, নিরাপদ পরিবহন, মাতৃত্ব পরবর্তী কর্মসংস্থান সহায়তা এবং নমনীয় কর্মব্যবস্থার মতো সুবিধাকে বেতননীতির বৃহত্তর অংশ হিসেবে দেখা যেতে পারে।
১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকার অতিরিক্ত ব্যয়: প্রশ্নটি শুধু ‘কত’ নয়, ‘কোথা থেকে’
নতুন বেতন কাঠামোর অন্যতম বড় প্রশ্ন হলো এর আর্থিক উৎস। অর্থ মন্ত্রণালয়ের তথ্যভান্ডারে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী নতুন কাঠামো বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত বার্ষিক ব্যয় আনুমানিক ১ লাখ ৫ হাজার ৫৮০ কোটি টাকা। এই অর্থ কোথা থেকে আসবে? রাজস্ব আয় বাড়িয়ে? কর ও মোট দেশজ উৎপাদনের অনুপাত বাড়িয়ে? অন্য খাতে ব্যয় কমিয়ে? ঋণ নিয়ে? নাকি বাজেট ঘাটতি বাড়িয়ে?
এখানে একটি মৌলিক নীতি মনে রাখা দরকার, বেতন বৃদ্ধি নিজে সমস্যা নয়, অস্থিতিশীল অর্থায়নের মাধ্যমে বেতন বৃদ্ধি সমস্যা তৈরি করতে পারে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের গবেষণা বলছে, সরকারি বেতন ব্যয় অতিরিক্ত দ্রুত বাড়লে তা রাজস্ব ভারসাম্য, সরকারি ব্যয়ের কাঠামো এবং সামষ্টিক অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলতে পারে। তাই নতুন পে স্কেলের সঙ্গে একটি মধ্যমেয়াদি বেতন ব্যয় কাঠামো প্রকাশ করা উচিত।
সেখানে অন্তত পাঁচ বছরের জন্য দেখানো যেতে পারে, মোট বেতন ব্যয় কত হবে; পেনশনসহ মোট মানবসম্পদ ব্যয় কত হবে; রাজস্বের কত শতাংশ এতে যাবে; মোট দেশজ উৎপাদনের কত শতাংশ হবে; নতুন নিয়োগের আর্থিক প্রভাব কত; এবং কোন খাত থেকে অর্থায়ন করা হবে।
বেতন বৃদ্ধি কি মূল্যস্ফীতি বাড়াবে?
এই প্রশ্নটির উত্তরও সরল নয়। বেতন বৃদ্ধি মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ায়। ফলে চাহিদা বাড়তে পারে। কিন্তু শুধু সরকারি বেতন বৃদ্ধিকেই মূল্যস্ফীতির জন্য দায়ী করা অর্থনৈতিকভাবে অতিরঞ্জিত হবে। মূল্যস্ফীতির পেছনে মুদ্রা সরবরাহ, বিনিময় হার, আমদানি মূল্য, খাদ্য সরবরাহ, জ্বালানি মূল্য, বাজার কাঠামো, রাজস্ব ঘাটতি এবং মানুষের ভবিষ্যৎ মূল্যস্ফীতি সম্পর্কে প্রত্যাশাসহ বহু কারণ কাজ করে।
অতএব নতুন পে স্কেলকে মূল্যস্ফীতির একক কারণ হিসেবে দেখা উচিত নয়। বরং প্রশ্ন হওয়া উচিত, বেতন বৃদ্ধির আর্থিক প্রভাব কীভাবে এমনভাবে পরিচালনা করা হবে, যাতে প্রকৃত আয় বাড়ে কিন্তু মূল্যস্ফীতির চাপ অযথা তীব্র না হয়? এখানেই রাজস্বনীতি, মুদ্রানীতি এবং বেতননীতির মধ্যে সমন্বয় প্রয়োজন।
জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি আর সর্বনিম্ন বেতন এক জিনিস নয়
নতুন কাঠামোর সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা। এটি একটি প্রশাসনিকভাবে নির্ধারিত সংখ্যা। কিন্তু একজন কর্মচারীর পরিবারকে মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপন করাতে যে আয় প্রয়োজন, সেটিই জীবনযাপনের উপযোগী মজুরির প্রশ্ন। দুটি ধারণাকে এক করা উচিত নয়। সর্বনিম্ন বেতন হলো প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত।
জীবনযাপনের উপযোগী মজুরি হলো জীবনযাত্রার বাস্তব ব্যয়ের প্রতিফলন। একটি পরিবারে কতজন সদস্য, বাসাভাড়া কত, সন্তানদের শিক্ষা ব্যয় কত, চিকিৎসা ব্যয় কত, যাতায়াত কত, এসব বিবেচনা না করে শুধু একটি জাতীয় সর্বনিম্ন বেতন নির্ধারণ করলে কর্মচারীর প্রকৃত জীবনযাত্রা বোঝা যায় না। সুতরাং ভবিষ্যৎ বেতন কমিশনের অন্যতম দায়িত্ব হওয়া উচিত জাতীয় জীবনযাপন ব্যয় সূচক তৈরি করা।
কর্মদক্ষতার সঙ্গে বেতন কাঠামোর সম্পর্ক কোথায়?
শুধু চাকরির বয়সের সঙ্গে বেতন বাড়তে থাকলে এক ধরনের সমস্যা তৈরি হয়, অভিজ্ঞতা পুরস্কৃত হয়, কিন্তু উৎকর্ষ সবসময় পুরস্কৃত হয় না। একজন কর্মচারী অসাধারণ দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন, অন্যজন ন্যূনতম দায়িত্ব পালন করছেন, দুজন যদি প্রায় একই গতিতে আর্থিক সুবিধা পান, তাহলে কর্মদক্ষতার প্রণোদনা দুর্বল হতে পারে।
অন্যদিকে সম্পূর্ণ কর্মদক্ষতাভিত্তিক বেতনও বাংলাদেশের সরকারি প্রশাসনে ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। কারণ এতে রাজনৈতিক প্রভাব, পক্ষপাত এবং মূল্যায়নের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তাই প্রয়োজন একটি ভারসাম্যপূর্ণ মডেল, যেখানে মূল বেতন হবে পদ ও দায়িত্বভিত্তিক; ইনক্রিমেন্ট হবে অভিজ্ঞতাভিত্তিক; অতিরিক্ত প্রণোদনা হবে স্বচ্ছ ও পরিমাপযোগ্য কর্মদক্ষতার ভিত্তিতে। অর্থাৎ, বেতন কাঠামোকে এমনভাবে সাজাতে হবে যাতে দক্ষতা, সততা ও ফলাফল, তিনটিই অর্থনৈতিকভাবে মূল্য পায়।
বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাব্য মডেল হতে পারে:
• বার্ষিক জীবনযাত্রার ব্যয় সমন্বয়: বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ভোক্তা মূল্যসূচকের ভিত্তিতে বছরে একবার সীমিত স্বয়ংক্রিয় সমন্বয়।
• তিন থেকে পাঁচ বছর পর পর পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা: প্রতি ৩ থেকে ৫ বছর পর পূর্ণাঙ্গ বেতন কমিশন।
• অঞ্চলভিত্তিক ভাতা: অঞ্চলভেদে জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্য বিবেচনা।
• পেনশন সমন্বয়: অবসরপ্রাপ্তদের ক্রয়ক্ষমতা রক্ষায় মূল্যস্ফীতির সঙ্গে পেনশন সমন্বয়।
• মোট পারিশ্রমিকের হিসাব প্রকাশ: শুধু মূল বেতন নয়, মোট সরকারি পারিশ্রমিকের হিসাব প্রকাশ।
• বেতন ব্যয়ের নীতি: রাজস্ব ও মোট দেশজ উৎপাদনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি বেতন ব্যয়ের একটি মধ্যমেয়াদি সীমা নির্ধারণ।
• সরকারি ও বেসরকারি খাতের বেতন তুলনা: নির্দিষ্ট পেশায় সরকারি ও বেসরকারি খাতের পারিশ্রমিকের নিয়মিত তুলনা।
• উৎপাদনশীলতার উপাদান: দক্ষতা ও ফলাফলের ভিত্তিতে সীমিত কর্মদক্ষতা প্রণোদনা।
• নারীবান্ধব সুবিধা: নারী কর্মচারীদের বাস্তব কর্মজীবন ব্যয় বিবেচনায় সহায়ক সুবিধা।
• প্রকৃত বেতন প্রতিবেদন: প্রতি বছর সরকারি কর্মচারীদের জন্য শুধু নামমাত্র বেতন নয়, মূল্যস্ফীতির সমন্বয়ের পর প্রকৃত বেতনও প্রকাশ।
সবচেয়ে বড় সংস্কারটি আসলে বেতন কমিশনে নয়, পদ্ধতিতে। বাংলাদেশে আমরা প্রায়ই নতুন পে স্কেলকে একটি বড় আর্থিক ঘটনা হিসেবে দেখি। কিন্তু একটি আধুনিক রাষ্ট্রে বেতন স্কেল কোনো এককালীন ঘোষণা নয়। এটি একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান। কারণ সরকারি কর্মচারীর বেতন শুধু একজন ব্যক্তির আয় নয়। এটি পরিবারের ভোগ, সঞ্চয়, আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা, শ্রমবাজার, মূল্যস্ফীতি, রাজস্ব এবং রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের সঙ্গে যুক্ত।
তাই একটি ভালো পে স্কেলের তিনটি বৈশিষ্ট্য থাকা প্রয়োজন। প্রথমত, ন্যায্যতা, একই দায়িত্বের জন্য যৌক্তিক পারিশ্রমিক। দ্বিতীয়ত, ক্রয়ক্ষমতার সুরক্ষা, মূল্যস্ফীতি যেন বছরের পর বছর প্রকৃত আয়কে ক্ষয় না করে। তৃতীয়ত, আর্থিক স্থায়িত্ব, রাষ্ট্র যেন এমন প্রতিশ্রুতি না দেয়, যা ভবিষ্যতের রাজস্ব দিয়ে বহন করা সম্ভব নয়।
বেতন বাড়ানোর চেয়েও জরুরি বেতনব্যবস্থাকে আধুনিক করা। নবম জাতীয় বেতন স্কেল সরকারি কর্মচারীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক স্বস্তি তৈরি করতে পারে। কিন্তু এটিকে চূড়ান্ত সমাধান হিসেবে দেখলে ভুল হবে। কারণ আজ যে বেতনকে বড় মনে হচ্ছে, কয়েক বছর পর মূল্যস্ফীতি সেটিকে আবার ছোট করে দিতে পারে।
