সুমাইয়া হাসি
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
সমাজে প্রচলিত একটি অবধারিত নিয়মের মুখোমুখি প্রায় প্রতিটি মানুষকে হতে হয়, আর তা হলো ব্যক্তিগত জীবনকে অন্যের মাপকাঠিতে পরিমাপ করার প্রবণতা। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষের প্রতিটি পদক্ষেপ যেন সমাজের অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। বিশেষ করে যখন প্রশ্নটি বিবাহ বা জীবনসঙ্গী নির্বাচনের মতো অত্যন্ত ব্যক্তিগত একটি বিষয়ের হয়, তখন সমাজ বা পরিবার কেবল দর্শক হয়ে থাকে না, বরং সর্বেসর্বা ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়।
অথচ সমাজ বা পরিবার কখনোই কোনো মানুষের ব্যক্তিগত জীবনের সুখ বা মানসিক শান্তি নিশ্চিত করতে পারে না। সুস্থ মানসিকতার পরিচয় দিতে হলে কুসংস্কারের গণ্ডি ভেঙে ব্যক্তিমানুষের স্বাতন্ত্র্য ও গোপনীয়তাকে স্বীকার করতে হবে।
কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাসের বলয়
আমাদের সমাজে আজও এমন বহু কুসংস্কার ও অন্ধ বিশ্বাস শিকড় গেড়ে বসে আছে যা মানুষের মুক্তবুদ্ধিকে অবরুদ্ধ করে রাখে। ব্যক্তিমানুষের নিজস্ব পছন্দ, চিন্তাধারা কিংবা ভালো লাগাকে পাশ কাটিয়ে সামাজিক গোঁড়ামি এবং তথাকথিত কুলমর্যাদার অহংকারকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। মানুষ যখন অন্ধভাবে এই প্রথাগুলোকে আঁকড়ে ধরে থাকে, তখন সমাজ এক ধরণের অসুস্থ মানসিকতার জালে আটকে যায়।
এই কুসংস্কারগুলোর কারণে একজন মানুষ স্বাধীনভাবে বাঁচতে পারে না। কুসংস্কার মানুষকে পরনির্ভরশীল করে তোলে এবং অন্যের মতামতকে নিজের ভাগ্য নির্ধারণের চাবিকাঠি বানিয়ে দেয়। এই অবস্থা থেকে বেরিয়ে আসার একমাত্র উপায় হলো মননশীল ও সুস্থ মানসিকতার চর্চা করা। বিজ্ঞানমনস্কতা এবং আধুনিক দৃষ্টিভঙ্গি ছাড়া কোনো সমাজই এগিয়ে যেতে পারে না।
‘মানুষ কী বলবে’ – স্বাধীন চিন্তার সবচেয়ে বড় অন্তরায়
আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে থাকা একটি মারাত্মক রোগ হলো ‘মানুষ কী বলবে’ বা ‘সমাজ কী ভাববে’ এই জুজু। এই ভয়ের কারণে মানুষ নিজের ভেতরের সত্তাকে বিসর্জন দেয়। সমাজকে খুশি করার এই দীর্ঘশ্বাসী দৌড়ে মানুষ নিজের স্বাধীন চিন্তাকে গলা টিপে হত্যা করে। অথচ সমাজ কি কখনো কোনো মানুষের ভাঙা মন জোড়া লাগাতে পেরেছে? সমাজ কি কোনো ব্যক্তির অন্তরের হাহাকার দূর করতে পেরেছে? উত্তর হলো না। সমাজ কেবল বাহ্যিক রূপ দেখে রায় দিতে পারে, কিন্তু ভেতরের কান্নার আওয়াজ শুনতে পায় না। মানুষ যখন সবসময় অন্যের চোখে নিজেকে বিচার করাতে যায়, তখন তার নিজস্ব ব্যক্তিত্ব ও মৌলিক চিন্তা চিরতরে হারিয়ে যায়। স্বাধীনভাবে চিন্তা করার ক্ষমতা না থাকলে মানুষ কেবল সমাজের হাতের একটি পুতুলে পরিণত হয়।
সুখ একান্তই ব্যক্তিগত বিষয়
সুখ কোনো সামাজিক বা সমষ্টিগত বিষয় নয়, এটি পুরোপুরি একটি ব্যক্তিগত অনুভূতি। কার জীবনে কিসে শান্তি, কার মানসিক তৃপ্তি কোনটিতে, তা কেবল সেই ব্যক্তি নিজেই সবচেয়ে ভালো বোঝেন। চারপাশের মানুষ বা সমাজ ঠিক করে দিতে পারে না কার জীবন সফল আর কার জীবন ব্যর্থ। সমাজের চোখে যা সফল জীবন, তা হয়তো ভেতর থেকে চরম অশান্তিময়। আবার সমাজের চোখে যা সাধারণ বা বেমানান, ব্যক্তিগত স্তরে সেটাই হয়তো পরম শান্তির। তাই সুখকে সমাজের ছাঁচে ঢালার চেষ্টা করা বোকামি ছাড়া আর কিছু নয়। বাহ্যিক জৌলুস বা সামাজিক বাহবা কখনো মনের গভীরে প্রশান্তি এনে দিতে পারে না। নিজের ভেতরের শান্তি এবং আত্মিক সন্তুষ্টির ওপর নির্ভর করেই প্রকৃত সুখের সৌধ গড়ে ওঠে।
বিয়ের সিদ্ধান্ত: দুই পরিবারের হীনম্মন্যতা বনাম ব্যক্তির স্বাধীনতা
একটি মানুষের জীবনের অন্যতম বড় ও গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত হলো বিবাহ। এটি কেবল দুটি মনের মিলন নয়, বরং দুটি স্বতন্ত্র মানুষের একসঙ্গে পথ চলার অঙ্গীকার। অথচ আমাদের দেশে বিয়ে মানেই যেন এক মহা সামাজিক যজ্ঞ, যেখানে হবু দম্পতির চেয়ে চারপাশের আত্মীয়স্বজন ও মুরব্বিদের মতামত বেশি প্রাধান্য পায়। দুই পরিবারের সিনিয়র ব্যক্তিরা যখন এই প্রক্রিয়ায় যুক্ত হন, তখন সেখানে নানা ধরনের অযৌক্তিক তর্কবিতর্ক, সামাজিক মর্যাদা, এবং আভিজাত্যের অহংকার জড়িয়ে পড়ে।
যে মানুষটি সারাজীবন ওই মানুষটির সাথে সংসার করবে, যার ভালো-মন্দের পুরো দায়িত্বর ভার নিজের কাঁধে নিতে হবে, তার নিজের ইচ্ছা বা পছন্দকে অনেক সময় তুচ্ছ জ্ঞান করা হয়। পরিবার বা সমাজের মতামতকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দিতে গিয়ে অনেক সময় ভুল মানুষের সাথে জীবন জুড়ে দিতে বাধ্য হয় তরুণ প্রজন্ম। অথচ দিনশেষে যার জীবন, যার সুখ, যার মানসিক স্বস্তি, সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রথম ও শেষ অধিকার তারই থাকা উচিত। পরিবারের মুরুব্বিদের অভিজ্ঞতা থেকে পরামর্শ নেওয়া যেতে পারে, কিন্তু সেই পরামর্শ যখন অন্ধ অনুশাসন বা জোরপূর্বক চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্তে পরিণত হয়, তখন তা ব্যক্তিগত জীবনের জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়ায়।
সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নীতিগত ভূমিকা: ব্যক্তিগত সুরক্ষার প্রাতিষ্ঠানিক রূপ
একজন শিক্ষাবিদ ও সমাজবিজ্ঞান অনুরাগী হিসেবে আমি মনে করি, ব্যক্তির এই স্বাধীনতা ও মানসিক শান্তি রক্ষায় রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ভূমিকা অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট ও প্রাতিষ্ঠানিক হওয়া প্রয়োজন। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের কাজ ব্যক্তিমানুষের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ করা নয়, বরং এমন একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো তৈরি করা যা ব্যক্তির মৌলিক অধিকার ও গোপনীয়তাকে সামাজিক চাপ থেকে রক্ষা করবে।
পেশাদার পারিবারিক কাউন্সেলিং সেবা: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে দক্ষ সামাজিক কর্মী ও মনস্তাত্ত্বিকদের মাধ্যমে ‘পারিবারিক কাউন্সেলিং ইউনিট’ গড়ে তুলতে পারে। যখন কোনো দম্পতি বা ব্যক্তি পারিবারিক বা সামাজিক চাপের মুখোমুখি হবেন, তখন তারা সমাজ বা আত্মীয়দের অপপ্রচারের শিকার না হয়ে একটি গোপনীয় ও বিশ্বাসযোগ্য পরিবেশে পেশাদারদের পরামর্শ নিতে পারবেন।
সামাজিক কুসংস্কার দূরীকরণে সচেতনতা বৃদ্ধি: কুসংস্কার এবং ‘সমাজ কি বলবে’ কেন্দ্রিক মানসিক অসুস্থতা দূর করতে মন্ত্রণালয় ব্যাপক প্রচারমূলক কর্মসূচি গ্রহণ করতে পারে। সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতার গুরুত্ব, দাম্পত্য জীবনে গোপনীয়তার প্রয়োজনীয়তা এবং নারীর আত্মমর্যাদা নিয়ে গণসচেতনতামূলক ক্যাম্পেইন পরিচালনা করা অত্যন্ত জরুরি।
নিবেদিত হেল্পলাইন ও মানসিক সহায়তা: অনাকাঙ্ক্ষিত সামাজিক চাপ, জোরপূর্বক বিয়ে বা পারিবারিক মানসিক নির্যাতন প্রতিরোধে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় একাট সার্বক্ষণিক জাতীয় হেল্পলাইন সার্ভিস পরিচালনা করতে পারে।
নিরাপত্তা কেন্দ্রিক মধ্যস্থতা: সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের নিয়ন্ত্রণে গ্রাম বা নগরের সালিশি প্রথার মানসিকতা পরিবর্তন করে সেখানে প্রশিক্ষিত, লিঙ্গ-সংবেদনশীল ও আইনগত সচেতন কর্মকর্তাদের যুক্ত করা দরকার, যেন সামাজিক মেলবন্ধনের নামে ব্যক্তির অনিচ্ছাকে জোর করে চাপিয়ে না দেওয়া হয়।
ব্যক্তিগত জীবন সমাজ থেকে দূরে রাখাই শ্রেয়
পরিশেষে বলা যায়, নিজের মানসিক স্বাস্থ্য, শান্তি এবং আত্মমর্যাদা বজায় রাখার জন্য ব্যক্তিগত জীবনের গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়গুলোকে সমাজের কৌতূহলী দৃষ্টি এবং অযাচিত হস্তক্ষেপ থেকে দূরে রাখাই বুদ্ধিমানের কাজ। সমাজ কখনোই কোনো মানুষের দায়িত্ব নেয় না, কিন্তু সমালোচনা করতে এক মুহূর্তও দেরি করে না। তাই অন্যের প্ররোচনায় বা সামাজিক চাপে নিজের জীবনকে ধ্বংস না করে, নিজের সিদ্ধান্ত নিজেই নেওয়ার সাহস অর্জন করতে হবে।
কুসংস্কারের অন্ধকার ভেদ করে একটি আধুনিক, প্রগতিশীল এবং স্বাধীন মানসিকতার সমাজ গড়ে তুলতে হলে সবার আগে ব্যক্তিমানুষের স্বাধীনতাকে স্বীকার করতে হবে। রাষ্ট্র ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের উচিত এমন একটি সামাজিক পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে পরামর্শ হবে স্বেচ্ছায় চাওয়ার বিষয়, আর প্রতিটি মানুষ তার নিজের জীবনের চাবিকাঠি নিজের হাতে রাখার সাহস পাবে।
