তুলনামূলক পর্যালোচনা: “বাংলাদেশের টেকসই কৃষি রূপান্তরের পথ”, অনিকেত বুলেটিন, ৬ জুন ২০২৬
সানুচ নাথা
থাম্মাসাট ইউনিভার্সিটি, থাইল্যান্ড
ধাননির্ভর দুই দেশ, অগ্রগতির ভিন্ন পর্যায়
মূল প্রবন্ধে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কৃষিকে শুধু তাৎক্ষণিক ফলন বাড়ানোর প্রচেষ্টা থেকে বেরিয়ে এসে টেকসই, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষম ব্যবস্থার দিকে এগোতে হবে। আবাদযোগ্য জমি কমে যাওয়া, মাটির অবক্ষয়, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর বাড়তি চাপ এবং একই জমিতে বারবার ধান চাষের মতো প্রবণতা কৃষির প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে।
থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ তুলনামূলক দৃষ্টান্ত হতে পারে (FFTC-AP, ২০১৮)। দেশটি বাংলাদেশের মতোই ধান উৎপাদননির্ভর এবং সেখানে ক্ষুদ্র কৃষকের সংখ্যাও উল্লেখযোগ্য। তবে যান্ত্রিকীকরণ, ফসলের বৈচিত্র্য বৃদ্ধি ও কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে দেশটি তুলনামূলকভাবে এগিয়েছে। একই সঙ্গে নিবিড় কৃষির পরিবেশগত মূল্যও এখন তাকে দিতে হচ্ছে। থাইল্যান্ডের অর্জন এবং অমীমাংসিত সমস্যাগুলো, দুই অভিজ্ঞতা থেকেই বাংলাদেশের শেখার সুযোগ রয়েছে।
মাঠপর্যায়ে প্রযুক্তির ব্যবহার
থাইল্যান্ডে বাংলাদেশের তুলনায় কৃষিযন্ত্র ও ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বেশি বিস্তৃত। জমি সমতল করার লেজার প্রযুক্তি, ভাড়ায় কৃষিযন্ত্র ব্যবহারের পরিষেবা, ড্রোন এবং স্যাটেলাইট ও আবহাওয়াভিত্তিক তথ্যের প্রয়োগ এর উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। এসব প্রযুক্তি উৎপাদন দক্ষতা বাড়িয়েছে এবং কৃষিশ্রমিকের সংকট মোকাবিলায় সহায়তা করেছে। বিশেষ করে কৃষকদের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে শ্রমনির্ভরতা কমানোর প্রয়োজনীয়তা আরও স্পষ্ট হয়েছে। বাংলাদেশ এখনো এই পথে প্রাথমিক পর্যায়ে রয়েছে। নির্ভুল কৃষি ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল কৃষি পরামর্শসেবা চালুর যে সুপারিশ মূল প্রবন্ধে করা হয়েছে, তার বাস্তব প্রয়োগ এখনো সর্বত্র সমান নয়।
দুই দেশের অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, প্রযুক্তির সুফল ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে পৌঁছাতে হলে তা ব্যক্তিগত মালিকানার পরিবর্তে যৌথ ব্যবহারের আওতায় আনা জরুরি। বাংলাদেশে প্রস্তাবিত কৃষিযন্ত্র ভাড়া কেন্দ্র এই ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। গবেষক ও কৃষি সম্প্রসারণকর্মীদের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ এবং সাধারণ মুঠোফোনের মাধ্যমে কৃষি পরামর্শসেবা নিশ্চিত করা গেলে ছোট জমির কৃষকেরাও ব্যয়বহুল যন্ত্রপাতি না কিনে আধুনিক কৃষিপদ্ধতি কাজে লাগাতে পারবেন। তাই সরকারি বিনিয়োগে বড় খামারের উপযোগী প্রযুক্তির পাশাপাশি যৌথভাবে ব্যবহারযোগ্য কৃষিযন্ত্র, সহজলভ্য তথ্য এবং প্রশিক্ষিত সেবাদাতাদের অগ্রাধিকার দেওয়া প্রয়োজন।
জমি ও পানির উৎপাদনক্ষমতা রক্ষা
পরিবেশ সুরক্ষার চেয়ে নিবিড় উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য বেশি গুরুত্ব পেলে কী ধরনের সমস্যা তৈরি হয়, থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতায় তার স্পষ্ট প্রতিফলন রয়েছে। ফসলের অবশিষ্টাংশ পোড়ানো, অতিরিক্ত রাসায়নিক ব্যবহার এবং পানির সংকট বায়ুর গুণমান ও মাটির স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় কম কার্বন নিঃসরণকারী ধান উৎপাদন, ফসলের অবশিষ্টাংশের যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং সাশ্রয়ী সেচব্যবস্থা ছড়িয়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বাংলাদেশের সংকটের ধরন কিছুটা ভিন্ন। এখানে লবণাক্ততার অনুপ্রবেশ, বন্যা এবং ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাওয়ার চাপ বেশি।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা হলো, সময় থাকতে সঠিক ব্যবস্থা নেওয়া। পরে ব্যয়বহুল সংস্কারের পথে হাঁটার পরিবর্তে কৃষির সম্প্রসারণের শুরু থেকেই জলবায়ু সহনশীল পদ্ধতি চালু করা সম্ভব। লবণাক্ততা সহনশীল জাত, পর্যায়ক্রমে জমি ভেজানো ও শুকানোর পদ্ধতি, সংরক্ষণমূলক কৃষি এবং পানি সাশ্রয়ী সেচকে স্বাভাবিক চর্চায় পরিণত করা দরকার। এর সঙ্গে মাটির স্বাস্থ্য রক্ষার কর্মসূচি, পরিকল্পিতভাবে ভূগর্ভস্থ জলাধার পুনর্ভরণ, ভূগর্ভস্থ পানির টেকসই ব্যবস্থাপনা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীভিত্তিক আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা যুক্ত হলে সুফল আরও বাড়বে। পরিবেশ সুরক্ষার ব্যবস্থা ছাড়া শুধু উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করলে শেষ পর্যন্ত কৃষক ও জনস্বাস্থ্যকেই তার মূল্য দিতে হয়, থাইল্যান্ডের অভিজ্ঞতা সেই সতর্কবার্তাই দেয়।
প্রযুক্তির সুফল কারা পাচ্ছেন
প্রযুক্তি যেমন বৈষম্য কমাতে পারে, তেমনি বিদ্যমান ব্যবধান আরও বাড়িয়েও দিতে পারে। থাইল্যান্ডে যেসব কৃষকের বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ ভালো ছিল, তারা যান্ত্রিকীকরণ ও রপ্তানি বাজারের সম্প্রসারণ থেকে তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধা পেয়েছেন। অন্যদিকে, বয়স্ক ও দরিদ্র কৃষক পরিবারগুলো ঋণের চাপ এবং সীমিত সুযোগের কারণে পিছিয়ে পড়েছে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও একই ঝুঁকি রয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জমির মালিকানা, ঋণপ্রাপ্তি ও প্রযুক্তি ব্যবহারের সুযোগে নারী কৃষকদের বৈষম্য, যার কথা মূল প্রবন্ধেও উঠে এসেছে।
তাই প্রতিটি প্রযুক্তি কর্মসূচির পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করতে হবে। নারী কৃষকদের প্রশিক্ষণ, কৃষি উপকরণ ও ঋণপ্রাপ্তিতে সমান সুযোগ দিতে হবে। যান্ত্রিকীকরণের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে ভূমিনীতি এমন হতে হবে, যাতে ক্ষুদ্র কৃষক ও বর্গাচাষিদের জমিতে চাষের অধিকার সুরক্ষিত থাকে। গ্রামীণ তরুণদের জন্য কারিগরি ও ডিজিটাল প্রশিক্ষণ তখনই কার্যকর হবে, যখন তা কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, সরবরাহ ও পরিবহন এবং কৃষি পরামর্শসেবার মতো বাস্তব কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত থাকবে। তাতে কৃষি তরুণদের কাছে শেষ অবলম্বল নয়, বরং আধুনিক ও সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে।
ক্ষুধা ও দারিদ্র্য হ্রাস এবং গ্রামীণ পরিষেবার উন্নয়নের মতো লক্ষ্যে থাইল্যান্ড তুলনামূলকভাবে এগিয়েছে। উচ্চ আয় এবং অর্থনীতির কাঠামোগত পরিবর্তন এর পেছনে ভূমিকা রেখেছে। তবে পরিবেশগত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন এবং গ্রামীণ বৈষম্য কমানোর ক্ষেত্রে দেশটিকে এখনো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হচ্ছে (FFTC-AP, ২০১৮)।
বাংলাদেশ খাদ্যের প্রাপ্যতা বাড়াতে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। তবে মূল প্রবন্ধে যথার্থভাবেই বলা হয়েছে, কৃষিতে টেকসই উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিত করার কাজ এখনো অসম্পূর্ণ। এ ক্ষেত্রে কৃষিসংক্রান্ত পরিসংখ্যান, ভূমি ব্যবহারের তথ্য এবং পরিবীক্ষণব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। মূল্যায়নের সূচকে শুধু উৎপাদনের পরিমাণ নয়, কারা সুফল পাচ্ছেন এবং প্রাকৃতিক সম্পদের অবস্থার কী পরিবর্তন হচ্ছে, তা-ও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে।
বাস্তবসম্মত অগ্রগতির পথ
দুই দেশের তুলনামূলক অভিজ্ঞতা থেকে বোঝা যায়, প্রযুক্তি, টেকসই উন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিকে আলাদা কর্মসূচি হিসেবে না দেখে সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। শীতল সংরক্ষণ ও পরিবহনব্যবস্থা, গুদাম, গ্রামীণ সড়ক এবং ক্ষুদ্র পরিসরে কৃষিপণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ করলে বৈচিত্র্যময় ফসলের বাজারমূল্য বাড়ানো সম্ভব।
সমবায়ভিত্তিক উদ্যোগ কৃষকদের দর-কষাকষির ক্ষমতা বাড়াবে এবং এসব অবকাঠামো থেকে যথাযথ সুবিধা পেতে সহায়তা করবে। ক্ষুদ্র কৃষক ও নারী কৃষকদের জন্য সাশ্রয়ী ঋণ এবং শস্যবিমার ব্যবস্থা থাকলে তাঁরা অসহনীয় আর্থিক ঝুঁকি ছাড়াই নতুন পদ্ধতি গ্রহণ করতে পারবেন। একই সঙ্গে ভর্তুকিব্যবস্থায় সংস্কার এনে উৎপাদনশীলতা ও পরিবেশগত কার্যকারিতাকে পুরস্কৃত করা এবং কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি ও পরিবেশবিষয়ক নীতির মধ্যে সমন্বয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
থাইল্যান্ড দেখিয়েছে, প্রযুক্তির ব্যবহার ও ফসলের বৈচিত্র্য একটি ধাননির্ভর অর্থনীতিকে কত দূর এগিয়ে নিতে পারে। তবে নিবিড় কৃষি জমি, বায়ু ও গ্রামীণ জীবিকার ওপর চাপ সৃষ্টি করলে তার প্রতিকারও ব্যয়বহুল হয়ে ওঠে। যান্ত্রিকীকরণ ও রপ্তানিমুখী কৃষি উৎপাদন বাড়িয়েছে ঠিকই, কিন্তু বয়স্ক ক্ষুদ্র কৃষক, গ্রামীণ ঋণের চাপ এবং পরিবেশগত ক্ষতির মতো সমস্যাও তৈরি হয়েছে। সেগুলো মোকাবিলায় এখন দেশটিকে ব্যয়বহুল সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নিতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের একটি সুবিধা হলো, এখনো সময় আছে শুরু থেকেই সঠিক নীতি ও প্রযুক্তি বেছে নেওয়ার। নির্ভুল কৃষি ব্যবস্থাপনা, সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা এবং ডিজিটাল পরামর্শসেবা পরিবেশের ওপর চাপ কমিয়ে ফলন বাড়াতে পারে, যদি কৃষি সম্প্রসারণসেবা এসব পদ্ধতি মাঠপর্যায়ে পৌঁছে দিতে পারে। লবণাক্ততা সহনশীল জাত থেকে পানি সাশ্রয়ী সেচ পর্যন্ত জলবায়ু সহনশীল পদ্ধতিগুলোকে নিয়মিত কৃষিচর্চায় পরিণত করতে হবে। কৃষিযন্ত্র ভাড়া কেন্দ্রের মাধ্যমে ছোট জমিতেও যান্ত্রিকীকরণের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব, যাতে বর্গাচাষিরা জমি থেকে উচ্ছেদের ঝুঁকিতে না পড়েন।
তবে প্রযুক্তির চারপাশে থাকা প্রতিষ্ঠান ও ব্যবস্থাগুলো ন্যায্য না হলে এসব উদ্যোগ দীর্ঘস্থায়ী হবে না। সমবায়, সাশ্রয়ী ঋণ ও শস্যবিমা, বিশেষ করে নারী ও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য, নতুন পদ্ধতি গ্রহণের আর্থিক ঝুঁকি কমাতে পারে। বাস্তব গ্রামীণ উদ্যোগ ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত প্রশিক্ষণ তরুণদের কাছে কৃষিকে একটি গ্রহণযোগ্য ও সম্ভাবনাময় পেশা হিসেবে তুলে ধরবে।
শুরু থেকেই এসব উপাদানকে সমন্বিতভাবে গড়ে তোলা গেলে থাইল্যান্ডের মতো পরে ব্যয়বহুল সংস্কারের প্রয়োজন অনেকটাই এড়ানো সম্ভব হবে। বাংলাদেশ এমন এক কৃষিব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারবে, যা একই সঙ্গে উৎপাদনশীল, প্রতিকূলতা মোকাবিলায় সক্ষম এবং ন্যায্যতার ভিত্তিতে পরিচালিত।
তথ্যসূত্র:
Bangladesh’s Path to Sustainable Agricultural Transformation,” Oniket Bulletin, June 6, 2026.
Duangbootsee, U. (2018) Thailand’s Large-scale Farming Model: Problems and Concerns, FFTC-AP, https://ap.fftc.org.tw/article/1347
