নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশকে দীর্ঘদিন ধরেই উন্নয়নের এক উল্লেখযোগ্য সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার পর যুদ্ধবিধ্বস্ত ও স্বল্প আয়ের দেশ থেকে আজ বাংলাদেশ নিম্ন-মধ্যম আয়ের অর্থনীতিতে পরিণত হয়েছে। স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির বিভিন্ন সূচকে দেশটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। এই অগ্রযাত্রার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক হলো সাক্ষরতার হার, বিশেষ করে প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতা, যা দেশের মানবসম্পদ উন্নয়নের ভিত্তি হিসেবে কাজ করে। তবে সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান বাংলাদেশের সাক্ষরতার ক্ষেত্রে যেমন আশাব্যঞ্জক অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে, তেমনি শিক্ষার গুণগত মান ও কার্যকর সাক্ষরতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্নও উত্থাপন করে।
বর্তমান চিত্র: (পরিসংখ্যানের উন্নতি, দক্ষতার সীমাবদ্ধতা)
বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সমীক্ষা ২০২৪ অনুযায়ী, সাত বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর সাক্ষরতার হার প্রায় ৭৭.৯ শতাংশ, যা ২০২২ সালের ৭৬.৮ শতাংশ থেকে সামান্য বৃদ্ধি পেয়েছে। অন্যদিকে, ১৫ বছর ও তদূর্ধ্ব জনগোষ্ঠীর ক্ষেত্রে বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার ২০২২ সালে প্রায় ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে। এই অর্জনের গুরুত্ব উপলব্ধি করতে হলে অতীতের দিকে তাকাতে হয়। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার ছিল মাত্র ৩৫ শতাংশ। অর্থাৎ তিন দশকের কিছু বেশি সময়ে দেশটি সাক্ষর জনগোষ্ঠীর হার দ্বিগুণেরও বেশি বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়েছে, যা আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি উল্লেখযোগ্য সাফল্য হিসেবে বিবেচিত হয়।
কিন্তু এই ইতিবাচক পরিসংখ্যানের আড়ালে রয়েছে একটি জটিল বাস্তবতা। কার্যকর বা ফাংশনাল সাক্ষরতা, অর্থাৎ দৈনন্দিন জীবনে অর্থপূর্ণভাবে পড়তে, লিখতে এবং মৌলিক গণনা করতে পারার সক্ষমতা, এখনও অনেকাংশে সীমিত। বিশ্বব্যাংকের ২০২৪ সালের এক বিশ্লেষণে দেখা যায়, বাংলাদেশের ৫১.২ শতাংশ কিশোর-কিশোরী “লার্নিং পভার্টি” বা শিক্ষাগত দারিদ্র্যের মধ্যে রয়েছে। অর্থাৎ তারা নিজেদের বয়সোপযোগী একটি সাধারণ পাঠ্যও যথাযথভাবে পড়তে পারে না।
জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন (National Student Assessment) ২০২২-এর ফলাফলও একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করে। সেখানে দেখা গেছে, অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষার পাঁচ বছর সম্পন্ন করার পরও একটি ছোট অনুচ্ছেদ সাবলীলভাবে পড়তে, একটি সাধারণ বার্তা লিখতে কিংবা প্রাথমিক গাণিতিক সমস্যার সমাধান করতে সক্ষম নয়। ফলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, সরকারি সাক্ষরতার হার কি বাস্তব দক্ষতার প্রতিফলন ঘটায়?
উন্নয়ন সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান
সাক্ষরতা ও শিক্ষার অগ্রগতি বাংলাদেশের মানব উন্নয়ন সূচক (HDI)-এও প্রতিফলিত হয়েছে। ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের এইচডিআই স্কোর ছিল ০.৩৯৪, যা ২০১৯ সালে বৃদ্ধি পেয়ে ০.৬৩২-এ পৌঁছায়। এই সময়ে মানব উন্নয়নের ক্ষেত্রে সবচেয়ে দ্রুত অগ্রগতি অর্জনকারী দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ বিশ্বের শীর্ষ কয়েকটির একটি হিসেবে স্বীকৃতি পায়। জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (UNDP) ২০২১/২০২২ মানব উন্নয়ন প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ১৯১টি দেশের মধ্যে ১২৯তম স্থান অর্জন করে। শিক্ষা ও জ্ঞানভিত্তিক সূচকে বাংলাদেশের গড় শিক্ষাবর্ষ ৬.২ বছর, যা পাকিস্তান ও নেপালের তুলনায় বেশি। বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য হলো নারী শিক্ষায় অগ্রগতি। মাধ্যমিক পর্যায়ে ছেলে ও মেয়েদের ভর্তি হার প্রায় সমপর্যায়ে পৌঁছেছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় এগিয়ে থাকার প্রমাণ বহন করে।
তবে এই সাফল্যের মধ্যেও বৈষম্য রয়ে গেছে। অঞ্চলভেদে সাক্ষরতার হারে উল্লেখযোগ্য পার্থক্য দেখা যায়। একদিকে বরিশাল অঞ্চলে সাক্ষরতার হার ৭৫ শতাংশের কাছাকাছি, অন্যদিকে সিলেট অঞ্চলে তা প্রায় ৬০ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। একইভাবে নারী ও পুরুষের শিক্ষাজীবনের গড় দৈর্ঘ্যের মধ্যেও পার্থক্য বিদ্যমান। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অসমতা বিবেচনায় নেওয়ার পর বাংলাদেশের এইচডিআই মূল্যমান প্রায় ২৪ শতাংশ হ্রাস পায়। এটি নির্দেশ করে যে শিক্ষা ও সাক্ষরতার সুফল দেশের সব শ্রেণি, অঞ্চল ও জনগোষ্ঠীর মধ্যে সমানভাবে পৌঁছায়নি।
কেন কার্যকর সাক্ষরতা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ
বাংলাদেশে সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে এখন মূল চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা। শুধুমাত্র বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়া বা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়া একজন মানুষকে কার্যকরভাবে যোগ্য করে তোলে না। বর্তমান শ্রমবাজার, ডিজিটাল অর্থনীতি এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজে টিকে থাকতে হলে মানুষের বিশ্লেষণী ক্ষমতা, পাঠদক্ষতা, যোগাযোগ দক্ষতা এবং মৌলিক প্রযুক্তিগত জ্ঞান থাকা অপরিহার্য। অথচ শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখনও এই মৌলিক দক্ষতাগুলো অর্জন করতে পারছে না। এর ফলে শিক্ষা ব্যবস্থার সম্প্রসারণ সত্ত্বেও মানবসম্পদের গুণগত উন্নয়ন কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছাচ্ছে না।
প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার
বাংলাদেশকে প্রকৃত অর্থে সাক্ষর ও দক্ষ জনগোষ্ঠী গড়ে তুলতে হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরী।
প্রথমত, সাক্ষরতার সংজ্ঞা ও পরিমাপ পদ্ধতি পুনর্বিবেচনা করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসারে কার্যকর সাক্ষরতার মূল্যায়ন চালু করা প্রয়োজন, যাতে বাস্তব দক্ষতার চিত্র স্পষ্টভাবে উঠে আসে।
দ্বিতীয়ত, উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোকে (BNFE) আরও শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হবে। প্রাপ্তবয়স্ক শিক্ষা কর্মসূচির সঙ্গে জীবনদক্ষতা, আর্থিক শিক্ষা, ডিজিটাল সাক্ষরতা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণ যুক্ত করা জরুরী।
তৃতীয়ত, সরকার ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থার মধ্যে সমন্বিত অংশীদারিত্ব গড়ে তুলতে হবে। বিশেষ করে গ্রামীণ এলাকায় কমিউনিটি-ভিত্তিক শিক্ষা কার্যক্রম সম্প্রসারণে এনজিওগুলোর সফল অভিজ্ঞতা কাজে লাগানো যেতে পারে।
চতুর্থত, প্রাথমিক শিক্ষায় ভাষা ও গণিতভিত্তিক মৌলিক দক্ষতাকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। কোনো শিক্ষার্থী যেন প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পরও পড়তে বা লিখতে অক্ষম না থাকে, তা নিশ্চিত করা জরুরি।
পঞ্চমত, নারী ও পিছিয়ে থাকা অঞ্চলের জন্য বিশেষ কর্মসূচি গ্রহণ করতে হবে। নমনীয় সময়সূচি, নারী-কেন্দ্রিক শিক্ষা কেন্দ্র এবং প্রণোদনা-ভিত্তিক উদ্যোগ সাক্ষরতার বৈষম্য কমাতে সহায়ক হতে পারে।
সবশেষে, ডিজিটাল সাক্ষরতাকে সাক্ষরতার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। বর্তমান যুগে স্মার্টফোন, ইন্টারনেট ও ডিজিটাল তথ্য ব্যবহারের সক্ষমতা ছাড়া কার্যকর সাক্ষরতা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। ১৯৯০ সালের ৩৫ শতাংশ থেকে বর্তমান প্রায় ৭৯ শতাংশ প্রাপ্তবয়স্ক সাক্ষরতার হার বাংলাদেশের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অর্জন। তবে সংখ্যাগত অগ্রগতি একাই যথেষ্ট নয়। যখন বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মৌলিক পাঠ ও গণনাগত দক্ষতা অর্জন করতে ব্যর্থ হয়, তখন সাক্ষরতার পরিসংখ্যান বাস্তব মানবসম্পদ উন্নয়নের পূর্ণ প্রতিফলন ঘটাতে পারে না। বাংলাদেশের সামনে এখন নতুন চ্যালেঞ্জ হলো “সবার জন্য শিক্ষা” স্লোগানকে পরিবর্ধিত করে “সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা” নিশ্চিত করা। কার্যকর সাক্ষরতা, গুণগত শিক্ষা, আঞ্চলিক ও সামাজিক বৈষম্য হ্রাস এবং ডিজিটাল দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে দেশ তার মানব উন্নয়নের পরবর্তী ধাপে পৌঁছাতে পারে। অন্যথায় উচ্চ সাক্ষরতার হার সত্ত্বেও দক্ষ মানবসম্পদ গঠনের লক্ষ্য অপূর্ণ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থেকে যাবে।
