দীপ্তি রাণী সাহা
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়
শরৎ এলেই ঢাকের প্রথম বাদ্যি শোনার অনেক আগে উৎসবের সূচনা হয় কুমোরদের ধুলোমাখা গলিতে। পুরান ঢাকার শাঁখারীবাজারে আমি দেখেছি, বাঁশ আর খড়ের কাঠামোর ওপর নদীর মাটি লেপে দিচ্ছেন কারিগরেরা। আঙুলের আলতো ছোঁয়ায় ফুটিয়ে তুলছেন মুখের আদল। মনে হয়, মাটির সেই মুখে ধীরে ধীরে প্রাণের স্পন্দন জেগে উঠছে।
দশটি হাত গড়ে ওঠে একে একে। প্রতিটি হাতে বসে নির্দিষ্ট অস্ত্র, প্রতিটি ভঙ্গিতে ফুটে ওঠে আলাদা তাৎপর্য। কর্মশালার স্যাঁতসেঁতে আলোয় তখনও তিনি দেবী নন, পূর্ণাঙ্গ প্রতিমাও নন, বরং হয়ে ওঠার অপেক্ষায় থাকা এক প্রতিশ্রুতি। বাংলাদেশের দুর্গোৎসবের শুরু এখানেই, আচার অনুষ্ঠানের আগে শিল্পীর হাতের কারুকাজে। একজন শিল্পীর কাছে উৎসবের এই সূচনাই সবচেয়ে গভীর অনুভূতির।
বদ্বীপের রঙে উৎসবের আয়োজন
বাংলাদেশের পূজামণ্ডপ গড়ে ওঠে এই ভূখণ্ডের চেনা উপকরণে। বাঁশ, পাট, পোড়ামাটি আর হাতে বোনা কাপড় দিয়ে তৈরি হয় মণ্ডপের দেয়াল ও ছাউনি। কোথাও কোথাও তাতে জায়গা করে নেয় নকশিকাঁথার লতাপাতার নকশা। উঠোনের মেঝেতে চালের গুঁড়া দিয়ে আঁকা হয় সাদা আলপনা, আর শোলার তৈরি অলংকারে ফুটে ওঠে শুভ্র ফুলের আভাস। অক্টোবরেও আকাশে বর্ষার ধূসর ছায়া থেকে যায়। তার বিপরীতে গাঁদা ফুলের কমলা, সিঁদুরের লাল আর কলাপাতার সবুজ রং আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। প্রতিমার গোলগাল মুখাবয়বে থাকে বাংলার লোকশিল্পের কোমলতা, মঞ্চের সাজসজ্জার মতো নিখুঁত ও কৃত্রিম কোনো আড়ম্বর নয়।
ঢাকেশ্বরী মন্দিরে সন্ধ্যার আরতি যেন চোখের সামনে ফুটে ওঠা এক জীবন্ত ছবি। ঢাকের বাদ্য ক্রমেই তীব্র হয়, শঙ্খের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়ে মন্দিরের প্রাঙ্গণে। ধুনুচির ধোঁয়া প্রদীপের আলোয় পাক খেয়ে ওপরে ওঠে, যেন বাতাসে কেউ ধীর হাতে লিখে চলেছেন অদৃশ্য অক্ষর। বহুবার এই দৃশ্য আঁকার চেষ্টা করেছি, কিন্তু কখনোই পুরোপুরি ধরে রাখতে পারিনি। কারণ, এই দৃশ্যের আসল সৌন্দর্য শুধু রং, আলো কিংবা ধোঁয়ায় নয়, বরং শত শত মানুষের একই ছন্দে শ্বাস নেওয়ার অনুভূতিতে।
সম্প্রীতির পরিসরে
এই ছবির ভেতরে কারা আছেন, সেটাই আমাকে সবচেয়ে বেশি টানে। একটি ক্যানভাসের সমৃদ্ধি নির্ভর করে তাতে কত রকমের হাতের ছাপ পড়েছে, তার ওপর। বাংলাদেশের পাড়ায় পাড়ায় দুর্গাপূজার আয়োজনেও সেই বৈচিত্র্য দেখা যায়। বিভিন্ন ধর্মের মানুষ একসঙ্গে মণ্ডপের আলো সাজান, বাঁশ বহন করেন, রাত জেগে পাহারা দেন। গলির ভেতর যে মণ্ডপ মাথা তুলে দাঁড়ায়, তার নির্মাণে তাই গোটা পাড়ার মানুষের অংশগ্রহণ থাকে।
প্রতিমা স্থাপনের পর নতুন পোশাক পরা শিশুরা মণ্ডপের আশপাশে ছুটে বেড়ায়। তাদের সবার ধর্ম এক নয়, কিন্তু উৎসবের আনন্দে সেই ভিন্নতা দূরত্ব তৈরি করে না। আগত দর্শনার্থীদের হাতে তুলে দেওয়া হয় ভোগের খিচুড়ি। অচেনা মানুষও হয়ে ওঠেন অতিথি, ভাগ করে নেন একই খাবার, একই আনন্দ। বিজয়া দশমীর সরকারি ছুটি জাতীয় বর্ষপঞ্জিতেও এই উৎসবের স্থান নিশ্চিত করে। দুর্গাপূজা তখন আর কোনো একটি সম্প্রদায়ের ধর্মীয় আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, দেশের সম্মিলিত জীবনেরও অংশ হয়ে ওঠে।
তবে একজন সৎ শিল্পী শুধু উজ্জ্বল রং দিয়ে ছবি আঁকেন না। ছায়াও ছবিকে গভীরতা দেয়। গত কয়েক বছরে পূজামণ্ডপে ভাঙচুর হয়েছে, হামলার শিকার হয়েছেন পরিবারের সদস্যরা। সুন্দর ছবির আড়ালে এসব ঘটনা ঢেকে রাখার সুযোগ নেই। বরং এই অন্ধকারের কারণেই দুর্গাপূজার সময় মানুষের মধ্যে গড়ে ওঠা সম্প্রীতি আরও মূল্যবান হয়ে ওঠে।
সম্প্রীতি কোনো প্রাকৃতিক দৃশ্যের মতো উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া যায় না। সাধারণ মানুষ প্রতি বছর নিজেদের আচরণ ও সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে তাকে নতুন করে গড়ে তোলেন। মধ্যরাতে মণ্ডপ পাহারা দেওয়া প্রতিবেশীও শিল্পীর মতোই স্রষ্টা। শান্তিও মাটির মতো, বহু হাতের যত্নে তার রূপ তৈরি হয়। সেই যত্ন থেমে গেলে তার স্থায়িত্বও বিপন্ন হয়।
প্রতিবেশী দেশের উৎসব, ভিন্ন আয়োজন
সীমান্তের ওপারে কলকাতায় দুর্গাপূজা আজ বিশাল আয়োজনের এক শিল্পোৎসব। বিষয়ভিত্তিক মণ্ডপ তৈরি হয় মঞ্চসজ্জার আদলে, নকশাবিদেরা একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন, আর আলোকসজ্জায় ঝলমল করা সড়ক ধরে সারা রাত মানুষের ঢল নামে। ইউনেসকোর অপরিমেয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের স্বীকৃতি এই উৎসবের শিল্পকলা ও ঐতিহ্যগত গুরুত্বকেই তুলে ধরেছে। তবে আয়োজন যখন প্রতিযোগিতা ও পৃষ্ঠপোষকতার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন কখনো কখনো সাধারণ মানুষের সক্রিয় অংশগ্রহণ কমে যায়। উৎসবের মানুষ হয়ে ওঠেন দর্শক।
বাংলাদেশের দুর্গাপূজা এর বিপরীতে এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা তুলে ধরে। এখানে আয়োজনের পরিসর তুলনামূলক ছোট, মঞ্চের জাঁকজমকের চেয়ে ঘরোয়া আবহ বেশি, আর অনেক ক্ষেত্রেই উৎসবের মালিকানা থাকে পাড়ার মানুষের হাতে, কোনো করপোরেট পৃষ্ঠপোষকের হাতে নয়। বিশাল স্থাপত্যের অভাব এখানে ঘনিষ্ঠতার মধ্য দিয়ে পূরণ হয়। দর্শনার্থী চাইলে শিল্পী, পুরোহিত কিংবা ঢাকির কাছাকাছি দাঁড়িয়ে উৎসবের প্রতিটি মুহূর্ত অনুভব করতে পারেন।
নেপালেও একই দেবীকে ঘিরে পালিত হয় দশাইন। প্রায় দুই সপ্তাহের এই উৎসব পরিবারের দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। বড়রা ছোটদের কপালে চাল, দই ও সিঁদুর মিশিয়ে টিকা পরিয়ে দেন। গৃহদেবতার বেদিতে গজায় যবের চারা, আর আকাশ ও গ্রামের খোলা প্রান্তর ভরে ওঠে ঘুড়ি এবং বাঁশের দোলনায়। সেখানে উৎসব সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের জাতীয় জীবনের স্বাভাবিক ছন্দের অংশ।
বাংলাদেশে দুর্গাপূজার তাৎপর্য কিছুটা ভিন্ন। একটি ধর্মীয় সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের উৎসবকে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা যে ব্যাপ্তি দেয়, তার মধ্যে রয়েছে আলাদা এক মানবিক সৌন্দর্য। যে উৎসবের ঐতিহ্য সবাই নিজের পরিবার থেকে পায়নি, সেই উৎসবকে প্রতিবেশীর আনন্দ হিসেবে গ্রহণ করার মধ্যেই সম্প্রীতির বিশেষ অর্থ নিহিত।
নদীর কাছে দেবীর ফিরে যাওয়া
শেষ দিনে প্রতিমা নিয়ে যাওয়া হয় জলাশয়ের দিকে। বেলা গড়িয়ে সন্ধ্যা নামে বুড়িগঙ্গার তীরে। ঢাকের বাদ্য আরও দ্রুত হয়, সিঁদুর খেলায় মুখ রাঙিয়ে ওঠে, আর একসময় দেবীকে বিসর্জন দেওয়া হয় নদীর স্রোতে। কয়েক সপ্তাহ ধরে যত্নে গড়ে তোলা মাটির প্রতিমা ধীরে ধীরে মিশে যায় সেই নদীর জলে, যে নদীর মাটি থেকেই তার জন্ম।
একজন শিল্পী হিসেবে আমার কাছে এই মুহূর্তটির গভীরতা অন্য রকম। সৌন্দর্যকে সত্য করে তুলতে তাকে চিরকাল ধরে রাখতেই হবে, এমন কোনো কথা নেই। কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়ার মধ্যেও সৌন্দর্যের পূর্ণতা থাকে। মাটি তার পুরোনো রূপ হারিয়ে আবার প্রকৃতিতে ফিরে যায়, আর মানুষের মনে থেকে যায় সৃষ্টির স্মৃতি।
এরপর আসে বিজয়ার আলিঙ্গন, হাতে হাতে মিষ্টি বিনিময়, আর ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাওয়া গলিগুলো। উৎসব শেষ হয়, আলো নিভে আসে, কিন্তু থেকে যায় রঙের স্মৃতি। সঙ্গে থাকে আগামী বছরের অপেক্ষা, যখন আবার প্রদীপ জ্বলবে, ঢাক বাজবে, মণ্ডপ সাজবে, আর মানুষ একসঙ্গে উৎসবের আয়োজন করবে, কোনো ভয় ছাড়াই।
সেই আশার মধ্যেই বাংলাদেশের দুর্গাপূজা আমাদের একটি কথা মনে করিয়ে দেয়। একটি বড় ক্যানভাস গড়ে ওঠে বহু হাতের স্পর্শে, বহু ধর্মের মানুষের অংশগ্রহণে, আর সবার মাথার ওপর বিস্তৃত একই আকাশের নিচে।
