আসাদ শফিক
ডিটেক বাংলাদেশ
বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো বর্তমানে কোন অবস্থানে রয়েছে, এর ভৌত ও প্রযুক্তিগত ভিত্তিতে কোথায় কোথায় ঘাটতি আছে এবং সেসব ঘাটতি দূর করতে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয়ের কী কী পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন, এই প্রবন্ধে তা পর্যালোচনা করা হয়েছে।
দক্ষিণ এশিয়ার বৃহত্তম মোবাইল বাজারগুলোর একটি বাংলাদেশ। ২০২৬ সালের জুনের শেষে দেশে সক্রিয় মোবাইল সংযোগের সংখ্যা ছিল প্রায় ১৮ কোটি ৯৮ লাখ। দেশের জনসংখ্যা আনুমানিক ১৭ কোটি হলেও একাধিক সিম ব্যবহারের কারণে সংযোগের সংখ্যা জনসংখ্যাকে ছাড়িয়ে গেছে। মোট ১৩ কোটি ৫৯ লাখ ইন্টারনেট সংযোগের মধ্যে প্রায় ১২ কোটি ৮ লাখ মোবাইল নেটওয়ার্কনির্ভর। গ্রামীণফোন, রবি আজিয়াটা, বাংলালিংক ও রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিটক এই বাজারে সেবা দিচ্ছে। প্রায় ৮ কোটি ৬৬ লাখ গ্রাহক নিয়ে শীর্ষে রয়েছে গ্রামীণফোন (ফিন্যান্সিয়াল এক্সপ্রেস, ২০২৬)। বিকাশ ও নগদের মতো সেবার মাধ্যমে ব্যাংকিং সুবিধাবঞ্চিত লাখো মানুষ আর্থিক লেনদেনের সুযোগ পাচ্ছেন। এর মধ্য দিয়ে স্পষ্ট হয়, যোগাযোগব্যবস্থার বিস্তার কীভাবে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে মানুষের অংশগ্রহণ বাড়ায়।
সংযোগের বিস্তার উল্লেখযোগ্য হলেও সেবার মান সেই তুলনায় পিছিয়ে। ইন্টারনেটের গতিতে বাংলাদেশ আঞ্চলিক প্রতিযোগীদের তুলনায় পিছিয়ে রয়েছে। ব্যবহারকারীদের অভিযোগের মধ্যে রয়েছে বারবার কল বিচ্ছিন্ন হওয়া, শহরাঞ্চলে নেটওয়ার্কে অতিরিক্ত চাপ এবং ভবনের ভেতরে দুর্বল সংকেত। গ্রাহকসংখ্যার প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সেবার মানের সামঞ্জস্য প্রতিষ্ঠাই এখন এই খাতের প্রধান চ্যালেঞ্জ।
ভৌত অবকাঠামোর ঘাটতি
যেকোনো টেলিযোগাযোগ নেটওয়ার্কের মূল ভিত্তি ফাইবার অপটিক কেবল। এই অবকাঠামোতে বাংলাদেশ এখনো প্রয়োজনের তুলনায় অনেক পিছিয়ে। জেলা সদর ও বহু উপজেলা পর্যন্ত ফাইবার সংযোগ পৌঁছালেও ইউনিয়ন, গ্রাম এবং স্বতন্ত্র ভবন পর্যন্ত এর বিস্তার সীমিত। বড় শহরের বাইরে অনেক মোবাইল টাওয়ার এখনো মাইক্রোওয়েভ সংযোগ অথবা পুরোনো ব্যাকহল ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। ফলে নেটওয়ার্কের তথ্য পরিবহনের সক্ষমতা সীমিত থাকে এবং ৪জি সেবার মান সর্বত্র একরকম হয় না।
বিদ্যুৎ সরবরাহও বড় দুর্বলতা। ঘন ঘন লোডশেডিং এবং জাতীয় বিদ্যুৎ গ্রিডের অস্থিতিশীলতার কারণে টাওয়ার চালু রাখতে ব্যাটারি ও ডিজেল জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়। এতে পরিচালন ব্যয় বাড়ে এবং বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় সেবাও ব্যাহত হয়। ঢাকা ও চট্টগ্রামে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মাথার ওপর জট পাকানো তারের স্তূপ দেখা যায়। তার চুরি, দুর্ঘটনাজনিত বিচ্ছিন্নতা ও সড়ক নির্মাণের কাজে প্রায়ই সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কয়েকটি নির্দিষ্ট পথ ছাড়া ভূগর্ভস্থ নালার মাধ্যমে কেবল স্থাপনের ব্যবস্থাও তেমন বিস্তৃত নয়।
আন্তর্জাতিক সংযোগের ক্ষেত্রেও পর্যাপ্ত বিকল্পের অভাব রয়েছে। কক্সবাজারে অবতরণ করা অল্প কয়েকটি সাবমেরিন কেবল ব্যবস্থা এবং প্রতিবেশী দেশগুলোর মধ্য দিয়ে আসা স্থলভিত্তিক সংযোগের ওপর বাংলাদেশ নির্ভরশীল। একটি কেবলে ত্রুটি দেখা দিলে কিংবা রাজনৈতিক কারণে কোনো সংযোগ ব্যাহত হলে সারা দেশের ইন্টারনেট সেবায় ধীরগতি দেখা দিতে পারে। বিকল্প সংযোগব্যবস্থা আগের তুলনায় উন্নত হলেও ডেটা সেন্টার স্থাপন ও ডিজিটাল সেবা রপ্তানির লক্ষ্য পূরণে প্রয়োজনীয় সক্ষমতা এখনো অর্জিত হয়নি।
প্রযুক্তিগত সীমাবদ্ধতা
পরবর্তী প্রজন্মের নেটওয়ার্কে উত্তরণের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশ পিছিয়ে রয়েছে। ৫জি প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক ব্যবহার হয়েছে, কিন্তু বাণিজ্যিক বিস্তার এখনো সীমিত। অন্যদিকে, অধিকাংশ ব্যবহারকারীর নির্ভরতার জায়গা ৪জি নেটওয়ার্ক ইতিমধ্যে সক্ষমতার সীমার কাছাকাছি পৌঁছেছে। গ্রাহকসংখ্যার তুলনায় পর্যাপ্ত তরঙ্গ বরাদ্দ না থাকায় ব্যস্ত সময়ে অপারেটররা ধারাবাহিকভাবে ভালো গতির ইন্টারনেট দিতে পারছেন না।
স্থির ব্রডব্যান্ড সেবার ক্ষেত্রেও রয়েছে বিচ্ছিন্নতা। হাজার হাজার ছোট ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ভিন্ন ভিন্ন মানের সেবা দিচ্ছে। বাড়ি পর্যন্ত ফাইবার সংযোগ, অর্থাৎ এফটিটিএইচ, এখনো সর্বত্র পৌঁছায়নি। আইপিভি৬ প্রযুক্তির ব্যবহার, স্থানীয় সার্ভারে ডিজিটাল কনটেন্ট সংরক্ষণ এবং ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ পয়েন্টের সক্ষমতাও সীমিত। ফলে ইন্টারনেটের অনেক তথ্য দেশের ভেতরেই আদানপ্রদান করা সম্ভব হলেও বিদেশের সার্ভার ঘুরে আবার দেশে ফিরে আসে। এতে সংযোগে বিলম্ব বাড়ে এবং আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথ ব্যবহারের খরচও বেড়ে যায়।
নেটওয়ার্কের নিরাপত্তা ও বিপর্যয় মোকাবিলার সক্ষমতাও উদ্বেগের বিষয়। ২০২৪ সালের ইন্টারনেট বন্ধের ঘটনাগুলো দেখিয়েছে, ফ্রিল্যান্সার থেকে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী পর্যন্ত অর্থনীতির বিভিন্ন অংশ নিরবচ্ছিন্ন সংযোগের ওপর কতটা নির্ভরশীল। একই সঙ্গে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হলে ব্যবহারকারীদের সুরক্ষা ও প্রতিকারের সুযোগ কতটা সীমিত, তা-ও সামনে এসেছে। নেটওয়ার্ক পর্যবেক্ষণ, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং সেবার মান পরিমাপের ব্যবস্থাও এখনো যথেষ্ট উন্নত নয়।
নীতিগত সিদ্ধান্তও অবকাঠামোতে বিনিয়োগের ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে। লাইসেন্স ফি, রাজস্ব ভাগাভাগি, তরঙ্গ ব্যবহারের চার্জ, সম্পূরক শুল্ক এবং যন্ত্রপাতি আমদানির কর মিলিয়ে টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের ওপর বড় আর্থিক চাপ রয়েছে। ফলে নতুন টাওয়ার ও ফাইবার অবকাঠামো নির্মাণে বিনিয়োগের জন্য হাতে থাকা অর্থ কমে যায়। দেশব্যাপী সঞ্চালনসেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান ও টেলিযোগাযোগ অপারেটরদের জন্য পৃথক লাইসেন্স কাঠামো দায়িত্বের পুনরাবৃত্তি ঘটায় এবং অবকাঠামো সম্প্রসারণে বিলম্ব তৈরি করে। অপারেটর ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার মধ্যে অমীমাংসিত বিরোধও বিনিয়োগের সিদ্ধান্ত আটকে রাখে।
মন্ত্রণালয়ের জরুরি করণীয়
প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে মন্ত্রণালয়কে নির্দিষ্ট সময়সীমাসহ একটি জাতীয় ব্রডব্যান্ড ও তরঙ্গ ব্যবস্থাপনা রূপরেখা প্রকাশ করতে হবে। এর মাধ্যমে অপারেটরদের মধ্যবর্তী ব্যান্ডের তরঙ্গ ব্যবহারের বিষয়ে পূর্বানুমেয় সুযোগ দিতে হবে, যাতে তারা ৪জি নেটওয়ার্কের সক্ষমতা বাড়াতে এবং দায়িত্বশীলভাবে ৫জি চালু করতে পারে। তবে নীতিগত নিশ্চয়তা বিনিয়োগে রূপ নিতে হলে আর্থিক চাপও কমাতে হবে। তাই কর ও ফি কাঠামো যৌক্তিক করা সমান গুরুত্বপূর্ণ। নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম আমদানিতে শুল্ক কমানো এবং সম্মিলিত রাজস্ব ও তরঙ্গ ব্যবহারের চার্জের বোঝা হ্রাস করলে গ্রামীণ এলাকায় সংযোগ সম্প্রসারণের জন্য অতিরিক্ত অর্থ পাওয়া যাবে। পাশাপাশি, সার্বজনীন সেবা তহবিলে পরিমিত অবদান নির্ধারণ করে যেসব এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত সংযোগ নেই, সেগুলোকে অগ্রাধিকার দেওয়া যেতে পারে।
এরপর বিনিয়োগকে ফাইবার অবকাঠামোর আরও গভীরে পৌঁছে দিতে হবে। স্থানীয় সরকার, সড়ক নির্মাণ ও রক্ষণাবেক্ষণকারী সংস্থা এবং বিদ্যুৎ সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথ ভূগর্ভস্থ নালা নির্মাণ, অবকাঠামো ভাগাভাগি বাধ্যতামূলক করা এবং একই সড়কে বারবার খোঁড়াখুঁড়ি বন্ধের নীতি কার্যকর করা প্রয়োজন। এতে ব্যয় কমবে এবং শহরাঞ্চলের তারের জটও দূর করা সম্ভব হবে।
নেটওয়ার্কের স্থিতিশীলতা বাড়ানোর জন্য বিকল্প আন্তর্জাতিক সংযোগের ব্যবস্থাও জরুরি। নতুন সাবমেরিন কেবল সক্ষমতা, অতিরিক্ত স্থলভিত্তিক সংযোগপথ, ডেটা সেন্টার, স্থানীয় ইন্টারনেট এক্সচেঞ্জ এবং মোবাইল টাওয়ারে অগ্রাধিকারভিত্তিক বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা গেলে একটি সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ার কারণে পুরো নেটওয়ার্ক অচল হয়ে পড়ার ঝুঁকি কমবে।
উন্নত অবকাঠামোর পাশাপাশি প্রয়োজন স্বচ্ছ ও কার্যকর নিয়মনীতি। পরস্পরবিরোধী বা একই ধরনের দায়িত্ব সৃষ্টি করা লাইসেন্সগুলোর কাঠামো পুনর্বিন্যাস করতে হবে। সেবার মান নিয়ে প্রকাশ্য মানদণ্ড নির্ধারণ ও তার বাস্তব প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে আইনগতভাবে সীমিত ও সুস্পষ্ট পরিস্থিতি ছাড়া ইন্টারনেট বন্ধের সুযোগ রাখা উচিত নয়। এসব পদক্ষেপ সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবহারকারীদের মধ্যে আস্থা বাড়াবে। সবশেষে, লক্ষ্যভিত্তিক কর্মসূচি এবং দক্ষতা উন্নয়নের প্রশিক্ষণের মাধ্যমে নারী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর সংযোগবৈষম্য কমাতে হবে, যাতে যোগাযোগের সুযোগ বাস্তব অর্থনৈতিক সুবিধায় রূপ নেয়।
উপসংহার
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগের বিস্তারে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। কিন্তু বিপুলসংখ্যক সংযোগ থাকা আর মানসম্মত সেবা নিশ্চিত করা এক বিষয় নয়। ফাইবার, বিদ্যুৎ, তরঙ্গ বরাদ্দ ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার ঘাটতি দূর করার ওপর নির্ভর করছে দেশের ডিজিটাল অর্থায়ন, সেবা খাত এবং উৎপাদনশিল্পের ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা। সমন্বিত নীতি ও ধারাবাহিক বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে টেলিযোগাযোগ মন্ত্রণালয় ব্যাপক সংযোগের বর্তমান অবস্থান থেকে এগিয়ে গিয়ে প্রতিটি নাগরিকের জন্য নির্ভরযোগ্য ও উন্নত মানের সেবা নিশ্চিত করতে পারে।
তথ্যসূত্র:
Bangladesh Telecommunication Regulatory Commission (BTRC) subscriber data for June 2026, as reported in “Internet subscriber growth outpaces mobile connections in H1,” The Financial Express (Bangladesh), 2026. https://thefinancialexpress.com.bd/trade/internet-subscriber-growth-outpaces-mobile-connections-in-h1
