নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
গত ১৩ মে দৈনিক প্রথম আলো একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যার শিরোনাম ছিল, ‘অতিরিক্ত মুঠোফোন বা কম্পিউটারের ব্যবহার হাতের যে ক্ষতি করছে’। অতিরিক্ত স্মার্টফোন ও কম্পিউটার ব্যবহারের কারণে হাতের স্নায়ু ও পেশিতে যে যে ক্ষতি হচ্ছে, মূলত এই আলোচনাই প্রতিবেদনটিতে বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হয়েছে। নিঃসন্দেহে প্রতিবেদনটি বর্তমান প্রেক্ষাপটে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়, কিন্তু ডিভাইস ব্যবহারে হাতের পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অঙ্গপ্রত্যঙ্গও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় মানসিক স্বাস্থ্যও। সেসব দিক সম্পর্কেও জনসাধারণের জানা প্রয়োজন, প্রয়োজন সচেতনতার। তাই আমার মতে প্রতিবেদনটি গুরুত্বপূর্ণ হলেও পূর্ণাঙ্গ নয়। কেননা মানুষের হাতের পাশাপাশি শরীরের অন্যান্য অংশও সমান গুরুত্ব বহন করে। আর তাই যৌক্তিক কারণেই আমি প্রতিবেদনটির সাথে আমার পর্যালোচনা সংযুক্ত করতে চাই।
আমরা জানি স্মার্টফোন, কম্পিউটার ও অন্যান্য ডিজিটাল ডিভাইস আজ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। শিক্ষা, যোগাযোগ, বিনোদন, ব্যাংকিং থেকে শুরু করে অফিসের কাজ, সবকিছুই এখন প্রযুক্তিনির্ভর। তবে এই নির্ভরতার পেছনে ধীরে ধীরে তৈরি হচ্ছে এক গভীর স্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকট, যা শুধু হাতের ব্যথা বা স্নায়ুর সমস্যার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং মানুষের শারীরিক, মানসিক, সামাজিক ও আচরণগত জীবনে বহুমাত্রিক ক্ষতি ডেকে আনছে।
ডিজিটাল লাইফস্টাইল ডিজিজ: শরীরের অন্যান্য অঙ্গের ক্ষতি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দীর্ঘ সময় মোবাইল বা কম্পিউটার ব্যবহারের ফলে মানুষের শরীরে “ডিজিটাল লাইফস্টাইল ডিজিজ” নামে নতুন ধরনের নানা জটিলতা বাড়ছে। হাতের আঙুল, কবজি ও কনুইয়ের সমস্যা যেমন বাড়ছে, তেমনি চোখ, ঘাড়, মেরুদণ্ড, ঘুম, মস্তিষ্ক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠছে।
সবচেয়ে বেশি দেখা যাচ্ছে চোখের সমস্যা। দীর্ঘ সময় স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকার কারণে “ডিজিটাল আই স্ট্রেইন”, চোখ শুকিয়ে যাওয়া, ঝাপসা দেখা ও মাথাব্যথার মতো সমস্যা বাড়ছে। শিশু কিশোরদের মধ্যে কম বয়সেই দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে পড়ার ঘটনাও বাড়ছে। একই সঙ্গে ঘাড় নিচু করে ফোন ব্যবহারের অভ্যাস “টেক্সট নেক” নামে পরিচিত ব্যথা ও মেরুদণ্ডের সমস্যার জন্ম দিচ্ছে। অনেকের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদে কোমর ও পিঠের ব্যথাও তৈরি হচ্ছে।
মানসিক স্বাস্থ্য ও সামাজিক জীবনের ওপর প্রভাব
এবার আসি মানসিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি প্রসঙ্গে। ডিভাইসের প্রভাব শুধু শারীরিক নয়, মানসিক স্বাস্থ্যের ওপরও এর প্রভাব ভয়াবহ। অতিরিক্ত সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারের কারণে উদ্বেগ, বিষণ্নতা, একাকিত্ব ও আত্মবিশ্বাসহীনতা বাড়ছে। বিশেষ করে কিশোর কিশোরী এবং তরুণ সমাজ ভার্চুয়াল জগতের সঙ্গে নিজেদের তুলনা করতে গিয়ে মানসিক চাপে ভুগছে। আবার অনেকেই বাস্তব সামাজিক সম্পর্কের চেয়ে অনলাইন যোগাযোগে বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যা সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়াচ্ছে।
ঘুমের সমস্যাও একটি ভয়াবহ উদ্বেগের বিষয়। রাতে দীর্ঘ সময় মোবাইল ব্যবহারের ফলে স্ক্রিন থেকে নির্গত নীল আলো মানুষের স্বাভাবিক ঘুমের চক্রে ব্যাঘাত ঘটায়। ফলে অনিদ্রা, ক্লান্তি ও মনোযোগ কমে যাওয়ার সমস্যা তৈরি হয়। শিক্ষার্থী ও তরুণদের মধ্যে এর প্রভাব আরও বেশি দেখা যাচ্ছে; পড়াশোনায় মনোযোগ কমে যাওয়া, স্মৃতিশক্তি দুর্বল হওয়া এবং কাজের উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়া এখন সাধারণ ঘটনায় পরিণত হয়েছে।
শিশুদের ক্ষেত্রে গভীর ঝুঁকি
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও গভীর। অতিরিক্ত স্ক্রিন টাইম শিশুদের শারীরিক খেলাধুলা কমিয়ে দিচ্ছে, স্থূলতা বাড়াচ্ছে এবং ভাষা ও সামাজিক বিকাশেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। অনেক শিশু বাস্তব পরিবেশের চেয়ে ভার্চুয়াল কনটেন্টে বেশি আকৃষ্ট হয়ে পড়ছে, যা ভবিষ্যৎ আচরণগত সমস্যার কারণ হতে পারে।
সংকট মোকাবিলায় রাষ্ট্রীয় ও প্রাতিষ্ঠানিক করণীয়
খুব স্বাভাবিকভাবেই এই পর্যায়ে প্রশ্ন দাঁড়ায়, এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাদের আসলে করণীয় কী? আমি বলব ব্যক্তিগত সচেতনতা আছেই, কিন্তু পাশাপাশি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগও জরুরি হয়ে উঠেছে। সরকার চাইলে কিছু কার্যকর পদক্ষেপ নিতে পারে যা এই পরিস্থিতিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
- প্রথমত, স্কুল কলেজ পর্যায়ে “ডিজিটাল স্বাস্থ্য সচেতনতা” শিক্ষা চালু করা যেতে পারে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিরাপদ স্ক্রিন ব্যবহারের নিয়ম জানতে পারে।
- দ্বিতীয়ত, শিশু ও কিশোরদের জন্য দৈনিক স্ক্রিন টাইম সংক্রান্ত জাতীয় নির্দেশিকা তৈরি করা প্রয়োজন।
- তৃতীয়ত, কর্মক্ষেত্রে দীর্ঘ সময় কম্পিউটার ব্যবহারের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলক বিরতি ও স্বাস্থ্যসম্মত বসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে নীতিমালা করা যেতে পারে।
এ ছাড়া গণমাধ্যমে সচেতনতামূলক প্রচার, পার্ক ও খেলাধুলার সুযোগ বৃদ্ধি এবং মানসিক স্বাস্থ্যসেবা সহজলভ্য করাও জরুরি। প্রযুক্তি ব্যবহারের ক্ষতি ও প্রতিরোধ নিয়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের যৌথ গবেষণা ও প্রচারণা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুরক্ষিত রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, প্রযুক্তি মানুষের জীবন সহজ করেছে, এটি সত্য। কিন্তু নিয়ন্ত্রণহীন প্রযুক্তি নির্ভরতা ধীরে ধীরে মানুষের শরীর, মন ও সামাজিক জীবনকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। তাই এখনই সচেতন না হলে ভবিষ্যতে এই নীরব সংকট আরও বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যায় রূপ নিতে পারে।
