ঋষভ ভাটনগর
বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়, দুবাই
২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়া ৫০ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো একটি বাণিজ্য কাঠামোতে স্বাক্ষর করে। ২০২৬ সালের আগস্টে দুই দেশের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলারে। তবে কৃষি খাতে সহযোগিতার জন্য এখনও কোনো বাধ্যতামূলক চুক্তি নেই। পাঁচ বছরে পারস্পরিক সদিচ্ছা, যৌথ গবেষণা ও অভিন্ন প্রয়োজনের ভিত্তিতে অংশীদারত্বের পরিসর বেড়েছে। প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশের খাদ্য সরবরাহ নিশ্চিত করতে এই অগ্রগতি কি যথেষ্ট?
দুই দেশ, একটি কাঠামো
ট্রেড অ্যান্ড ইনভেস্টমেন্ট ফ্রেমওয়ার্ক অ্যারেঞ্জমেন্ট (টিআইএফএ) দুই দেশের মধ্যে ৫০ বছরের মধ্যে প্রথম এ ধরনের উদ্যোগ। তবে এটি বিস্তৃত বা আইনগতভাবে বাধ্যতামূলক কোনো চুক্তি নয়। যৌথ কর্মীগোষ্ঠীর মাধ্যমে এর কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ক্যানবেরায় অনুষ্ঠিত তৃতীয় বৈঠকে অস্ট্রেলিয়া স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের পরও শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত বাজারসুবিধা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করে। পাশাপাশি বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন ফল আমদানির আগ্রহ জানায়। দুই দেশের পঞ্চম বৈঠকের প্রস্তুতি চলছে।
কূটনৈতিক আলোচনার বাইরেও দুই দেশের সহযোগিতার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি রয়েছে। অস্ট্রেলিয়ান সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল অ্যাগ্রিকালচারাল রিসার্চ (এসিআইএআর) ১৯৯০-এর দশকের মাঝামাঝি থেকে বাংলাদেশে কাজ করছে। লবণাক্ততা সহনশীল গম ও ডাল উৎপাদন নিয়ে সংস্থাটির একটি প্রকল্প ২০১৭ সালের মার্চ থেকে ২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত চলে। প্রকল্পটির বাজেট ছিল প্রায় ২১ লাখ অস্ট্রেলীয় ডলার; পরে তা শেষ হয়।
তবে দুই দেশের বাণিজ্য প্রায় ৫৫০ কোটি মার্কিন ডলারে পৌঁছানোর যে হিসাব দেওয়া হচ্ছে, তা শুধু কৃষিপণ্যের বাণিজ্য নয়। অস্ট্রেলিয়ার নিজস্ব দেশভিত্তিক তথ্যপত্রে মোট বাণিজ্যের পরিমাণ ৫২০ কোটি অস্ট্রেলীয় ডলার উল্লেখ করা হয়েছে। এর বড় অংশজুড়ে রয়েছে অস্ট্রেলিয়ার প্রাকৃতিক তন্তু এবং বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের বিনিময়।
দুই দেশের প্রয়োজন, এক অসম সম্পর্ক
এই অংশীদারত্ব থেকে দুই দেশই লাভবান হয়, তবে সমানভাবে নয়। ২০২৫-২৬ বিপণন বছরে বাংলাদেশ রেকর্ড প্রায় ৭৩ লাখ ১০ হাজার টন গম আমদানি করেছে। দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন মোট চাহিদার ১০ শতাংশেরও কম পূরণ করে। ২০২২ সালে অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশে প্রায় ২ লাখ ৯৫ হাজার টন গম পাঠায়, যা দেশটির মোট গম রপ্তানির ১ শতাংশের সামান্য বেশি। রাশিয়া, ইউক্রেন ও কানাডাও বাংলাদেশের বাজারে গম সরবরাহ করে।
ভোজ্যতেলের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। বাংলাদেশ তার চাহিদার ৭০ শতাংশের বেশি আমদানি করে, যার পেছনে বছরে ব্যয় হয় ২৮৯ কোটি মার্কিন ডলারেরও বেশি। দুই দেশের অভিন্ন স্বার্থ রয়েছে, তবে সম্পর্কের ভারসাম্য অসম। অস্ট্রেলিয়া বাংলাদেশের একাধিক নির্ভরযোগ্য সরবরাহকারীর মধ্যে একটি। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিলে বাংলাদেশের ওপর তার প্রভাব প্রায় পুরোপুরি এসে পড়ে।
একই কৃষিতে দুই ধরনের ক্ষতি
বাংলাদেশে খাদ্য উৎপাদনের আগেও ক্ষতি হয়, ফসল তোলার পরও হয়। ২০২৪ সালের জাতীয় মাটির লবণাক্ততা মানচিত্রে দেখা যায়, দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের মোট প্রায় ১৭ লাখ ৩ হাজার হেক্টর আবাদযোগ্য জমির মধ্যে প্রায় ১১ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর জমি লবণাক্ততার কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ২০০৯ সালে ক্ষতিগ্রস্ত জমির পরিমাণ ছিল প্রায় ১০ লাখ ৫৬ হাজার হেক্টর। একই প্রতিবেদনে এক অর্থনীতিবিদের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, গত দুই দশকে দেশের আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ৯০ লাখ হেক্টর থেকে কমে ৮০ লাখ হেক্টরের কাছাকাছি এসেছে।
ফসল তোলার পর সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ ফল নষ্ট হয়। দশটি খাদ্যপণ্য নিয়ে করা এক গবেষণায় বছরে প্রায় ৫১ লাখ ৩০ হাজার টন খাদ্যপণ্যের অপচয়ের হিসাব পাওয়া গেছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ২৪০ কোটি মার্কিন ডলার।
এ ক্ষতি রপ্তানির সম্ভাবনাকেও সরাসরি বাধাগ্রস্ত করে। অস্ট্রেলিয়ার বাজারে বাংলাদেশের গ্রীষ্মকালীন ফলের চাহিদা থাকলেই লাভ হবে না, দীর্ঘ যাত্রাপথে ফলের গুণগত মান অক্ষুণ্ন রাখাও জরুরি। ২০২২ সালে আম রপ্তানির জন্য বাংলাদেশ অস্ট্রেলিয়ার কাছে কোল্ড চেইন প্রযুক্তি ও নিবন্ধনসংক্রান্ত সহায়তা চেয়েছিল। কিন্তু এ ক্ষেত্রে ঘাটতি এখনও কাটেনি।
দুই পক্ষের দায়িত্ব, সময়সীমা একটি
কৃষি মন্ত্রণালয়ের উচিত এই অংশীদারত্বকে কূটনৈতিক সৌজন্য হিসেবে না দেখে উন্নয়নের হাতিয়ার হিসেবে বিবেচনা করা। গবেষণার ফল মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে দ্রুত বীজ উৎপাদন ও বংশবৃদ্ধি, প্রত্যয়নপ্রাপ্ত বীজ বিতরণ এবং দেশের দক্ষিণাঞ্চলে প্রদর্শনী খামার গড়ে তোলা প্রয়োজন। রপ্তানির প্রস্তুতির জন্য আন্তর্জাতিক স্বীকৃতিসম্পন্ন পরীক্ষাগার, উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধের সক্ষমতা এবং পণ্যের উৎপত্তি ও সরবরাহপথ শনাক্ত করার ব্যবস্থা জোরদার করতে হবে। একই সঙ্গে হিমাগার ও ফল প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং প্যাকেজিং কেন্দ্র গড়ে তুললে ফসল-পরবর্তী ক্ষতি কমবে, কৃষকের আয়ও বাড়বে।
জমির খণ্ডীকরণের সমস্যা মোকাবিলায় সমবায়ভিত্তিক ও চুক্তিভিত্তিক চাষাবাদ সম্প্রসারণ করা যেতে পারে। পাশাপাশি দেশীয় ডাল ও তেলবীজ উৎপাদন বাড়াতে হবে। অস্ট্রেলিয়ার সরবরাহ হবে প্রয়োজনে সহায়তার বিকল্প উৎস, দেশের খাদ্যনিরাপত্তার প্রধান ভিত্তি নয়। বাণিজ্য ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় করে একটি বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা প্রয়োজন, যা যৌথ অঙ্গীকারের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং নিয়মিত ফলাফল প্রকাশ করবে। এতে কোনো একজন মন্ত্রীর উদ্যোগ বা সদিচ্ছার ওপর অগ্রগতি নির্ভরশীল থাকবে না।
সময়ের চাপও বাড়ছে। বাংলাদেশ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য নির্ধারিত রয়েছে। তবে বাংলাদেশ আরও তিন বছর সময় চেয়ে জাতিসংঘের কাছে আবেদন করেছে। নির্ধারিত তারিখের আগেই এ বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। যে সিদ্ধান্তই হোক, অন্য বাজারে অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা সংকুচিত হওয়ার প্রেক্ষাপটে অস্ট্রেলিয়ার শুল্কমুক্ত বাজারসুবিধার গুরুত্ব থাকবে।
পরবর্তী পদক্ষেপ হওয়া উচিত অ-বাধ্যতামূলক কাঠামোকে পরিমাপযোগ্য অঙ্গীকারে রূপ দেওয়া। এ জন্য যৌথ অর্থায়ন, সুনির্দিষ্ট গবেষণার লক্ষ্য এবং বাজারে প্রবেশের সুস্পষ্ট সময়সীমাসহ একটি পৃথক কৃষি সহযোগিতা চুক্তি প্রয়োজন। অস্ট্রেলিয়া বাজারে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। বাংলাদেশ সেই সুযোগ কতটা কাজে লাগাতে পারবে, তার উত্তর খুঁজতে হবে ঢাকাকেই।
