দীনা মাহমুদ
ডিটেক বাংলাদেশ
সম্প্রতি রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বিল গেটস বলেছিলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমাজে যে পরিবর্তন আনতে যাচ্ছে, তার জন্য পৃথিবীর কোনো সরকারই সত্যিকার অর্থে প্রস্তুত নয়। তিনি কোনো একটি দেশকে আলাদাভাবে সমালোচনা করেননি। বরং এমন এক কাঠামোগত বাস্তবতার দিকে ইঙ্গিত করেছেন, যা এই প্রযুক্তির সঙ্গে কাজ করা বিশেষজ্ঞরা অনেক দিন ধরেই বলে আসছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সক্ষমতা যত দ্রুত এগিয়েছে, নীতিনির্ধারণ ততটা দ্রুত তার সঙ্গে তাল মেলাতে পারেনি।
এই ব্যবধান কেন গুরুত্বপূর্ণ, তা বোঝার জন্য বাংলাদেশ একটি গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ হতে পারে। কারণ বাংলাদেশ অন্যদের তুলনায় অস্বাভাবিকভাবে পিছিয়ে আছে এমন নয়। বরং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য সত্যিকারের প্রস্তুতি বলতে কেবল কাগজে ভালো নীতি তৈরি করা নয়, তার বাইরেও কত কিছু প্রয়োজন, বাংলাদেশ সেই বাস্তবতাই সামনে আনে। এই লেখার উদ্দেশ্য সেই আলোচনা শুরু করা।
বাংলাদেশ এখন কোথায় দাঁড়িয়ে
বাংলাদেশের স্বীকার করার মতো একটি ইতিবাচক দিক হলো, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে দেশটি একেবারে শূন্য থেকে শুরু করছে না। ২০২৬ থেকে ২০৩০ সাল পর্যন্ত সময়ের জন্য জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতি প্রণয়নের কাজ এগিয়েছে এবং জনমত গ্রহণের ধাপও পেরিয়েছে। প্রস্তাবিত নীতিতে ঝুঁকিভিত্তিক নিয়ন্ত্রণ কাঠামো, ব্যাপক নজরদারি ও সামাজিক স্কোরিংয়ের ওপর সীমাবদ্ধতা এবং ২০২৭ সালের মধ্যে একটি জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পৃথক নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব রয়েছে।
২০১৯ ও ২০২০ সালের আগের জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা কৌশলের তুলনায় এই উদ্যোগকে অগ্রগতি হিসেবেই দেখা যায়। আগের উদ্যোগে বিস্তৃত কর্মপরিকল্পনা ও রূপরেখা ছিল, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে তার প্রভাব খুব বেশি দেখা যায়নি। এই অভিজ্ঞতা গুরুত্বপূর্ণ। একজন প্রযুক্তিবিদ হিসেবে আমার কাছে এমন নীতিপত্রের প্রতি আস্থা কম, যেগুলো পড়তে চমৎকার শোনায় কিন্তু বাস্তবে কতটা কাজ করবে, তার স্পষ্ট ভিত্তি থাকে না। একটি কৌশল বা নীতিমালা লিখে ফেলাকে বাস্তব সক্ষমতা তৈরি করার সমান মনে করার প্রবণতা নিয়েও তাই যথেষ্ট সংশয় থাকা দরকার।
অক্সফোর্ড ইনসাইটসের সরকারি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রস্তুতি সূচকে বাংলাদেশ বর্তমানে ৭৫তম অবস্থানে রয়েছে। এই অবস্থান একদিকে কিছু প্রাতিষ্ঠানিক অগ্রগতির ইঙ্গিত দেয়, অন্যদিকে দেশের কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোকেও সামনে আনে। আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সাম্প্রতিক এক প্রস্তুতি মূল্যায়নে সমস্যাগুলো বেশ স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে। এর মধ্যে রয়েছে খণ্ডিত তথ্যব্যবস্থা, আধুনিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য প্রয়োজনীয় কম্পিউটিং হার্ডওয়্যারের ঘাটতি, সময়ের সঙ্গে তাল মেলাতে না পারা একাডেমিক পাঠ্যক্রম এবং শিক্ষা ব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা বিষয়ে প্রায় অনুপস্থিত প্রশিক্ষণ।
এসব কোনো বিমূর্ত নীতিগত দুর্বলতা নয়। এগুলোই সেই বাস্তব কারণ, যার ফলে একটি দেশের হাতে আকর্ষণীয় খসড়া আইন থাকলেও দেশটি পুরোপুরি প্রস্তুত হয়ে উঠতে পারে না। বিশেষ করে যখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা মানুষের চাকরি, স্বাস্থ্যসেবা কিংবা সরকারি সেবা পাওয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ক্রমেই প্রভাব ফেলতে শুরু করবে।
প্রযুক্তিগত ঘাটতির আড়ালে যে মানবিক ঝুঁকি
এখানেই আলোচনার দৃষ্টিভঙ্গি অবকাঠামোর হিসাব থেকে মানুষের মূল্য ও অধিকার রক্ষার প্রশ্নে নিয়ে আসা প্রয়োজন। বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম বড় স্বাধীন ডিজিটাল কর্মশক্তি গড়ে তুলেছে। কয়েক লাখ মানুষ ডিজিটাল ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবার মাধ্যমে বৈদেশিক আয় করছেন। ফলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রস্তুতিতে প্রতিটি ঘাটতি সরাসরি এই কর্মশক্তি এবং সাধারণ মানুষের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
কম্পিউটিং সক্ষমতার ঘাটতি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিকতা বিষয়ে শিক্ষার অভাব কিংবা খণ্ডিত তথ্য সুরক্ষা কাঠামো, সবকিছুর প্রভাব পড়তে পারে ব্যাংকিং, স্বাস্থ্যসেবা ও সরকারি সেবার মতো ক্ষেত্রগুলোতে। মানুষ যখন ক্রমেই স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ করবে, তখন তাদের অধিকার রক্ষা এবং ভুল সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে প্রতিকার পাওয়ার সুযোগও নিশ্চিত করতে হবে।
মানবকেন্দ্রিক উদ্ভাবনের কথা নীতিপত্রে যত সুন্দরভাবেই লেখা থাকুক, বাস্তবায়ন যদি সেই উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে তাল না মেলায়, তাহলে সবচেয়ে ঝুঁকিতে পড়বেন ডিজিটাল কর্মী, নিম্নআয়ের মানুষ এবং গ্রামীণ জনগোষ্ঠী। আগের উদ্যোগের অভিজ্ঞতা আমাদের সেই সতর্কতাই দেয়।
সামাজিক সম্প্রীতি অনেকটাই নির্ভর করে মানুষের এই বিশ্বাসের ওপর যে নতুন প্রযুক্তি নীরবে বৈষম্য বাড়াবে না কিংবা কোনো পূর্বপরিকল্পনা ছাড়াই তাদের জীবিকা কেড়ে নেবে না। এই আস্থা শ্বেতপত্র বা নীতিপত্র দিয়ে অর্জন করা যায় না। দৃশ্যমান এবং কার্যকর সুরক্ষা ব্যবস্থার মাধ্যমেই সেই আস্থা তৈরি করতে হয়।
মানুষের কথা মাথায় রেখে ঘাটতি পূরণ
এখনই তিনটি বিষয়ে বাস্তব পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। এর কোনোটিই অসম্ভব বা অতিরিক্ত জটিল নয়। প্রথমত, কম্পিউটিং অবকাঠামোকে আর শুধু নীতিপত্রের আকাঙ্ক্ষা হিসেবে রাখলে চলবে না। জাতীয় পর্যায়ে যৌথ কম্পিউটিং সক্ষমতা তৈরির জন্য নির্দিষ্ট ক্রয় পরিকল্পনা, সময়সীমা এবং বাজেট বরাদ্দ থাকতে হবে। শুধু উদ্যোগ নেওয়ার কথা বললে হবে না, তার বাস্তবায়নের পথও স্পষ্ট করতে হবে।
দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ে নৈতিকতা ও প্রযুক্তি সচেতনতা এখনই শিক্ষাব্যবস্থায় যুক্ত করতে হবে। জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা আইন পাস হওয়ার পর এসব নিয়ে ভাবার সময় নেই। যে কর্মশক্তি ভবিষ্যতে এই প্রযুক্তি তৈরি, পরিচালনা, মূল্যায়ন ও নিরীক্ষা করবে, তাদের শিক্ষা এখনই চলছে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সরকারি সেবায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার শুরু হলে শুরু থেকেই মানুষের কাছে আপিল বা অভিযোগ জানানোর সুযোগ রাখতে হবে। স্বাস্থ্যতথ্য ব্যবস্থাপনা থেকে শুরু করে সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির অর্থ বিতরণ, যেখানেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহৃত হবে, সেখানে কোনো নাগরিক যেন ভুল সিদ্ধান্তের মুখে পড়ে কেবল একটি অ্যালগরিদমের সঙ্গে লড়াই করতে বাধ্য না হন। প্রয়োজনে একজন প্রকৃত মানুষের কাছে পৌঁছানোর ব্যবস্থা অবশ্যই থাকতে হবে।
এসব ভবিষ্যতের জন্য রেখে দেওয়ার বিষয় নয়। বরং এগুলোই সেই ভিত্তি, যার ওপর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নীতির বাকি অংশ কার্যকর হবে কি না, তা নির্ভর করছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার আগমনকে গেটস একটি দুর্যোগনির্ভর চলচ্চিত্রের সঙ্গে তুলনা করেছেন, যেখানে মানবজাতিকে একটি অচেনা ও শক্তিশালী সত্তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে হয়। তুলনাটি নাটকীয়, কিন্তু এর মধ্যে একটি বাস্তব সত্য রয়েছে। প্রস্তুতি কোনো আলমারিতে পড়ে থাকা নীতিপত্রের নাম নয়। প্রস্তুতি হলো সমন্বিত, অর্থায়িত এবং নিয়মিতভাবে পরীক্ষিত সক্ষমতা।
২০১৯ সালের তুলনায় বাংলাদেশ এবার নিঃসন্দেহে আরও শক্তিশালী একটি নীতিগত কাঠামো তৈরি করেছে। এখন মূল প্রশ্ন হলো, সেই নীতিকে বাস্তব কাজে রূপ দেওয়ার সক্ষমতা কতটা তৈরি করা যায়। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বৈষম্য কমাতে এবং দেশের মানুষের সুযোগ বাড়াতে যে সম্ভাবনা তৈরি করেছে, তা বাস্তবে কাজে লাগানো সম্ভব হবে কি না, শেষ পর্যন্ত তার উত্তর নির্ভর করবে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রস্তুতি, বাস্তবায়ন সক্ষমতা এবং সাধারণ মানুষের অধিকার সুরক্ষার ওপর।
