নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেটে স্বাস্থ্য খাতের জন্য ৬৯ হাজার ৪০৯ কোটি টাকা বরাদ্দের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সর্বোচ্চ। মোট বাজেটের ৭.৪ শতাংশ এবং জিডিপির ১.০১ শতাংশ সমপরিমাণ এই বরাদ্দ আগের অর্থবছরের সংশোধিত বরাদ্দের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ।
প্রথম দৃষ্টিতে এটি স্বাস্থ্য খাতকে অগ্রাধিকার দেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক অঙ্গীকারের প্রতিফলন বলে মনে হতে পারে। তবে বাজেটের গভীরে গেলে স্পষ্ট হয় যে এই রেকর্ড বরাদ্দের পেছনে এমন কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, যার কার্যকর পরিশোধন নিশ্চিত না হলে প্রত্যাশিত সুফল অর্জনকে কঠিন করে তুলতে পারে। বিস্তারিত আলোচনার শুরুতেই প্রতিকূল পরিস্থিতি বা অব্যবস্থাপনার বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা নেয়া যাক।
ব্লক বরাদ্দের বাস্তবতা
এবারের স্বাস্থ্য বাজেটের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো উন্নয়ন বাজেটের আওতায় ২৩ হাজার ৫২২ কোটি টাকার বিশেষ ব্লক বরাদ্দ। নতুন সরকার ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব গ্রহণ করায় নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিগুলোকে প্রকল্প আকারে প্রস্তুত ও অনুমোদনের জন্য পর্যাপ্ত সময় পায়নি। ফলে নির্দিষ্ট প্রকল্পের পরিবর্তে একটি বড় অঙ্কের অর্থ ব্লক বরাদ্দ হিসেবে সংরক্ষিত রাখা হয়েছে।
তবে এই পদ্ধতি বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে বড় ধরনের ঝুঁকি সৃষ্টি করতে পারে। বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দকৃত অর্থ সময়মতো ব্যয় করতে না পারার দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে। প্রকল্প অনুমোদনে বিলম্ব, ক্রয় প্রক্রিয়ার জটিলতা, প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং সমন্বয়ের অভাবের কারণে প্রতিবছরই উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থ অব্যবহৃত থেকে যায়।
এমন পরিস্থিতিতে নির্দিষ্ট প্রকল্প ছাড়া বিপুল অঙ্কের অর্থ ব্লক বরাদ্দ হিসেবে রাখা হলে বাস্তবায়ন সংকট আরও তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। অর্থবছরের শুরুতেই প্রকল্প নির্বাচন, নকশা প্রণয়ন, অনুমোদন এবং কার্যাদেশ প্রদান সম্পন্ন না হলে অবশিষ্ট সময়ের মধ্যে অর্থ ব্যয় করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। অতীত অভিজ্ঞতা বলছে, স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় প্রায়ই এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় ব্যর্থ হয়েছে।
সঞ্চালন ব্যয়ে অবহেলা- স্বাস্থ্যসেবার মূল সংকট
উন্নয়ন ব্যয় সাধারণত নতুন হাসপাতাল, ভবন ও অবকাঠামো নির্মাণে ব্যবহৃত হয়। কিন্তু জনগণের কাছে স্বাস্থ্যসেবার প্রকৃত মান নির্ধারিত হয় হাসপাতালের দৈনন্দিন কার্যক্রম, ওষুধ সরবরাহ, চিকিৎসা সরঞ্জামের ব্যবহার, জনবলের উপস্থিতি এবং সেবার মানের মাধ্যমে। এসবই পরিচালন বাজেটের ওপর নির্ভরশীল।
দুঃখজনকভাবে, এবারের বাজেটে পরিচালন ব্যয়ে উল্লেখযোগ্য কোনো বৃদ্ধি লক্ষ্য করা যায় না। ফলে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ হলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসক, নার্স, স্বাস্থ্যকর্মী, ওষুধ ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় নিশ্চিত না হলে জনগণের কাঙ্ক্ষিত সেবা পাওয়া কঠিন হবে।
বাংলাদেশে এমন বহু স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে ভবন নির্মাণ করা হলেও পর্যাপ্ত জনবল ও পরিচালন ব্যয়ের অভাবে সেবার মান প্রত্যাশিত পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। তাই অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং পরিচালন সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা এখন সময়ের দাবি।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অপর্যাপ্ত বরাদ্দ
যদিও স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ১.০১ শতাংশ বরাদ্দ বাংলাদেশের জন্য একটি নতুন মাইলফলক, তবুও এটি আন্তর্জাতিক মানদণ্ডের তুলনায় অনেক কম। স্বাস্থ্য সংস্কার কমিশন স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ এবং জাতীয় বাজেটের ১৫ শতাংশ বরাদ্দের সুপারিশ করেছে।
একইভাবে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও সর্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে স্বাস্থ্য খাতে কমপক্ষে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ের পরামর্শ দিয়ে থাকে। সরকার আগামী পাঁচ বছরে স্বাস্থ্য খাতে জিডিপির ৫ শতাংশ ব্যয়ে পৌঁছানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। কিন্তু বর্তমান বরাদ্দ সেই লক্ষ্যের মাত্র এক-পঞ্চমাংশ। ফলে স্বাস্থ্যসেবার সার্বিক উন্নয়নের জন্য দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ বৃদ্ধির বিকল্প নেই।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো, বাংলাদেশের মোট স্বাস্থ্য ব্যয়ের সিংহভাগ এখনো জনগণকে নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়। দক্ষিণ এশিয়ায় ব্যক্তিগত স্বাস্থ্য ব্যয়ের হার বাংলাদেশেই সবচেয়ে বেশি। এর ফলে প্রতি বছর অসংখ্য পরিবার চিকিৎসা ব্যয়ের চাপ সামলাতে গিয়ে দারিদ্র্যের মুখে পড়ে। হৃদরোগের স্টেন্ট, চোখের লেন্স এবং ডায়ালাইসিস ফিল্টারের ওপর কর ছাড় ইতিবাচক পদক্ষেপ হলেও এগুলো স্বাস্থ্য অর্থায়নের মৌলিক সংকট সমাধানে যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন একটি শক্তিশালী ও টেকসই সরকারি স্বাস্থ্য অর্থায়ন ব্যবস্থা।
বাজেটকে কার্যকর করতে করণীয়
রেকর্ড বরাদ্দকে বাস্তব সাফল্যে রূপ দিতে হলে কয়েকটি বিষয়ে অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণ জরুরি।
প্রথমত, ব্লক বরাদ্দের অর্থ দ্রুত প্রকল্পভিত্তিক পরিকল্পনায় রূপান্তর করতে হবে। ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, জাতীয় অ্যাম্বুলেন্স নেটওয়ার্ক গঠন, মাতৃস্বাস্থ্য সুরক্ষা কর্মসূচি এবং কার্যকর ডিজিটাল স্বাস্থ্য কার্ড চালুর মতো উদ্যোগকে অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন। দ্বিতীয়ত, পরিচালন/ সঞ্চালন বাজেটে উল্লেখযোগ্য বৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হবে, যাতে নতুন অবকাঠামো কার্যকরভাবে পরিচালিত হতে পারে।
তৃতীয়ত, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অধীনে আধুনিক ক্রয় ও সরবরাহ ব্যবস্থাপনা কেন্দ্র গড়ে তোলা এবং মন্ত্রণালয় পর্যায়ে শক্তিশালী মনিটরিং সেল প্রতিষ্ঠা করা জরুরী। এর মাধ্যমে প্রকল্প বাস্তবায়নের অগ্রগতি নিয়মিত পর্যালোচনা এবং সমস্যার দ্রুত সমাধান সম্ভব হবে। চতুর্থত, স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়ন ব্যয়ে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে বিভিন্ন প্রকল্পে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ জনমনে আস্থাহীনতা সৃষ্টি করেছে। ফলে প্রতিটি ব্যয়ের ক্ষেত্রে কঠোর নজরদারি, ডিজিটাল ট্র্যাকিং এবং স্বাধীন নিরীক্ষা ব্যবস্থা চালু করা প্রয়োজন।
উপসংহার
২০২৬-২৭ অর্থবছরের স্বাস্থ্য বাজেট বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাতের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি করেছে। তবে কেবল বরাদ্দের পরিমাণ বৃদ্ধি করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। প্রকৃত সাফল্য নির্ভর করবে অর্থ কতটা দক্ষতার সঙ্গে ব্যয় করা হচ্ছে, কত দ্রুত প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে এবং জনগণ কতটা উন্নত স্বাস্থ্যসেবা পাচ্ছে তার ওপর। রেকর্ড বরাদ্দ যদি প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্বল পরিকল্পনা এবং কার্যকর বাস্তবায়ন ব্যর্থতার কারণে অপচয় হয়, তাহলে এটি আরেকটি ব্যর্থ সম্ভাবনায় পরিণত হবে। কিন্তু সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং কার্যকর ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই অর্থ ব্যবহার করা গেলে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য খাত সত্যিকার অর্থেই একটি নতুন মাত্রায় সুদৃঢ় অবস্থান নিশ্চিত করতে পারে।
