নওশিন জিনাত
ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশের টেলিভিশন সংবাদমাধ্যমে অবিরাম সংবাদ প্রচারের প্রবণতা কি শুধু সংবাদ পরিবেশনের ধরন বদলে দিয়েছে, নাকি সংবাদ এবং বাস্তবতা সম্পর্কে মানুষের ধারণাকেও প্রভাবিত করছে? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে বর্তমান সময়ের বিরামহীন সংবাদ প্রচারের সঙ্গে বিটিভির নির্দিষ্ট সময়ের সংবাদ বুলেটিনের যুগের তুলনা করা দরকার। একই খবর বারবার প্রচার, তথ্যের বিকৃতি এবং এর সামাজিক প্রভাব কতটা গভীর, তা বোঝার পাশাপাশি তথ্য মন্ত্রণালয় ও বিদ্যমান আইনি কাঠামো কীভাবে সংবাদমাধ্যমের ওপর মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে পারে, তা নিয়েও আলোচনা জরুরি।
রাত আটটা ও দশটার সংবাদ যুগ
এক প্রজন্মের মানুষের কাছে বাংলাদেশের সংবাদ দেখার সময় বলতে বোঝাত বিটিভির রাত আটটা ও দশটার সংবাদ। পরিবারের সদস্যরা একসঙ্গে বসতেন, পর্দায় সংবাদপাঠক উপস্থিত হতেন, আর দিনের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাগুলো ধারাবাহিকভাবে তুলে ধরা হতো। সেই ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা ছিল। বিটিভি ছিল রাষ্ট্রের মালিকানাধীন সম্প্রচারমাধ্যম। সেখানে প্রায়ই ক্ষমতাসীনদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ পেত, আর সরকার যেসব বিষয় আড়াল করতে চাইত, সেগুলো নিয়ে নীরবতা দেখা যেত।
তবু সেই সংবাদ পরিবেশনার কিছু ইতিবাচক দিক ছিল, যা এখন সহজেই উপেক্ষিত হয়। পর্দায় পৌঁছানোর আগে সংবাদ সম্পাদকের হাত ঘুরে আসত, বিভিন্ন সূত্রের সঙ্গে তথ্য মিলিয়ে দেখা হতো, শব্দচয়নে সতর্কতা বজায় রাখা হতো। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংবাদ প্রচার করতে হতো বলে সম্পাদকদের ঠিক করতে হতো, কোন ঘটনাগুলো সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ প্রচারের সীমিত সুযোগ একধরনের শৃঙ্খলা তৈরি করেছিল। দর্শক একটি বুলেটিন দেখেই বিশ্বাস করতে পারতেন, সেখানে প্রচারিত খবরগুলো যাচাই-বাছাই করে বেছে নেওয়া হয়েছে।
বিরামহীন সংবাদ প্রচারের শুরু
বেসরকারি স্যাটেলাইট টেলিভিশন চ্যানেল এবং পরে অনলাইন সংবাদমাধ্যমের আবির্ভাব বাংলাদেশের সংবাদজগৎকে আমূল বদলে দিয়েছে। এখন অসংখ্য টেলিভিশন চ্যানেল ঘণ্টার পর ঘণ্টা সংবাদ প্রচার করছে। ঘণ্টায় ঘণ্টায় বুলেটিন, একই শিরোনামের পুনরাবৃত্তি, পর্দার নিচে চলতে থাকা সংবাদবার্তা এবং ব্রেকিং নিউজের ব্যানারে মুখর থাকে টেলিভিশনের পর্দা।
এই প্রতিযোগিতার ইতিবাচক দিকও রয়েছে। সংবাদ এখন আরও বিস্তৃত পরিসরে পৌঁছায়, নানা ধরনের কণ্ঠস্বর সামনে আসে, দ্রুত খবর জানা যায় এবং তথ্য আড়াল করে রাখা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে পড়েছে। কিন্তু একই প্রতিযোগিতা এমন এক চাহিদাও তৈরি করেছে, যা শুধু তথ্য দিয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়।
প্রতি ঘণ্টায় নতুন বুলেটিন প্রচার করতে হলে একই খবর নতুন গ্রাফিকস ও আরও জোরালো উপস্থাপনায় বারবার দেখানো হয়। একটি সংবাদ সম্মেলন, দুর্ঘটনা কিংবা রাজনৈতিক নেতার একটি মন্তব্য সারাদিন সংবাদমাধ্যমের আলোচনার কেন্দ্রে থাকতে পারে। বারবার প্রচারের ফলে ঘটনাটি বাস্তবের তুলনায় অনেক বড় বলে মনে হতে থাকে।
এর পেছনে মনস্তাত্ত্বিক প্রভাবও রয়েছে। মানুষ যে কথা বারবার শোনে, সেটিকে সত্য বলে ধরে নেওয়ার প্রবণতা তৈরি হতে পারে। একইভাবে, কোনো ঘটনা যত বেশি দেখানো হয়, মানুষের কাছে সেটি তত বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে হতে পারে। অথচ জনস্বাস্থ্য, স্থানীয় সরকারের বাজেট, শিক্ষার মান এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো যথেষ্ট মনোযোগ পায় না। এসব বিষয়ে নাটকীয় দৃশ্য কম, তাৎক্ষণিক উত্তেজনাও কম। ফলে দ্রুত দর্শকের মনোযোগ আকর্ষণের প্রতিযোগিতায় এগুলো পিছিয়ে পড়ে।
দ্রুততার চাপে নির্ভুলতা
সবার আগে খবর দেওয়ার প্রতিযোগিতা তথ্য যাচাইয়ের প্রক্রিয়াকে দুর্বল করে দেয়। গুজব ব্রেকিং নিউজ হিসেবে প্রচারিত হয়, এক বুলেটিন থেকে আরেক বুলেটিনে হতাহতের সংখ্যা বদলে যায়, আর যাচাই না করা বক্তব্য কখনো সতর্কীকরণসহ, কখনো কোনো সংশোধন ছাড়াই প্রচারিত হয়।
টক শোতেও অনেক সময় তথ্যের চেয়ে তর্ক-বিতর্ক বেশি গুরুত্ব পায়। আলোচনায় অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা নানা দাবি করেন, কিন্তু সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের জন্য যথেষ্ট প্রশ্ন তোলা হয় না। চটকদার শিরোনাম ও উত্তেজক আবহসংগীত সংবাদকে তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদন থেকে বিনোদনমূলক পরিবেশনার দিকে ঠেলে দেয়। ভুলের জন্য পরে সংশোধনী প্রকাশ করা হলেও তা সাধারণত মূল খবরের মতো গুরুত্ব পায় না।
ফলে মানুষ তাড়াহুড়ো করে তৈরি হওয়া ধারণার ভিত্তিতে ঘটনা বিচার করতে শুরু করে। সংবাদমাধ্যমের ওপর আস্থা কমে গেলে অনেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের গুজবের দিকে ঝোঁকেন, যেখানে খবর আরও দ্রুত ছড়ায়, কিন্তু জবাবদিহির সুযোগ কম থাকে।
বাণিজ্যিক চাপও সমস্যাকে বাড়িয়ে তোলে। দর্শকসংখ্যা ও বিজ্ঞাপনের আয় বাড়াতে আবেগনির্ভর সংবাদকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। সংবাদমাধ্যমের মালিকদের ব্যবসায়িক বা রাজনৈতিক স্বার্থও কোন খবর বেশি প্রচারিত হবে আর কোনটি আড়ালে থাকবে, তা প্রভাবিত করতে পারে। সংবাদ বিকৃত করার জন্য সব সময় সরাসরি মিথ্যা বলার প্রয়োজন হয় না। কোনো ঘটনার একটি দিককে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া, প্রয়োজনীয় প্রেক্ষাপট বাদ দেওয়া কিংবা একই ধরনের ব্যাখ্যা বারবার তুলে ধরাও মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে।
আইন ও তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা
লাইসেন্স প্রদান, নীতিমালা প্রণয়ন এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমের তদারকির মাধ্যমে তথ্য মন্ত্রণালয় সংবাদজগতে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রাখে। তবে জনস্বার্থ রক্ষা করতে গিয়ে মন্ত্রণালয় যেন সংবাদমাধ্যমের ওপর অযাচিত নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করে, সেই ভারসাম্য বজায় রাখা জরুরি। অতীতে সমালোচনামূলক সংবাদমাধ্যমের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং সরকারের ঘনিষ্ঠ সংবাদমাধ্যমকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ জনআস্থাকে দুর্বল করেছে।
তথ্য মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা হওয়া উচিত নিরপেক্ষভাবে সংবাদমাধ্যমের বিকাশে সহায়তা করা। লাইসেন্স প্রদানের প্রক্রিয়া স্বচ্ছ রাখা, সংবাদ পরিবেশনের স্পষ্ট মানদণ্ড নির্ধারণ, সাংবাদিকদের প্রশিক্ষণে সহায়তা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদমাধ্যমে প্রচারণার বদলে নির্ভুল ও ভারসাম্যপূর্ণ সংবাদ নিশ্চিত করা জরুরি।
আগের নির্দিষ্ট সময়ের সংবাদ বুলেটিনের যুগ থেকে শিক্ষা নিয়ে স্বাধীন জনসেবামূলক সম্প্রচারব্যবস্থা শক্তিশালী করা যেতে পারে। এমন একটি সম্প্রচারমাধ্যম গড়ে তোলা দরকার, যা দর্শকদের কাছে নির্ভরযোগ্য তথ্যের মানদণ্ড হিসেবে কাজ করবে, তবে সরকারের বক্তব্য প্রচারের মাধ্যম হয়ে উঠবে না।
বাংলাদেশের সংবিধানে যুক্তিসংগত বিধিনিষেধ সাপেক্ষে বাক্স্বাধীনতা ও সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা হয়েছে। দেশে তথ্য অধিকার আইন, প্রেস কাউন্সিল এবং জাতীয় সম্প্রচার নীতিমালাও রয়েছে। তবে বিদ্যমান আইনি কাঠামো বিভিন্ন অংশে বিভক্ত। সম্প্রচার, অনলাইন বিষয়বস্তু ও মানহানি নিয়ে একাধিক বিধান থাকায় আইন প্রয়োগে অসংগতি এবং বেছে বেছে ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়। ফৌজদারি আইনের কিছু বিধান প্রকৃত মিথ্যাচারের জবাবদিহি নিশ্চিত করার বদলে সাংবাদিকদের প্রতিবেদন প্রকাশ থেকে বিরত রাখার হাতিয়ার হয়ে উঠতে পারে।
তাই সংস্কারের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের যেন খেয়ালখুশিমতো গ্রেপ্তার করা না যায়, তা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে জবাবদিহি বাড়ানোর জন্য স্বাধীন আইনি ভিত্তিসম্পন্ন সম্প্রচার কমিশন গঠন করা যেতে পারে। সংবাদ সংশোধনের নিয়ম, প্রতিবাদ বা জবাব দেওয়ার অধিকার, বিজ্ঞাপন ও সংবাদকে আলাদা রাখা এবং সংবাদমাধ্যমের মালিকানার তথ্য প্রকাশের মতো বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করা দরকার। সম্পাদকদের নেতৃত্বে স্বনিয়ন্ত্রণব্যবস্থা, জনসাধারণের অভিযোগ জানানোর সুযোগ এবং নিয়মিত নিরীক্ষা এই আইনি কাঠামোকে আরও কার্যকর করতে পারে।
উপসংহার
রাত আটটার সংবাদের প্রতি নস্টালজিয়া যেন রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে আনার দাবিতে পরিণত না হয়। পুরোনো বুলেটিনে শৃঙ্খলা ছিল, কিন্তু ক্ষমতাসীনদের প্রতি অতিরিক্ত আনুগত্যও ছিল। সেই সময় থেকে শিক্ষা নেওয়ার অর্থ সংবাদমাধ্যমকে আবার নীরব করে দেওয়া নয়, বরং সংবাদ পরিবেশনের মান ফিরিয়ে আনা।
সংবাদ প্রচারের ব্যাপকতা ও নির্ভরযোগ্যতা পাশাপাশি থাকতে পারে। তার জন্য সম্পাদকদের সময়ের সঙ্গে পাল্লা দেওয়ার চাপের কাছে নতি স্বীকার না করে তথ্য যাচাইকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোকে স্বাধীনতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে কাজ করতে হবে। আর আইনকে এমনভাবে প্রয়োগ করতে হবে, যাতে সৎ সাংবাদিকতা সুরক্ষা পায় এবং ইচ্ছাকৃত মিথ্যাচারের জন্য জবাবদিহি নিশ্চিত হয়। সমস্যা ঘন ঘন সংবাদ প্রচারে নয়, সমস্যা অসতর্কতায়।
