নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষা শুধু উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের একটি প্রক্রিয়া নয়; এটি প্রতি বছর কয়েক লাখ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ নির্ধারণকারী একটি গুরুত্বপূর্ণ জাতীয় ব্যবস্থা। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত ভর্তি কাঠামো নিয়ে শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষাবিদদের মধ্যে অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। বর্তমান ব্যবস্থায় অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত মেধা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা ও দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত অর্জনের চেয়ে পরীক্ষাভিত্তিক কৌশল, দ্রুত উত্তর দেওয়ার দক্ষতা এবং কোচিংনির্ভর প্রস্তুতি অধিক গুরুত্ব পায়। ফলে ভর্তি পরীক্ষা ধীরে ধীরে একটি প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পরিণত হয়েছে, যা শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষাব্যবস্থার মৌলিক উদ্দেশ্যকেও প্রশ্নবিদ্ধ করছে।
বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর, অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন করতে হলে বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার এখন সময়ের দাবি। একটি আধুনিক ভর্তি ব্যবস্থা এমন হওয়া উচিত, যা শিক্ষার্থীর প্রকৃত যোগ্যতা মূল্যায়ন করবে, সামাজিক বৈষম্য কমাবে এবং উচ্চশিক্ষাকে সবার জন্য আরও সহজলভ্য ও বিশ্বাসযোগ্য করে তুলবে। তাই সঙ্গত কারণেই আমি বাংলাদেশের ভর্তি পরীক্ষার বর্তমান ধরণ, এর নেতিবাচক প্রভাব এবং প্রয়োজনীয় সংস্করণ নিয়ে আলোচনা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছি।
বিচ্ছিন্ন ভর্তি ব্যবস্থা: শিক্ষার্থীদের অপ্রয়োজনীয় চাপ
বর্তমান ভর্তি ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো এর বিচ্ছিন্ন কাঠামো। দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল কলেজ এবং অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান পৃথক নিয়ম, পৃথক প্রশ্নপদ্ধতি ও পৃথক সময়সূচি অনুসরণ করে ভর্তি পরীক্ষা নেয়। ফলে একজন শিক্ষার্থীকে একই সময়ে একাধিক পরীক্ষার জন্য প্রস্তুতি নিতে হয়, বিভিন্ন শহরে ভ্রমণ করতে হয় এবং বারবার আবেদন ফি ও যাতায়াত ব্যয় বহন করতে হয়।
এই পরিস্থিতি আর্থিকভাবে সচ্ছল পরিবারের শিক্ষার্থীদের তুলনায় গ্রামীণ ও নিম্নআয়ের শিক্ষার্থীদের জন্য অনেক বেশি প্রতিকূল। ফলে উচ্চশিক্ষায় প্রবেশের সুযোগে বৈষম্য আরও গভীর হয়।
একটি সমন্বিত বা অভিন্ন ভর্তি কাঠামো এই সমস্যার কার্যকর সমাধান হতে পারে। এর অর্থ এই নয় যে সব বিশ্ববিদ্যালয় তাদের স্বাতন্ত্র্য হারাবে। বরং একটি অভিন্ন প্রাথমিক ভর্তি পরীক্ষা, সমন্বিত সময়সূচি অথবা সাধারণ মূল্যায়ন কাঠামোর মাধ্যমে প্রশাসনিক জটিলতা কমিয়ে প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তী ধাপে নিজস্ব বিষয়ভিত্তিক মূল্যায়নের সুযোগ রাখতে পারে। এতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক এবং বিশ্ববিদ্যালয়, সবার সময়, অর্থ ও শ্রম সাশ্রয় হবে।
ভর্তি পরীক্ষা হোক প্রকৃত যোগ্যতার মূল্যায়নের মাধ্যম
বর্তমান ভর্তি পরীক্ষার আরেকটি বড় সীমাবদ্ধতা হলো প্রশ্নপদ্ধতির মান। অনেক ক্ষেত্রে পরীক্ষায় ভালো ফল করতে হলে বিষয়বস্তুর গভীর জ্ঞান নয়, বরং শর্টকাট কৌশল, মুখস্থভিত্তিক প্রস্তুতি এবং কোচিং সেন্টারের বিশেষ নোটের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে পরীক্ষার মূল উদ্দেশ্য, প্রকৃত মেধা ও সম্ভাবনা মূল্যায়ন, ব্যাহত হয়।
আধুনিক ভর্তি পরীক্ষার লক্ষ্য হওয়া উচিত বিশ্লেষণী চিন্তাশক্তি, সমস্যা সমাধানের দক্ষতা, বিষয়ভিত্তিক ধারণা এবং বাস্তব পরিস্থিতিতে জ্ঞান প্রয়োগের সক্ষমতা যাচাই করা। যেখানে প্রয়োজন সেখানে লিখিত মূল্যায়ন ও যুক্তিনির্ভর প্রশ্নেরও গুরুত্ব বাড়ানো যেতে পারে।
এ ধরনের পরিবর্তন স্কুল ও কলেজ পর্যায়ের শিক্ষার মান উন্নয়নেও ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। কারণ শিক্ষার্থীরা তখন কোচিংনির্ভর মুখস্থবিদ্যার পরিবর্তে পাঠ্যবস্তুর গভীর উপলব্ধি ও বিশ্লেষণধর্মী শিক্ষার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেবে। একই সঙ্গে বিদ্যালয় ও কলেজের শিক্ষকদের ভূমিকা পুনরায় শক্তিশালী হবে।
দীর্ঘমেয়াদি শিক্ষাগত অর্জনের মূল্যায়ন জরুরী
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কেবল একটি দিনের পরীক্ষার ওপর নির্ভরশীল হওয়া উচিত নয়। পরীক্ষার দিন শারীরিক অসুস্থতা, মানসিক চাপ, যাতায়াতজনিত ক্লান্তি কিংবা অন্য যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর ফলাফলকে প্রভাবিত করতে পারে।
সেজন্য ভর্তি পরীক্ষার পাশাপাশি এসএসসি ও এইচএসসি পর্যায়ের ধারাবাহিক শিক্ষাগত অর্জনকেও নির্দিষ্ট ওজনের ভিত্তিতে মূল্যায়নের আওতায় আনা যেতে পারে। এতে শিক্ষার্থীরা দীর্ঘমেয়াদি অধ্যবসায়, নিয়মিত অধ্যয়ন ও ধারাবাহিক ভালো ফলাফলের স্বীকৃতি পাবে।
তবে এ ক্ষেত্রে বিভিন্ন শিক্ষা বোর্ডের ফলাফলের বৈচিত্র্য এবং সম্ভাব্য গ্রেড ইনফ্লেশনের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে একটি মানসম্মত মডারেশন ব্যবস্থা ও স্বচ্ছ মূল্যায়ন নীতি গ্রহণ করতে হবে। এতে একদিকে যেমন ন্যায়সংগত নির্বাচন নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে বিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার গুরুত্বও বৃদ্ধি পাবে।
স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে
যেকোনো ভর্তি ব্যবস্থার প্রতি জনগণের আস্থা নির্ভর করে তার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ওপর। ভর্তি পরীক্ষার নম্বর গণনার পদ্ধতি, মেধাতালিকা প্রস্তুত, কোটার ব্যবহার, সমান নম্বরপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের নির্বাচন এবং চূড়ান্ত ফল প্রকাশের প্রক্রিয়া সম্পর্কে পরিষ্কার নির্দেশনা না থাকলে বিভ্রান্তি ও অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়।
প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উচিত সহজ ভাষায় পূর্ণাঙ্গ ভর্তি নির্দেশিকা প্রকাশ করা, যেখানে যোগ্যতার মানদণ্ড, প্রশ্নের ধরন, নম্বর বণ্টন, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং ভর্তি প্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপ স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা থাকবে। একই সঙ্গে প্রশাসনিক ত্রুটি সংশোধনের জন্য কার্যকর আপিল বা পুনর্বিবেচনা ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন।
ডিজিটাল প্রযুক্তির যথাযথ ব্যবহারও এই ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। অনলাইন আবেদন, নিরাপদ ফলাফল প্রকাশ, ডিজিটাল প্রবেশপত্র এবং সময়োপযোগী তথ্যপ্রদান শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি কমাতে পারে। তবে প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাকে এমনভাবে পরিচালনা করতে হবে, যাতে শহরকেন্দ্রীক এবং প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা সমানভাবে সেবা পায়।
ভর্তি কেন্দ্রিক পরীক্ষায় থাকতে হবে সমতা
বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা সমান সুযোগ নিয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে না। গ্রামীণ অঞ্চল, নিম্নআয়ের পরিবার এবং প্রথম প্রজন্মের বিশ্ববিদ্যালয়গামী শিক্ষার্থীরা শুরু থেকেই নানা ধরনের কাঠামোগত অসুবিধার মুখোমুখি হয়। তাই শুধুমাত্র পরীক্ষার ধরন পরিবর্তন করলেই কাঙ্ক্ষিত সংস্কার সম্ভব নয়।
ভর্তি ফি সহনীয় পর্যায়ে রাখা, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পর্যাপ্ত পরীক্ষা কেন্দ্র স্থাপন, সরকারি উদ্যোগে বিনামূল্যে প্রস্তুতিমূলক পাঠসামগ্রী প্রকাশ, অনলাইন ক্লাস, মডেল টেস্ট এবং ক্যারিয়ার নির্দেশনা কার্যক্রম পরিচালনা, এসব উদ্যোগ কোচিংনির্ভরতা কমাতে এবং সুযোগের বৈষম্য হ্রাস করতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ এমন হওয়া উচিত, যেখানে একজন শিক্ষার্থীর সাফল্য তার আর্থিক সামর্থ্য, ভৌগোলিক অবস্থান বা সামাজিক সুবিধার ওপর নয়; বরং তার মেধা, অধ্যবসায় ও সম্ভাবনার ওপর নির্ভর করবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষা আরও কঠিন হওয়ার প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন আরও ন্যায়সংগত, বিজ্ঞানভিত্তিক ও মানবিক হওয়ার। উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্য কেবল সীমিত সংখ্যক শিক্ষার্থীকে বাছাই করা নয়; বরং দেশের সর্বত্র ছড়িয়ে থাকা প্রকৃত মেধা ও সম্ভাবনাকে সঠিকভাবে চিহ্নিত করা এবং তাদের জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।
সমন্বিত ভর্তি কাঠামো, উন্নত প্রশ্নপদ্ধতি, ধারাবাহিক শিক্ষাগত অর্জনের মূল্যায়ন, স্বচ্ছ প্রশাসনিক ব্যবস্থা এবং সামাজিক সমতা নিশ্চিত করার মাধ্যমে বাংলাদেশ এমন একটি ভর্তি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারে, যা শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় এবং সমাজ, সবার কাছে গ্রহণযোগ্য ও বিশ্বাসযোগ্য হবে।
উচ্চশিক্ষা একটি জাতির মানবসম্পদ উন্নয়নের প্রধান ভিত্তি। তাই বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সংস্কারকে কেবল প্রশাসনিক পরিবর্তন হিসেবে নয়, বরং জাতীয় শিক্ষা সংস্কারের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করার সময় এখনই।
