সুমাইয়া হাসি
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বিজ্ঞান, শিল্পকলা এবং সাহিত্যের এমন বিরল সংমিশ্রণ বাংলা সাহিত্যে আর দ্বিতীয়টি দেখা যায় না। যে হাতে বেহালা ও পাখোয়াজের সুরে ব্রহ্মসঙ্গীত রচিত হয়েছে, সেই একই হাতে হয়েছে মুদ্রণ প্রযুক্তির মৌলিক গবেষণা। রাতের আকাশে ছাদে বসে নক্ষত্ররাজির পর্যবেক্ষণ থেকে শুরু করে ক্যানভাসে রং-জল-কালির ছোঁয়ায় কাল্পনিক জগতের সৃষ্টি-এমন এক গভীর জ্ঞান চর্চাকারী পারিবারিক আবহেই গড়ে উঠেছিল সুকুমার রায়ের চিন্তাজগৎ।
উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর মতো বহুমুখী প্রতিভাবান পিতার অনুপ্রেরণায় শৈশব থেকেই সুকুমার রায় মুখে-মুখে ছড়া রচনা, ছবি আঁকা এবং ফটোগ্রাফির চর্চা শুরু করেন। কলকাতার প্রেসিডেন্সি কলেজ থেকে রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানে ডাবল অনার্স নিয়ে বি.এসসি পাস করার পরও, বিজ্ঞানের অর্জিত জ্ঞানকে তিনি প্রয়োগ করতে চেয়েছিলেন শিল্পে। আর তাই বি.এসসি পাসের পাঁচ বছর পর, ১৯১১ সালে মুদ্রণ শিল্পে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে তিনি বিলেতে পাড়ি জমান।
বিলেত যাত্রা, রবীন্দ্রনাথ ও আড্ডার ‘মণ্ডা সম্মেলন’ :
সুকুমার রায়ের বিলেত যাত্রার সময়টি ছিল এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। একই সময়ে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও লন্ডনে যান তাঁর ‘গীতাঞ্জলি’ কাব্যের ইংরেজি অনুবাদের পাণ্ডুলিপি নিয়ে। সুকুমার ছিলেন রবীন্দ্রনাথের তরুণ অনুরাগী। লন্ডনের বিখ্যাত ‘কোয়েস্ট সোসাইটি’র অধিবেশনে ‘দ্য স্পিরিট অফ রবীন্দ্রনাথ’ (The Spirit of Rabindranath) শীর্ষক একটি ইংরেজি প্রবন্ধ পাঠ করে তিনি তৎকালীন ইংল্যান্ডের বুদ্ধিজীবী সমাজের কাছে রবীন্দ্রনাথকে চমৎকারভাবে তুলে ধরেন।
বিলেত যাওয়ার আগেই প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়নকালে সুকুমার গড়ে তুলেছিলেন ‘ননসেন্স ক্লাব’, যার মুখপত্র ছিল ‘সাড়ে-বত্রিশ-ভাজা’। পরবর্তীতে দেশে ফিরে ১৯১৫ সালে তিনি প্রতিষ্ঠা করেন এক জীবন্ত সাহিত্য আড্ডা-‘Monday Club’, যাকে তিনি রসিকতা করে বলতেন ‘মণ্ডা সম্মেলন’। এই ক্লাবের নিয়মিত সভ্য ছিলেন সত্যেন্দ্রনাথ দত্ত, অজিতকুমার চক্রবর্তী, সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় ও অতুলপ্রসাদ সেনের মতো তৎকালীন প্রখ্যাত সব ব্যক্তিত্ব।
সাহিত্য ও বিজ্ঞানের পাশাপাশি রাজনীতি ও সংস্কৃতিতেও তাঁর উপস্থিতি ছিল উজ্জ্বল। শান্তিনিকেতনে রবীন্দ্রনাথ ও অবনীন্দ্রনাথের সাথে ‘গোড়ায় গলদ’ নাটকে তিনি চমৎকার অভিনয় করেন। এমনকি স্বদেশী আন্দোলনের দিনগুলোতে তিনি বেশ কিছু দেশাত্মবোধক গান রচনা করেন এবং নিজে গলায় সুর তুলে তা গেয়েছেন। ‘সন্দেশ’ সম্পাদনা ও কাল্পনিক প্রাণীকুল।১৯১৩ সালে উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর সম্পাদনায় ‘সন্দেশ’ পত্রিকার যাত্রা শুরু হয়। ১৯১৫ সালে পিতার অকালপ্রয়ানের পর পত্রিকাটির সম্পূর্ণ সম্পাদনার দায়িত্ব এসে পড়ে সুকুমার রায়ের কাঁধে। ১৯১৫ থেকে ১৯২৩ সাল পর্যন্ত টানা আট বছর তিনি পরম মমতায় ও সুনিপুণ সম্পাদনায় সন্দেশ পরিচালনা করেন।
সুকুমার রায়ের সাহিত্যের প্রধান ভিত্তিই হলো অফুরন্ত কল্পনাশক্তি ও নিখাদ হাস্যরস। বাংলা সাহিত্যে এমন অদ্ভুত ও কিম্ভুতকিমাকার প্রাণীদের জন্ম আর কেউ দিতে পারেননি। তাঁর সৃষ্টিতে আমরা পাই চিল্লানোসরাস, গোমরাথেরিয়াম কিংবা হাঁস আর সজারু মিলে তৈরি হওয়া ‘হাঁসজারু’।
“হাঁস ছিল সজারু, (ব্যাকরণ মানি না),
হয়ে গেল “হাঁসজারু” কেমনে তা জানি না।
বক কহে কচ্ছপে- “বাহবা কি ফুর্তি!
অতি খাসা আমাদের বকচ্ছপ মূর্তি।”
টিয়ামুখো গিরগিটি মনে ভারি শঙ্কা-
পোকা ছেড়ে শেষে কিগো খাবে কাঁচা লঙ্কার?”
এই হাসির আড়ালে তিনি মূলত তৎকালীন সমাজের অন্ধ অনুকরণ, ভণ্ডামি আর যুক্তিহীন প্রথাগুলোকে কৌতুকের সাথে ফুটিয়ে তুলেছিলেন। শিশুদের তিনি কেবল অবোধ শ্রোতা ভাবেননি, বরং ভেবেছেন চতুর ও চিন্তাশীল পাঠক হিসেবে।মুদ্রণ শিল্পের শুদ্ধতা ও শিশুপাঠ্যের মানদণ্ড। শিশুদের সাহিত্যের ক্ষেত্রে সুকুমার রায় কখনো কোনো শিথিলতা বরদাশত করেননি। তিনি বিশ্বাস করতেন, শিশুপাঠ্য বইয়ের ব্যাকরণ, বানান, ছন্দ ও উপস্থাপনা হতে হবে নিখুঁত। কারণ শৈশবে দেখা একটি ভুল বানান বা বিভ্রান্তিকর তথ্য শিশুর মনে সারাজীবনের জন্য গেঁথে যায়।
বিলেত থেকে আধুনিক মুদ্রণ প্রযুক্তি ও আলোকচিত্র প্রক্রিয়া শিখে এসে তিনি পারিবারিক প্রেস ‘ইউ. রায় অ্যান্ড সন্স’-কে পুনরুজ্জীবিত করেন। লেখক, চিত্রশিল্পী, সম্পাদক ও মুদ্রণ বিশেষজ্ঞ, এই চার সত্তার অপূর্ব সমন্বয় ছিলেন তিনি। তাঁর লেখা ছড়ার সুর ও রূপ বাংলা ভাষার নিজস্ব সঙ্গীতময়তাকে লালন করত। তাঁর সাধারণ ও সহজ সাবলীল বাক্যগুলোর পেছনে লুকিয়ে থাকত গভীর সম্পাদনা ও কঠোর পরিশ্রম।
অকালপ্রস্থান ও মৃত্যুর মুখে দাঁড়িয়ে সৃষ্টিশীলতা:
এমন বিরল মেধার অধিকারী সাহিত্যিক পেয়েছিলেন অত্যন্ত স্বল্প আয়ু। মাত্র ছত্রিশ বছর বয়সে কালাজ্বরে আক্রান্ত হয়ে ১৯২৩ সালের ১০ই সেপ্টেম্বর এই অমর সাহিত্যিক বিদায় নেন। জীবনের শেষ আড়াইটি বছর তিনি কাটান নিঃসঙ্গ রোগশয্যায়। কিন্তু ব্যাধি তাঁর সৃষ্টিশীলতাকে রুদ্ধ করতে পারেনি।রোগশয্যায় বসেই ১৯২২ সালে তিনি রচনা করেন বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কালজয়ী গ্রন্থ ‘হ-য-ব-র-ল’। বাংলা কবিতার অনুপ্রাসের ধারা নিয়ে ‘শ্রীশ্রীবর্ণমালাতত্ত্ব’ নামে একটি তাত্বিক গবেষণা গ্রন্থ লেখাও শুরু করেছিলেন, যা অকালমৃত্যুর কারণে অসম্পূর্ণ থেকে যায়।
মৃত্যুর একদম মুখোমুখি দাঁড়িয়েও তিনি লিখেছেন অনাবিল হাসির ছড়া:
“আদিম কালের চাঁদিম হিম,
তোড়ায় বাঁধা ঘোড়ার ডিম
ঘনিয়ে এল ঘুমের ঘোর
গানের পালা সাঙ্গ মোর।”
জীবন ও মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে এমন কৌতুকবহ ও রসময় সাহিত্য সৃষ্টি পৃথিবীর ইতিহাসে বিরল। তাঁর সুযোগ্য পুত্র, খ্যাতিমান চলচ্চিত্রকার সত্যজিৎ রায় পরবর্তীতে লিখেছিলেন, “জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে উপস্থিত হয়ে এমন রসিকতা আর কোন রসস্রষ্টার পক্ষে সম্ভব হয়েছে বলে আমার জানা নাই।”
বর্তমান প্রেক্ষাপট ও সুকুমারের উত্তরাধিকার:
আজকের দিনে শিশুসাহিত্যকে প্রায়শই মূলধারার সাহিত্য থেকে আলাদা বা কম গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখা হয়। তাড়াহুড়ো করে প্রকাশিত বই, নিম্নমানের প্রুফরিডিং এবং ডিজিটাল স্ক্রিনের দাপটে শিশুরা আজ নিজস্ব ভাষা ও মৌলিক সাহিত্য থেকে কিছুটা দূরে সরে যাচ্ছে। সুকুমার রায় আমাদের দেখিয়ে গেছেন কিভাবে একটি সৃষ্টি একই সাথে সরল, হাস্যরসে ভরা, নিখুঁত এবং নীতিশিক্ষার তোয়াক্কা না করেও চরম প্রজ্ঞাপূর্ণ হতে পারে। পরিবারে বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তোলা, প্রকাশনা শিল্পে পেশাদারিত্ব বজায় রাখা এবং ছোটদের সাহিত্যকে যথাযথ মর্যাদা দেওয়ার মাধ্যমেই কেবল সুকুমার রায়ের সেই ‘সহজ জাদু’কে আমরা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দিতে পারি।
