সিদ্দিকী বাপ্পী
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই আজ আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ হয়ে উঠেছে। চিকিৎসা থেকে শিক্ষা, ব্যবসা থেকে সৃজনশীল কাজ, প্রতিটি ক্ষেত্রে এআই মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে এবং কাজকে সহজ করে তুলছে। কিন্তু এই সুবিধার আড়ালে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ক্রমশ মাথা তুলছে, এআই-এর উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কি ধীরে ধীরে আমাদের নিজস্ব চিন্তার শক্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে?
বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মসমর্পণ: একটি নতুন উদ্বেগ
সাম্প্রতিক গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে গবেষকরা একটি নতুন প্রবণতার কথা উল্লেখ করছেন, যাকে তারা বলছেন ‘কগনিটিভ সারেন্ডার’ বা বুদ্ধিবৃত্তিক আত্মসমর্পণ। চ্যাটজিপিটির মতো লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেলের উপর ব্যাপক নির্ভরশীলতার ফলে মানুষ ধীরে ধীরে নিজে বিশ্লেষণ করার ক্ষমতা, যুক্তি দেওয়া এবং সমস্যা সমাধানের অভ্যাস হারিয়ে ফেলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, যখন প্রযুক্তি মানুষের পক্ষে চিন্তার কাজটি করে দেয় তখন মস্তিষ্ক সেই দক্ষতা ব্যবহারের সুযোগ হারায় এবং ধীরে ধীরে তার কার্যকারিতা কমে আসে।
যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটস ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির গবেষক নাতালিয়া কসমিনার একটি পর্যবেক্ষণ এই উদ্বেগকে আরও গভীর করে তুলেছে। শিক্ষার্থীদের প্রবন্ধ রচনার কাজ দিয়ে দেখা গেছে, যারা এআই ব্যবহার করেছে তাদের মস্তিষ্কের সক্রিয়তা তুলনামূলকভাবে উল্লেখযোগ্যভাবে কম ছিল। পক্ষান্তরে, যারা নিজে ভেবে লিখেছে তাদের মস্তিষ্ক অনেক বেশি সক্রিয় ছিল। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, এআই-নির্ভর শিক্ষার্থীরা পরবর্তীতে নিজেদের লেখার বিষয়বস্তুও মনে রাখতে পারছিল না যা স্মৃতিশক্তির উপর এআই-নির্ভরতার সরাসরি নেতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়।
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব: স্মৃতি, সৃজনশীলতা এবং মানসিক স্বাস্থ্য
গবেষকরা সতর্ক করছেন যে এআই-নির্ভর ‘মানসিক আলস্য’ দীর্ঘমেয়াদে স্মৃতিশক্তি ও সৃজনশীলতার উপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। কেউ কেউ এমনকি আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে এই প্রবণতা ভবিষ্যতে ডিমেনশিয়ার মতো জটিল মানসিক রোগের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে। মস্তিষ্ক একটি অনুশীলনযোগ্য অঙ্গ এটি যত বেশি ব্যবহৃত হয়, তত বেশি শক্তিশালী থাকে। কিন্তু এআই যদি ক্রমাগত সেই অনুশীলনের সুযোগ কেড়ে নেয়, তাহলে মস্তিষ্কের কার্যকারিতা ক্ষয় পাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো তরুণ প্রজন্মের ক্ষেত্রে এর প্রভাব। শিশু ও কিশোর বয়সে মস্তিষ্কের বিকাশ সবচেয়ে দ্রুত ও গভীরভাবে ঘটে। এই সময়ে যদি এআই-নির্ভরতা স্বাধীন চিন্তার জায়গা নিয়ে নেয়, তাহলে একটি গোটা প্রজন্মের সমালোচনামূলক চিন্তা ও বিশ্লেষণী দক্ষতা বিপন্ন হতে পারে।
সমাধানের পথ: ভারসাম্যই হোক লক্ষ্য
তবে বিশেষজ্ঞরা একটি গুরুত্বপূর্ণ কথাও মনে করিয়ে দিচ্ছেন এআই নিজে সমস্যা নয়, সমস্যা হলো এর অসংযত ও অসচেতন ব্যবহার। সঠিকভাবে ব্যবহার করলে এআই মানুষের দক্ষতা বৃদ্ধির একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হতে পারে। তাদের পরামর্শ হলো, শেখার প্রাথমিক পর্যায়ে নিজে ভাবার, বিশ্লেষণ করার এবং সমাধান খোঁজার চেষ্টাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। এআইকে ব্যবহার করতে হবে সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে প্রতিস্থাপক হিসেবে নয়।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, পরিবার এবং নীতিনির্ধারকদেরও এই বিষয়ে সচেতন ভূমিকা রাখতে হবে। এআই ব্যবহারের নৈতিক নির্দেশিকা তৈরি, ডিজিটাল সাক্ষরতার প্রসার এবং সৃজনশীল, সমালোচনামূলক চিন্তার চর্চাকে পাঠ্যক্রমের কেন্দ্রে রাখা এখন সময়ের দাবি। প্রযুক্তি মানুষের সেবায় থাকবে মানুষ প্রযুক্তির দাসত্বে নয়। এই ভারসাম্য রক্ষাই হোক আমাদের মূল লক্ষ্য।
