ড. নাঈমা পারভীন
কভেন্ট্রি ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাজ্য
নীল অর্থনীতিকে নতুনভাবে দেখা
সুনীল অর্থনীতি বলতে সাধারণত সমুদ্র, বন্দর, নৌপরিবহন ও সমুদ্রের তলদেশে থাকা সম্পদের কথা বোঝানো হয়। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন ধারণা ছবির কেবল একটি অংশ তুলে ধরে। বিশ্বের অন্যতম নদীবহুল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত শক্তির উৎস শুধু বঙ্গোপসাগর নয়, বরং বিস্তৃত নদীজাল, জলাভূমি, মোহনা, প্লাবনভূমি এবং অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদও। তাই সত্যিকার অর্থে রূপান্তরধর্মী সুনীল অর্থনীতির ধারণায় সামুদ্রিক ও অভ্যন্তরীণ জলজ সম্পদ, উভয়কেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
এই বিস্তৃত দৃষ্টিভঙ্গি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দেশের আটটি বিভাগের মানুষের জীবিকা ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে পানির নিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। উপকূলীয় মৎস্য আহরণ ও সামুদ্রিক বাণিজ্য থেকে শুরু করে স্বাদুপানির মাছ চাষ এবং জলাভূমির বাস্তুতন্ত্র পর্যন্ত, বাংলাদেশের জলজ সম্পদ খাদ্যনিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, বাণিজ্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখে। ফলে সুনীল অর্থনীতিকে শুধু উপকূলকেন্দ্রিক কর্মসূচি হিসেবে দেখলে চলবে না। অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সঙ্গে পরিবেশগত সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনাকে যুক্ত করে একে জাতীয় উন্নয়ন কৌশল হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
আট বিভাগজুড়ে সুনীল অর্থনীতির সম্ভাবনা
বন্দর, নৌপরিবহন, মৎস্যসম্পদ ও পর্যটনকেন্দ্রের কারণে চট্টগ্রাম বাংলাদেশের সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রধান প্রবেশদ্বার। তবে এর গুরুত্ব শুধু পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। সামুদ্রিক উদ্ভাবন, নৌপরিষেবা এবং নীল প্রযুক্তির কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাও এ অঞ্চলের রয়েছে। এর মাধ্যমে সমুদ্রনির্ভর শিল্পে বাংলাদেশ উচ্চমূল্যের পণ্য ও সেবার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
খুলনা ভিন্ন ধরনের, তবে সমান গুরুত্বপূর্ণ একটি দৃষ্টান্ত তুলে ধরে। সুন্দরবন এবং এ অঞ্চলের চিংড়ি ও কাঁকড়া শিল্প দেখায়, পরিবেশ সংরক্ষণ ও অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরস্পরের পরিপূরক হতে পারে। এখানকার অভিজ্ঞতা নীতিনির্ধারকদের মনে করিয়ে দেয়, সুস্থ বাস্তুতন্ত্র প্রবৃদ্ধির পথে বাধা নয়; বরং উৎপাদনশীল অর্থনৈতিক সম্পদ। বরিশালের বিস্তৃত নদীপথ, মৎস্যসম্পদ ও বিকাশমান পর্যটন খাতে উল্লেখযোগ্য সম্ভাবনা রয়েছে, যার বড় অংশ এখনো কাজে লাগানো হয়নি। তবে এ অঞ্চল এটাও দেখায় যে প্রাকৃতিক সম্পদ থাকলেই সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয় না। সহায়ক অবকাঠামো, বাজারে প্রবেশাধিকার এবং বিনিয়োগের অভাবে অর্থনৈতিক সুযোগের বড় অংশ অব্যবহৃত থেকে যায়।
অভ্যন্তরীণ বিভাগগুলোও সুনীল অর্থনীতির বিস্তৃত ধারণার পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ যুক্তি দেয়। সিলেট ও ময়মনসিংহের হাওরাঞ্চল দেশের সবচেয়ে উৎপাদনশীল স্বাদুপানির মৎস্যক্ষেত্রগুলোর কয়েকটির আবাস। পাশাপাশি এসব জলাভূমি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। একইভাবে রাজশাহী ও রংপুরের নদীকেন্দ্রিক জীবিকা, মাছ চাষ এবং অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন স্থানীয় অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ও খাদ্য উৎপাদনে অবদান রাখে।
অন্যদিকে, সুনীল অর্থনীতির প্রাতিষ্ঠানিক কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে ঢাকা। নীতিনির্ধারণ, গবেষণা, শিক্ষা ও আর্থিক পরিষেবার মাধ্যমে রাজধানী এমন জ্ঞানভিত্তি ও প্রশাসনিক কাঠামো সরবরাহ করতে পারে, যা বিভিন্ন অঞ্চলের সম্ভাবনাকে একটি সুসংহত জাতীয় কৌশলের আওতায় যুক্ত করবে।
সম্পদ আহরণ থেকে দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনায়
প্রাকৃতিক সম্পদনির্ভর উন্নয়ন কৌশলের একটি সাধারণ দুর্বলতা হলো, সেখানে দীর্ঘমেয়াদি সংরক্ষণের চেয়ে সম্পদ আহরণকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির স্থায়ী সাফল্য নির্ভর করবে জলজ সম্পদ থেকে কত সম্পদ আহরণ করা যাচ্ছে, তার চেয়ে বেশি নির্ভর করবে সেসব সম্পদ কতটা দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনা ও সংরক্ষণ করা হচ্ছে তার ওপর।
মাছের মজুত, জলাভূমি, ম্যানগ্রোভ বন এবং উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র পুনর্নবীকরণযোগ্য সম্পদ। এসব সম্পদ টিকিয়ে রাখতে সুরক্ষা ও পুনর্বিনিয়োগ প্রয়োজন। পরিবেশের অবক্ষয় স্বল্পমেয়াদে কিছু অর্থনৈতিক লাভ এনে দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তা মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির প্রতিকূলতা মোকাবিলার সক্ষমতা দুর্বল করে। জলবায়ু পরিবর্তন এই বাস্তবতাকে আরও স্পষ্ট করেছে। লবণাক্ততা বৃদ্ধি, জীববৈচিত্র্যের ক্ষয়, নদীভাঙন এবং চরম আবহাওয়ার ঘটনা দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের জলজ বাস্তুতন্ত্রের ওপর ক্রমবর্ধমান চাপ সৃষ্টি করছে।
তাই পরিবেশগত স্থায়িত্বকে পৃথক কোনো লক্ষ্য হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির ভবিষ্যৎ যে ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে থাকবে, তার কেন্দ্রে থাকতে হবে পরিবেশ সুরক্ষা ও সম্পদের দায়িত্বশীল ব্যবস্থাপনা।
টেকসই সুনীল ভবিষ্যতের জন্য নীতিগত দিকনির্দেশনা
সবচেয়ে জরুরি চ্যালেঞ্জগুলোর একটি হলো সুশাসন ও সমন্বয়। পানিসম্পদনির্ভর বিভিন্ন খাত প্রায়ই আলাদা আলাদা প্রতিষ্ঠানের অধীনে পরিচালিত হয়, যাদের মধ্যে সমন্বয় সীমিত। মৎস্য, নৌপরিবহন, পর্যটন, পরিবেশ ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় উন্নয়ন পরস্পরসংযুক্ত বাস্তুতন্ত্রের ওপর নির্ভরশীল হলেও অনেক ক্ষেত্রে বিচ্ছিন্নভাবে পরিচালিত হয়। সমন্বিত শাসনকাঠামো গড়ে তোলা গেলে পরিকল্পনা উন্নত হবে, নীতির মধ্যে অসংগতি কমবে এবং সম্পদ ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর হবে।
দ্বিতীয় অগ্রাধিকার হওয়া উচিত অঞ্চলভিত্তিক বিনিয়োগের ভারসাম্য। জাতীয় পর্যায়ের আলোচনায় প্রায়ই বন্দর ও উপকূলীয় অবকাঠামো প্রাধান্য পায়। অথচ অভ্যন্তরীণ মৎস্যসম্পদ, জলাভূমি সংরক্ষণ, নদীপথে পরিবহন এবং মাছ ও অন্যান্য জলজ পণ্যের উৎপাদন থেকে বাজারজাতকরণ পর্যন্ত মূল্যশৃঙ্খলে বড় ধরনের সম্ভাবনা রয়েছে। উপকূলের বাইরেও বিনিয়োগ বাড়ালে অর্থনৈতিক উৎপাদন বৃদ্ধি পাবে, আঞ্চলিক বৈষম্য কমবে এবং উন্নয়নের সুফল আরও বিস্তৃত জনগোষ্ঠীর কাছে পৌঁছাবে।
মানবসম্পদের উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ভবিষ্যতের সুনীল অর্থনীতির জন্য সামুদ্রিক বিজ্ঞান, মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা, জলজ চাষের প্রযুক্তি, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, সরবরাহ ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার বিষয়ে দক্ষ জনবল প্রয়োজন হবে। এ কারণে জ্ঞান সৃষ্টি ও উদ্ভাবনে বিশ্ববিদ্যালয় এবং গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর ভূমিকা আরও বাড়ানো উচিত। বাংলাদেশের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা শুধু প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; এসব সম্পদ বুদ্ধিমত্তা ও দক্ষতার সঙ্গে পরিচালনার সামর্থ্যও গড়ে তুলতে হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, নীতিনির্ধারণের কেন্দ্রে স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে রাখতে হবে। জেলে, জলজ খামারের উৎপাদক, প্রক্রিয়াজাতকরণে নিয়োজিত কর্মী এবং জলজ পণ্যের মূল্যশৃঙ্খলে যুক্ত নারীরা বহু জলজ সম্পদের প্রধান ব্যবহারকারী ও রক্ষণাবেক্ষণকারী। তাঁদের অর্থায়ন, প্রযুক্তি, প্রশিক্ষণ ও বাজারে প্রবেশের সুযোগ বাড়ালে জীবিকার নিরাপত্তা জোরদার হবে এবং সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করা সহজ হবে।
সবার জন্য এক সুনীল ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির বিস্তার বঙ্গোপসাগরের উপকূল ছাড়িয়ে অনেক দূর পর্যন্ত। এর প্রবাহ রাজশাহীর নদীপথে, সিলেটের জলাভূমিতে, বরিশালের বিস্তৃত জলপথে, খুলনার ম্যানগ্রোভ বনে, চট্টগ্রামের সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে এবং ঢাকার নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠানগুলোতে। বিভিন্ন বাস্তুতন্ত্র ও জনগোষ্ঠীর পারস্পরিক সংযোগই এই অর্থনীতির মূল শক্তি।
এখন মূল চ্যালেঞ্জ শুধু সম্ভাবনা চিহ্নিত করা নয়, বরং উন্নয়নের সুফল যেন অন্তর্ভুক্তিমূলক ও টেকসই হয় এবং জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিতভাবে ছড়িয়ে পড়ে, তা নিশ্চিত করা। বিস্তৃত এই দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরিকল্পনা ও ব্যবস্থাপনা করা গেলে সুনীল অর্থনীতি কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার, পরিবেশগত স্থিতিস্থাপকতা বৃদ্ধি এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের শক্তিশালী চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশের সুনীল ভবিষ্যৎ তখনই শক্ত ভিত পাবে, যখন দেশের আটটি বিভাগই তার সুফল ভাগ করে নিতে পারবে।
তথ্যসূত্র:
Failler, P., Hussain, M. G., Karim, A. A., Alam, M. K., Sarker, S., Rouf, M. A., et al. (2020). The Future of the Blue Economy in Bangladesh. Bangabandhu Sheikh Mujibur Rahman Maritime University. [bsmrmu.edu.bd]
Patil, P. G., Virdin, J., Colgan, C. S., Hussain, M. G., Failler, P., & Vegh, T. (2018). Toward a Blue Economy: A Pathway for Bangladesh’s Sustainable Growth. Washington, DC: World Bank Group. [openknowle…ldbank.org], [documents1…ldbank.org]
UNCTAD. (2026). Sustainable Ocean and Blue Economy. United Nations Conference on Trade and Development. [unctad.org]
UNCTAD. (2025). Global Trade Update: Sustainable Ocean Economy. United Nations Conference on Trade and Development. [unctad.org]
World Bank. (2022). Creating a Green and Sustainable Growth Path for Bangladesh. World Bank Group. [worldbank.org]
Buhiyan, A. A. H., Al Muntasir, M. F., & Orpa, S. H. (2025). “Navigating the Blue Economy in Bangladesh: Strategic Prospects, Challenges and Pathways toward Sustainable Maritime Growth.” GSC Advanced Research and Reviews, 23(3), 366-379. [gsconlinepress.com]
Islam, M. S., & Rahman, M. M. (2024). “Blue Economy of Bangladesh and Sustainable Development Goals (SDGs): A Comprehensive Assessment.” Discover Sustainability, Springer. [link.springer.com]
