বর্ণা আহমেদ
বার্গফিল্ড সেইন্ট মেরি স্কুল, যুক্তরাজ্য
বাংলাদেশ বর্তমানে তার পাবলিক পরীক্ষা ব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ পুনর্গঠনের কথা বিবেচনা করছে। মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) এবং উচ্চ মাধ্যমিক সার্টিফিকেট (এইচএসসি) পর্যায়ে পরীক্ষার বিষয়সংখ্যা কমানো এবং পরীক্ষার সময়সূচি সংক্ষিপ্ত করার প্রস্তাব সামনে এসেছে। শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমানো এবং পাঠদান কার্যক্রমে বিঘ্ন হ্রাস করাই এর মূল উদ্দেশ্য। তবে এই উদ্যোগ যতই প্রশংসনীয় হোক না কেন, শিক্ষার্থীরা কী শিখবে, কত গভীরভাবে শিখবে এবং পরবর্তী শিক্ষাজীবনের জন্য কতটা প্রস্তুত হবে, সেই প্রশ্নগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনার দাবি রাখে।
জ্ঞান ও দক্ষতার সম্ভাব্য ঝুঁকি
পরীক্ষার বিষয়সংখ্যা কমানোর সবচেয়ে তাৎক্ষণিক প্রভাব হবে শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপরিসর সংকুচিত হয়ে যাওয়া। কোনো বিষয় যখন পরীক্ষার আওতার বাইরে চলে যায়, তখন স্কুল, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা স্বাভাবিকভাবেই সেই বিষয়ে মনোযোগ কমিয়ে দেয়। ফলে পরীক্ষার বাইরে থাকা বিষয়গুলো, সেগুলোর শিক্ষাগত গুরুত্ব যতই থাকুক না কেন, ধীরে ধীরে প্রান্তিক হয়ে পড়ে। যে শিক্ষার্থী কখনো ইতিহাস, ভূগোল বা নাগরিক শিক্ষা বিষয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করে না, সে হয়তো এসব বিষয়ে মৌলিক জ্ঞানই অর্জন করতে পারবে না। এর ফলে ভবিষ্যতে গ্রীষ্মকালীন চাকরি, স্বেচ্ছাসেবামূলক কাজ বা জীবনবৃত্তান্ত সমৃদ্ধ করার জন্য প্রয়োজনীয় কাজের অভিজ্ঞতা অর্জনের ক্ষেত্রেও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি দেখা দিতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে এই প্রবণতা এমন একটি প্রজন্ম তৈরি করতে পারে, যাদের সাধারণ জ্ঞান এবং সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তিতে উল্লেখযোগ্য ঘাটতি থাকবে, যা কোনো নির্দিষ্ট বিষয়ের সীমারেখা অতিক্রম করে সামগ্রিক নাগরিক সক্ষমতাকেই প্রভাবিত করবে।
বিষয়ভিত্তিক জ্ঞানের বাইরে বর্তমান পরীক্ষা ব্যবস্থা, এর নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও, শিক্ষার্থীদের মধ্যে একগুচ্ছ গুরুত্বপূর্ণ বুদ্ধিবৃত্তিক দক্ষতা গড়ে তোলে। দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা, একাধিক বিষয় থেকে তথ্য বিশ্লেষণ ও সমন্বয় করা, চাপের মধ্যে সময় ব্যবস্থাপনা এবং বিস্তৃত পরিসরে প্রস্তুতি নেওয়ার অভ্যাস এর মধ্যে অন্যতম। পরীক্ষার সময়কাল সংক্ষিপ্ত করা এবং বিষয়সংখ্যা কমিয়ে আনা এই দক্ষতাগুলো গড়ে ওঠার পরিবেশকেই সীমিত করে দেয়। সংক্ষিপ্ত পরীক্ষার সময়সূচি শিক্ষার্থীদের জন্য আনুষ্ঠানিক মূল্যায়নের অভিজ্ঞতা কমিয়ে দেয়, বিভিন্ন ধরনের প্রশ্নের মুখোমুখি হওয়ার সুযোগ হ্রাস করে এবং দীর্ঘ ও চ্যালেঞ্জিং পরীক্ষায় নিজের গতি নিয়ন্ত্রণের অভ্যাস দুর্বল করে। এগুলো কেবল পরীক্ষার কৌশল নয়; বরং উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত জীবনে প্রয়োজনীয় স্থানান্তরযোগ্য দক্ষতা।
উচ্চশিক্ষায় সম্ভাব্য প্রভাব
বাংলাদেশে এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখন বিশেষায়নের পাশাপাশি বিষয়ভিত্তিক বিস্তৃত জ্ঞানকেও গুরুত্ব দেয়। দেশীয় ও আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষাগুলো প্রায়ই ধরে নেয় যে শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক পর্যায়ে বিভিন্ন বিষয়ে মৌলিক জ্ঞান রয়েছে। যেসব শিক্ষার্থী সীমিত সংখ্যক বিষয়ে পরীক্ষা দেবে, তারা অনেক ক্ষেত্রে ভর্তি প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়তে পারে। কোনো শিক্ষার্থী যদি অল্প বয়সেই পরীক্ষার সুবিধার্থে বিজ্ঞান বিষয়গুলো থেকে সরে আসে, তাহলে পরবর্তীতে প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানভিত্তিক উচ্চশিক্ষার পথ তার জন্য কার্যত বন্ধ হয়ে যেতে পারে। এমনকি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতা পেশায় প্রবেশের ক্ষেত্রেও বিজ্ঞান বিষয়ে প্রয়োজনীয় মানদণ্ড পূরণ না করার কারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হতে পারে।
অন্যদিকে, বিস্তৃত ও সমন্বিত পরীক্ষার জন্য যে কঠোর অধ্যয়ন অভ্যাস গড়ে ওঠে, তা শিক্ষার্থীদের মানসিক দৃঢ়তা ও বুদ্ধিবৃত্তিক সহনশীলতা বৃদ্ধি করে। যদি পরীক্ষার চাপ কমানো হয় কিন্তু একই সঙ্গে পাঠদানের মান বা বিকল্প মূল্যায়ন পদ্ধতির উন্নয়ন না ঘটে, তাহলে ঝুঁকি শুধু জ্ঞানের ঘাটতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং শিক্ষার্থীদের অধ্যয়ন অভ্যাসও দুর্বল হয়ে পড়বে। ফলে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদি স্বশিক্ষা, গবেষণা এবং বিশ্লেষণধর্মী লেখালেখির জন্য যথেষ্ট প্রস্তুত নাও থাকতে পারে। এর ফলে বিদ্যালয় পর্যায়ের প্রস্তুতি এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যাশার মধ্যে ব্যবধান আরও বৃদ্ধি পাবে, যা পূরণ করতে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোকে অতিরিক্ত চাপ বহন করতে হবে।
বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থী এবং যৌক্তিক সহায়তার চ্যালেঞ্জ
পরীক্ষা ব্যবস্থার যেকোনো সংস্কারকে অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী, শ্রবণপ্রতিবন্ধী, অটিজম স্পেকট্রামভুক্ত, শেখার ক্ষেত্রে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন এবং শারীরিক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা ইতোমধ্যেই পাবলিক পরীক্ষায় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হয়। বর্তমান ব্যবস্থা, যদিও নিখুঁত নয়, তবুও কিছু সহায়ক সুবিধা প্রদান করে। যেমন অতিরিক্ত সময়, লেখক সহায়তা, বড় অক্ষরের প্রশ্নপত্র এবং পৃথক পরীক্ষাকেন্দ্র। এই সুবিধাগুলো বিদ্যমান পরীক্ষা কাঠামোর সময়কাল, বিষয়বিন্যাস এবং সময়সূচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নির্ধারিত হয়েছে। পরীক্ষার সময়কাল সংক্ষিপ্ত করা এবং বিষয়সংখ্যা কমিয়ে আনা নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি করতে পারে। যদি পরীক্ষার সময়সূচি আরও ঘন হয়ে যায়, তাহলে অতিরিক্ত সময় প্রয়োজন এমন শিক্ষার্থীদের জন্য প্রয়োজনীয় সমন্বয় কার্যকর রাখা কঠিন হয়ে পড়বে। যে শিক্ষার্থী তিন ঘণ্টার পরীক্ষায় অতিরিক্ত পঁচিশ শতাংশ সময় পায়, তার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন হবে যদি পরীক্ষার সময় কমে দেড় ঘণ্টায় নেমে আসে এবং একই দিনে একাধিক পরীক্ষা নির্ধারিত হয়।
অটিজম স্পেকট্রামভুক্ত শিক্ষার্থী বা উদ্বেগজনিত সমস্যায় আক্রান্ত অনেক শিক্ষার্থী পরিচিত পরিবেশ ও পূর্বনির্ধারিত রুটিনের ওপর নির্ভরশীল। পরীক্ষার ধরন পরিবর্তন, বিষয়সংখ্যা হ্রাস এবং সময়সূচি সংকুচিত করা সেই স্থিতিশীলতাকে ব্যাহত করতে পারে, যা পরিবার ও বিদ্যালয় দীর্ঘদিন ধরে গড়ে তুলেছে। নম্বর বা গ্রেড নির্ধারণ পদ্ধতিতে পরিবর্তনও তাদের মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। যৌক্তিক সহায়তা কোনো আনুষ্ঠানিকতার বিষয় নয়; পরীক্ষা কাঠামো পরিবর্তিত হলে সেই সহায়তা ব্যবস্থাকেও সমানভাবে পুনর্মূল্যায়ন করতে হয়। যথাযথ পরিকল্পনা ছাড়া প্রতিটি সংস্কার পুরোনো প্রতিবন্ধকতা দূর করার পাশাপাশি নতুন প্রতিবন্ধকতাও সৃষ্টি করতে পারে।
যৌক্তিক সহায়তা নিশ্চিত করা কেবল আইনগত দায়িত্ব নয়, এটি একটি নৈতিক দায়িত্বও। তাই পরীক্ষা সংক্ষিপ্ত করার যেকোনো উদ্যোগের সঙ্গে সমান্তরালভাবে প্রতিটি সহায়তা ব্যবস্থার পুনর্বিবেচনা জরুরি। এর অর্থ হলো নীতিনির্ধারণের আগে প্রতিবন্ধী অধিকার সংগঠন, বিশেষ শিক্ষা বিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট পরিবারগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করা। এর অর্থ হলো বিভিন্ন ধরনের শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে নতুন পদ্ধতি প্রয়োগ করা এবং বর্তমান সহায়তাগুলো যথেষ্ট কি না, তার প্রমাণভিত্তিক মূল্যায়ন করা। একই সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে যে যৌক্তিক সহায়তার সংজ্ঞা পরীক্ষা ব্যবস্থার পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বিকশিত হবে, পিছিয়ে থাকবে না।
পরিমিত ও বিচক্ষণ সংস্কারের আহ্বান
শিক্ষার্থীদের মানসিক চাপ কমানো এবং পাঠদানের জন্য আরও সময় ফিরিয়ে আনা অবশ্যই প্রশংসনীয় লক্ষ্য। তবে সেই সংস্কার যেন জ্ঞানের পরিধি, দক্ষতার বিকাশ, উচ্চশিক্ষার প্রস্তুতি কিংবা সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ শিক্ষার্থীদের অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে কোনো সংকোচন সৃষ্টি না করে। বাংলাদেশের প্রয়োজন কেবল কম পরীক্ষা নয়, বরং আরও উন্নত পরীক্ষা ব্যবস্থা। এমন একটি ব্যবস্থা, যা শক্তিশালী সহায়ক কাঠামো, শিক্ষার্থীদের বহুমাত্রিক দক্ষতার মূল্যায়ন এবং কোনো শিক্ষার্থী যেন সংস্কারের কারণে পিছিয়ে না পড়ে, সেই অঙ্গীকারের ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে।
সম্পর্কিত সংবাদ:
https://www.thedailystar.net/news/education/news/plan-underway-shorten-ssc-hsc-exams-4192446
