নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
গত পাঁচ দশকে বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য খাত আন্তর্জাতিক অঙ্গনে একাধিক সাফল্যের নজির তৈরি করেছে। শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমানো, পোলিও নির্মূল, টিকাদান কর্মসূচির সম্প্রসারণ এবং যক্ষ্মা ও ম্যালেরিয়া নিয়ন্ত্রণে অগ্রগতি দেশকে উন্নয়নশীল বিশ্বের একটি সফল উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছে। কিন্তু এই অর্জনকে আড়াল করে এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে একটি কাঠামোগত দুর্বলতা যা ভবিষ্যতে বাংলাদেশের স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য মারাত্মক ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াতে পারে।
বর্তমানে বাংলাদেশের ইউনিভার্সাল হেলথ কভারেজ সার্ভিস কভারেজ ইনডেক্স মাত্র ৫২, যা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অনেক দেশের তুলনায় পিছিয়ে। আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, দেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের প্রায় ৬৭ শতাংশ নাগরিককে নিজ পকেট থেকে বহন করতে হয়। এর ফলে প্রতিবছর বহু পরিবার চিকিৎসা ব্যয় সামলাতে গিয়ে দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। একই সময়ে স্বাস্থ্য খাতে সরকারের ব্যয় জিডিপির মাত্র ২.৯ শতাংশ, যা বৈশ্বিক মানদণ্ডের তুলনায় অত্যন্ত কম।
এই আর্থিক সীমাবদ্ধতার প্রভাব সরাসরি পড়ছে স্বাস্থ্যসেবার মানে। গ্রামীণ অঞ্চলে চিকিৎসক ও প্রশিক্ষিত স্বাস্থ্যকর্মীর সংকট দীর্ঘদিনের সমস্যা। ইউনিয়ন পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোর অনেকগুলো কার্যকর নয়, ফলে সাধারণ মানুষকে জেলা বা রাজধানীমুখী হতে হয়। এতে তৃতীয় পর্যায়ের হাসপাতালগুলোতে রোগীর চাপ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত এখন একটি নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি … সংক্রামক ও অসংক্রামক রোগের দ্বৈত চাপ। একসময় যেখানে সংক্রামক রোগ ছিল প্রধান উদ্বেগ, এখন হৃদরোগ, স্ট্রোক, ক্যান্সার, ডায়াবেটিস এবং দীর্ঘস্থায়ী শ্বাসতন্ত্রের রোগ দ্রুত বাড়ছে। ২০১৯ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশের শীর্ষ ২০টি মৃত্যুর কারণের মধ্যে ১৪টিই ছিল অসংক্রামক রোগ। জনসংখ্যার পরিবর্তিত জীবনধারা, নগরায়ন এবং খাদ্যাভ্যাসের পরিবর্তন এই সংকটকে আরও তীব্র করছে।
এর সঙ্গে আবার যুক্ত হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের স্বাস্থ্যগত প্রভাব। ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, তাপপ্রবাহ এবং পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। উপকূলীয় ও দুর্যোগপ্রবণ অঞ্চলে স্বাস্থ্য অবকাঠামো এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঝুঁকির মুখে। সব মিলিয়ে দৃশ্যমান বাস্তব পরিস্থিতি প্রকৃতঅর্থেই আশঙ্কাজনক।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় কেবল বাজেট বাড়ানো যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার। প্রথমত, স্বাস্থ্যসেবাকে সাংবিধানিক অধিকার হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। এতে সরকারের জবাবদিহিতা বাড়বে। দ্বিতীয়ত, স্বাস্থ্য খাতে সরকারি বিনিয়োগ বাড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক স্বাস্থ্য বিমা চালু করা প্রয়োজন, যাতে নাগরিকদের ব্যক্তিগত ব্যয় কমে। তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য খাতে দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অদক্ষতা কমাতে স্বাধীন নিয়ন্ত্রক কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি। নিয়োগ, ক্রয় এবং সেবা ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা না এলে অতিরিক্ত অর্থ বরাদ্দও কাঙ্ক্ষিত ফল দেবে না।
একই সঙ্গে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা শক্তিশালী করা এখন সময়ের দাবি। ইউনিয়ন ও উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলোকে আধুনিকায়ন করা গেলে বড় হাসপাতালের ওপর চাপ কমবে। পাশাপাশি টেলিমেডিসিন, ডিজিটাল স্বাস্থ্য রেকর্ড এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা ভবিষ্যতের জন্য নতুন সম্ভাবনা তৈরি করতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশের গণস্বাস্থ্য খাতের অতীত সাফল্য নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়, কিন্তু বর্তমান বাস্তবতা দেখাচ্ছে যে এই সাফল্যের ভিত্তি এখনও যথেষ্ট শক্ত নয়। সীমিত বাজেট, উচ্চ ব্যক্তিগত চিকিৎসা ব্যয়, চিকিৎসাকর্মীর সংকট, অসংক্রামক রোগের বিস্তার এবং জলবায়ুজনিত স্বাস্থ্যঝুঁকি মিলিয়ে খাতটি এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে।যদি এখনই কার্যকর নীতিগত সংস্কার, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবায় দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করা না যায়, তবে অচিরেই অর্জিত সাফল্যও অর্থহীন হয়ে দাঁড়াবে। স্বাস্থ্যকে ব্যয় নয়, মানবসম্পদ উন্নয়নের মৌলিক বিনিয়োগ হিসেবে দেখতে হবে। কারণ একটি দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতি তখনই অর্থবহ হয়, যখন তার নাগরিকরা সুস্থ, নিরাপদ এবং মানসম্মত চিকিৎসাসেবার নিশ্চয়তা পায়।
আরও পড়ুন… কৈশোরে স্বাস্থ্য সুরক্ষা এবং বহিরাঙ্গনে খেলাধুলা
হামের ভয়াবহ বিস্তার বিদ্যমান: টিকাদান চললেও কেন থামছে না সংক্রমণ?
