সুমাইয়া হাসি
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
প্রেক্ষাপট
গত ৩১ আগস্ট সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগ (সিপিডি) আয়োজন করে জাতীয় সংলাপ, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে ই গভর্ন্যান্স: বর্তমান অবস্থা ও করণীয়’। সংলাপে গবেষক, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা এবং তরুণ নাগরিকেরা অংশ নেন। স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে বাংলাদেশের শাসনব্যবস্থাকে বদলে দিচ্ছে এবং নাগরিকের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দেওয়ার যে মূল প্রতিশ্রুতি ই গভর্ন্যান্সের, তা কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে, তা নিয়ে আলোচনা হয়।
আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল, ডিজিটাল সেবা কি কেবল প্রশাসনিক সুবিধা বাড়াচ্ছে, নাকি নাগরিকের অধিকার হিসেবে প্রয়োজনীয় সরকারি সেবা পাওয়ার পথও সহজ করছে?
স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল সেবার বর্তমান চিত্র
সংলাপে উপস্থাপিত মূল গবেষণাপত্রে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা এবং উপজেলা পরিষদ পর্যায়ে ই গভর্ন্যান্সের বর্তমান পরিধি তুলে ধরা হয়। জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন, নাগরিক সনদ, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির ভাতা বিতরণ এবং ট্রেড লাইসেন্সের মতো মৌলিক সেবাগুলো ধীরে ধীরে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে যুক্ত হচ্ছে।
তবে গবেষণায় বলা হয়েছে, প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা, দক্ষ জনবলের ঘাটতি এবং দীর্ঘদিনের প্রযুক্তিগত বৈষম্যের কারণে সাধারণ নাগরিকদের এসব সেবা পেতে এখনো নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
নাগরিক সমাজের বক্তব্য: ডিজিটাল সেবা যেন বাধা কমায়, নতুন বাধা তৈরি না করে
নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও নাগরিক অধিকার নিয়ে কাজ করা গবেষকেরা বলেন, স্থানীয় সরকারই রাষ্ট্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে যোগাযোগের প্রথম এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। তাই এই পর্যায়ে ডিজিটাল সেবার প্রধান উদ্দেশ্য হওয়া উচিত আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি কমানো। শুধু পুরোনো পদ্ধতিকে প্রযুক্তিনির্ভর করে আধুনিক রূপ দেওয়া যথেষ্ট নয়।
গ্রামীণ নারী, সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী, প্রবীণ এবং তরুণেরা যেন কোনো বৈষম্য বা মধ্যস্বত্বভোগীর হয়রানি ছাড়াই সরাসরি সরকারি সুবিধা পেতে পারেন, সে বিষয়ে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়। বক্তারা সতর্ক করে বলেন, প্রযুক্তি যথাযথভাবে নকশা ও পরিচালনা করা না হলে পুরোনো বৈষম্য দূর করার বদলে নতুন ধরনের ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি হতে পারে।
সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি: মাঠপর্যায়ের সীমাবদ্ধতা স্বীকার
প্রশাসন ও সরকারের প্রতিনিধিরা মাঠপর্যায়ে ই গভর্ন্যান্স বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে নানা সমস্যার কথা তুলে ধরেন। এর মধ্যে রয়েছে ধীরগতির ইন্টারনেট, ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাট, কেন্দ্রীয় সার্ভারে কারিগরি সমস্যা এবং ইউনিয়ন পরিষদের সচিব ও ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তাদের পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণের অভাব।
তাঁদের মতে, ই গভর্ন্যান্সের মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত সরকারি নীতি ও নাগরিকের চাহিদার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় তৈরি করা। সে জন্য অবকাঠামোয় আরও বিনিয়োগ এবং পর্যাপ্ত বাজেট বরাদ্দের প্রয়োজন, যাতে সরকারি সেবা মানুষের আরও কাছাকাছি পৌঁছানো যায়।
নাগরিকের উদ্বেগ: স্বচ্ছতা ও সেবার প্রকৃত মান
উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে স্থানীয় প্রতিনিধি, শিক্ষাবিদ এবং তরুণ অংশগ্রহণকারীরা নাগরিক পর্যায়ের নানা উদ্বেগ তুলে ধরেন। আলোচনার বড় অংশজুড়ে ছিল সেবার মান ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন। অংশগ্রহণকারীরা প্রশ্ন তোলেন, অনলাইনে নাগরিক সনদের জন্য আবেদন করার পরও যদি একজন নাগরিককে বারবার সরকারি দপ্তরে যেতে হয়, কিংবা অনলাইন আবেদনের পরও অনানুষ্ঠানিক অর্থ দিতে হয়, তাহলে সেই ডিজিটাল সেবার প্রকৃত সুফল কোথায়?
এই আলোচনার মধ্য দিয়ে সংলাপের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ই গভর্ন্যান্সের সাফল্য কতগুলো অনলাইন পোর্টাল চালু হলো বা কতগুলো সেবা ডিজিটাল করা হলো, তার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়। বরং দেখতে হবে, এর মাধ্যমে নাগরিকের অধিকার বাস্তবে কতটা শক্তিশালী হয়েছে।
সরকারের ভূমিকা নতুন করে ভাবার সময়
পুরো সংলাপজুড়ে বারবার উঠে এসেছে নাগরিকের অধিকার এবং সরকারের দায়িত্বের সম্পর্কটি নতুনভাবে দেখার প্রয়োজনীয়তা। কতগুলো অনলাইন পোর্টাল চালু হয়েছে বা কত ধরনের ডিজিটাল সেবা যুক্ত হয়েছে, শুধু এই সংখ্যা দিয়ে সরকারি উদ্যোগের সাফল্য মাপা উচিত নয়। বরং সাফল্যের মাপকাঠি হওয়া উচিত, সাধারণ মানুষ কোনো বাধা, বৈষম্য বা হয়রানি ছাড়াই মর্যাদার সঙ্গে নিজের অধিকার হিসেবে সরকারি সেবা পাচ্ছেন কি না।
এই দৃষ্টিভঙ্গিতে ডিজিটাল অবকাঠামোয় সরকারের ব্যয় কোনো ঐচ্ছিক সুবিধা বা অনুগ্রহ নয়। নাগরিকের অধিকার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের সাংবিধানিক দায়িত্বের অংশ। তাই সরকারি কার্যক্রমের মূল্যায়ন শেষ পর্যন্ত নাগরিকের সন্তুষ্টি এবং তাঁদের অধিকার কতটা বাস্তবে নিশ্চিত হয়েছে, তার ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন।
সামনে এগোনোর পথ
সংলাপে উঠে আসা সুপারিশগুলো বিবেচনায় স্থানীয় ই গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে নাগরিক অধিকার আরও শক্তিশালী করতে চারটি অগ্রাধিকার ক্ষেত্র চিহ্নিত করা যায়।
ডিজিটাল বৈষম্য কমানো : ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও মোবাইল অ্যাপ্লিকেশনগুলো সহজ এবং সবার জন্য ব্যবহারযোগ্য হতে হবে। সেবাগুলো বাংলায় সহজ ভাষায় ব্যবহারের সুযোগ থাকতে হবে। যারা নিজেরা প্রযুক্তি ব্যবহার করে সেবা নিতে পারেন না, তাঁদের জন্য স্থানীয় সরকারি কার্যালয়ে বিনা মূল্যে সহায়তা ডেস্ক রাখা যেতে পারে। একই সঙ্গে গ্রাম ও দুর্গম এলাকায় নির্ভরযোগ্য ও দ্রুতগতির ইন্টারনেট নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও দুর্নীতি প্রতিরোধ : একটি সমন্বিত সেবা অনুসরণ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে নাগরিকেরা যেকোনো সময় তাঁদের আবেদনের সর্বশেষ অবস্থা জানতে পারবেন। কোনো আবেদন নির্ধারিত সময়ে নিষ্পত্তি না হলে বিলম্বের কারণ জানানো বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। এর পাশাপাশি শক্তিশালী তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। অনানুষ্ঠানিক বা অবৈধ লেনদেনের সুযোগ কমাতে বাধ্যতামূলক নগদবিহীন অর্থ পরিশোধ ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে।
দক্ষ জনবল ও প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি : শুধু নতুন সফটওয়্যার চালু করলেই কাঙ্ক্ষিত ফল পাওয়া যাবে না। এর সঙ্গে প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তনও জরুরি। স্থানীয় সরকারের কর্মকর্তা, ইউনিয়ন পরিষদের সচিব এবং ডিজিটাল সেন্টারের উদ্যোক্তাদের আধুনিক তথ্যপ্রযুক্তি, সাইবার নিরাপত্তা এবং নাগরিককেন্দ্রিক সেবা প্রদানের বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিতে হবে। এই প্রশিক্ষণের পাশাপাশি প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাজেট এবং মানসম্মত তথ্যপ্রযুক্তি অবকাঠামো।
নাগরিক অংশগ্রহণ ও জবাবদিহির ব্যবস্থা : নাগরিকদের শুধু সরকারি সেবার গ্রহীতা হিসেবে দেখলে চলবে না। পুরো ব্যবস্থার তদারকিতেও তাঁদের ভূমিকা থাকতে হবে। অনলাইনে মতামত ও অভিযোগ জানানোর ব্যবস্থা চালু করা যেতে পারে, যেখানে নাগরিকেরা সেবার মান সম্পর্কে মতামত দিতে এবং অনিয়মের অভিযোগ জানাতে পারবেন। এর সঙ্গে নিয়মিত জনশুনানি ও সামাজিক নিরীক্ষার ব্যবস্থা থাকতে পারে। এসব প্রক্রিয়ায় নাগরিক, নাগরিক সমাজ এবং সরকারি প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উপসংহার
গত ৩১ আগস্টের সংলাপ বাংলাদেশের স্থানীয় সরকার সংস্কারের আলোচনায় একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক স্পষ্ট করেছে। রাষ্ট্রের মূল শক্তি তার জনগণ, আর প্রযুক্তির কাজ হওয়া উচিত সেই জনগণের অধিকার, মর্যাদা ও জবাবদিহিমূলক সেবা নিশ্চিত করা।
প্রযুক্তি যেন কেবল সরকারের সক্ষমতা ও কর্তৃত্ব প্রদর্শনের মাধ্যম না হয়ে ওঠে, বরং প্রান্তিক নাগরিকের কাছে দ্রুত ও ন্যায়সংগতভাবে সেবা পৌঁছে দেওয়ার হাতিয়ার হয়, সেটিই হওয়া উচিত বাংলাদেশের ই গভর্ন্যান্সের মূল লক্ষ্য।
স্থানীয় পর্যায়ে ডিজিটাল সেবার সাফল্য তাই প্রযুক্তির ব্যবহার কতটা বেড়েছে, শুধু সেই হিসাব দিয়ে মাপা যাবে না। আসল প্রশ্ন হলো, একজন সাধারণ নাগরিক তাঁর অধিকার হিসেবে কতটা সহজে, স্বচ্ছভাবে এবং মর্যাদার সঙ্গে রাষ্ট্রীয় সেবা পাচ্ছেন।
