ডেস্ক রিপোর্ট
অনিকেত ডেস্ক
বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীদের জীবনযাত্রায় গত কয়েক বছরে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। প্রযুক্তির সহজলভ্যতা, স্মার্টফোনের বিস্তার এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ক্রমবর্ধমান প্রভাব তাদের দৈনন্দিন অভ্যাস, মানসিকতা এবং শারীরিক সুস্থতার ওপর গভীর প্রভাব ফেলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তি ব্যবহারের সুবিধা থাকলেও অনিয়ন্ত্রিত ডিজিটাল নির্ভরতা এখন জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
কোভিড-১৯ মহামারির সময় দীর্ঘ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকার কারণে কিশোরদের বড় একটি অংশ ভার্চুয়াল জগতে অধিক সময় কাটাতে শুরু করে। পরবর্তীতে এই অভ্যাস অনেকের ক্ষেত্রেই স্থায়ী হয়ে যায়। বিভিন্ন গবেষণা ও পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ১৩ থেকে ১৯ বছর বয়সী অনেক শিক্ষার্থী প্রতিদিন গড়ে ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা স্মার্টফোন, অনলাইন গেম কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করছে। এর ফলে স্থূলতা, ঘুমের সমস্যা, চোখের জটিলতা এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা বেড়েছে। একইসঙ্গে বাস্তব সামাজিক যোগাযোগ কমে যাওয়ায় একাকীত্ব, নিঃসঙ্গতাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তবে এই সংকট কেবল স্বাস্থ্যগত নয়; এর সামাজিক ও রাজনৈতিক মাত্রাও বিদ্যমান। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্য, উসকানিমূলক লেখা বা ভিডিও এবং বিভ্রান্তিকর রাজনৈতিক প্রচারণা সহজেই কিশোরদের প্রভাবিত করছে। বিশেষ করে সাম্প্রতিক রাজনৈতিক উত্তেজনা, সহিংস ভিডিও এবং সংঘাতমূলক পোস্ট বা ভিডিও ক্লিপসের অবাধ প্রচারণা অনেক কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে উদ্বেগ, হতাশা এবং মানসিক অস্থিরতা বাড়িয়ে দিচ্ছে। মনোবিজ্ঞানীরা সতর্ক করছেন, দীর্ঘমেয়াদে এমন পরিস্থিতি সামাজিক অসহিষ্ণুতা এবং আচরণগত সমস্যার জন্ম দিতে পারে।
এমন বাস্তবতায় বহিরাঙ্গন খেলাধুলা প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে একটি কার্যকরী ধাপ হতে পারে। ফুটবল, ক্রিকেট, ব্যাডমিন্টন, সাঁতার কিংবা সাধারণ শারীরিক অনুশীলন কিশোরদের শারীরিক সক্ষমতা বৃদ্ধির পাশাপাশি মানসিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। নিয়মিত খেলাধুলা শরীরে এন্ডোরফিন নিঃসরণ বাড়ায়, যা মানসিক চাপ কমাতে সাহায্য করে। পাশাপাশি দলগত খেলাধুলা নেতৃত্বগুণ, সহনশীলতা, শৃঙ্খলা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতা গড়ে তোলে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, দেশের অনেক শহর ও মফস্বলে খেলার মাঠ দ্রুত কমে যাচ্ছে। নগরায়ণ, অবৈধ দখল এবং অপরিকল্পিত অবকাঠামো উন্নয়নের কারণে শিশু-কিশোরদের নিরাপদ খেলাধুলার স্থান সংকুচিত হয়ে গেছে। ফলে তারা স্বাভাবিকভাবেই ঘরের ভেতর প্রযুক্তিনির্ভর বিনোদনের দিকে ঝুঁকছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বাধ্যতামূলক শারীরিক শিক্ষা কার্যক্রম চালু করতে হবে। স্থানীয় সরকারকে খেলার মাঠ সংরক্ষণ ও নতুন মাঠ তৈরিতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। ক্রীড়া সংগঠনগুলোকে তৃণমূল পর্যায়ে নিয়মিত প্রতিযোগিতা আয়োজন করতে হবে। একইসঙ্গে পরিবারকে সন্তানদের স্ক্রিন টাইম নিয়ন্ত্রণে আরও সচেতন ভূমিকা পালন করতে হবে।বাংলাদেশের কিশোর-কিশোরীরা দেশের ভবিষ্যৎ মানবসম্পদ। তাদের যদি বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন, মানসিকভাবে বিপর্যস্ত এবং শারীরিকভাবে দুর্বল প্রজন্ম হিসেবে বেড়ে উঠতে দেওয়া হয়, তাহলে এর প্রভাব দীর্ঘমেয়াদে পুরো সমাজকেই বহন করতে হবে। তাই প্রযুক্তির সুবিধা গ্রহণের পাশাপাশি বহিরাঙ্গন ক্রীড়াকে জীবনযাপনের অপরিহার্য অংশ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা এখন শুধু স্বাস্থ্যগত প্রয়োজন নয়, এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষার একটি জাতীয় দায়িত্ব।
