বিবেক চৌহান
কলাম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, যুক্তরাষ্ট্র
চলতি মাসে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী সরকারপ্রধান হিসেবে প্রথম ভাষণ দিয়েছেন। তবে এই গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাকে ছাপিয়ে আলোচনায় এসেছে একটি অনুপস্থিতি। বিপুল জনসমর্থন নিয়ে তাঁর দলের ক্ষমতায় ফেরার পর দীর্ঘ প্রতীক্ষিত ভারত সফরটি বছরজুড়েও বাস্তবায়িত হয়নি। নভেম্বরে দুই দেশের মধ্যে আলোচনা আবার শুরু হতে পারে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে, যদিও সফরের কোনো তারিখ এখনও চূড়ান্ত হয়নি। এই বিলম্বের পেছনে রয়েছে একটি অমীমাংসিত প্রশ্ন: নির্বাসিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভবিষ্যৎ। ঢাকার সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতির পূর্বশর্ত হিসেবে তাঁর প্রত্যর্পণের বিষয়টি নীরবে সামনে এনেছে বাংলাদেশ। এই অচলাবস্থায় ভারতের অবস্থান এবং এর দীর্ঘসূত্রতার কারণে দুই দেশের অর্থনীতিকে যে মূল্য দিতে হচ্ছে, সেই চিত্রই তুলে ধরেছে এই নিবন্ধ।
দিল্লির দোটানা
ভারতের অবস্থানের পেছনে যুক্তি রয়েছে, যদিও সেই যুক্তির ভিত্তিতে নেওয়া সিদ্ধান্তকে সমর্থন করা কঠিন। দিল্লির অনীহার প্রথম কারণ দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক আনুগত্য। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকারের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক ছিল দীর্ঘদিনের ও সহযোগিতাপূর্ণ। ব্যক্তিগত ইতিহাসও সেই সম্পর্ককে প্রভাবিত করেছে। ১৯৭৫ সালে পরিবারের সদস্যদের হত্যাকাণ্ডের পর শেখ হাসিনা ভারতে আশ্রয় পেয়েছিলেন। ভারতের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ক্ষেত্রে সেই অতীতের একটি বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে।
তবে ভারতের এই আনুগত্য কেবল আবেগের বিষয় ছিল না। শেখ হাসিনার শাসনামলে ভারত কৌশলগতভাবেও লাভবান হয়েছে। সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করা, উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সন্ত্রাসবাদ দমনে সহযোগিতা এবং এই অঞ্চলের অন্য দেশগুলোতে ভারতবিরোধী মনোভাব বাড়তে থাকলেও বাংলাদেশের মতো একটি সহযোগিতাপূর্ণ প্রতিবেশীকে পাশে পাওয়া, সব মিলিয়ে ঢাকার সঙ্গে সুসম্পর্ক ভারতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
ব্যক্তিগত সম্পর্ক ও কৌশলগত স্বার্থের এই দুই দিকই ভারতের আইনি অবস্থানকে প্রভাবিত করছে। ভারতীয় কর্মকর্তারা শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলোকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উল্লেখ করেছেন। প্রত্যর্পণ প্রত্যাখ্যানের যুক্তি হিসেবে ভারত ও বাংলাদেশের প্রত্যর্পণ চুক্তির ৬ ও ৭ নম্বর অনুচ্ছেদের কথা বলা হচ্ছে। এসব অনুচ্ছেদে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে বিচারপ্রক্রিয়া ব্যবহারের আশঙ্কা এবং ন্যায়বিচারের স্বার্থের মতো বিষয় বিবেচনার সুযোগ রয়েছে।
অপেক্ষার মূল্য: ঢাকার অর্থনীতি
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির দিকে তাকানো যাক। পরিসংখ্যান প্রধানমন্ত্রীর লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে। প্রায় ৪৫১ বিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ইতিমধ্যে মন্থর হয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে প্রবৃদ্ধি ৩.৫ শতাংশে নেমে আসতে পারে। রাজস্ব খাতে চাপ ও ব্যাংকিং খাতের সমস্যার কারণে আগামী কয়েক বছর প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশেরও নিচে থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
২০৩৪ সালের মধ্যে অর্থনীতির আকার এক ট্রিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হলে ডলারের হিসাবে প্রতি বছর প্রায় ১০ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে হবে। বাংলাদেশের জন্য তা বড় চ্যালেঞ্জ। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দেশটি ধারাবাহিকভাবে এমন প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের আসন্ন উত্তরণ। আগামী নভেম্বরে এই উত্তরণ ঘটার কথা রয়েছে। ফলে প্রবৃদ্ধি যখন কমছে এবং বিনিয়োগকারীরা যখন সতর্ক, তখনই বাংলাদেশকে বাণিজ্যসুবিধার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হারানোর ঝুঁকি মোকাবিলা করতে হবে।
এসব বিবেচনায় এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য অসম্ভব নয়, তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে তা বাস্তবসম্মত বলে মনে হয় না। এই লক্ষ্য অর্জনে শুধু দেশের অভ্যন্তরীণ সংস্কার যথেষ্ট হবে না, ভারতের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করাও জরুরি।
আঞ্চলিক উত্তেজনাকে বিনিয়োগকারীরা ঝুঁকি হিসেবে দেখেন। বাংলাদেশের বৃহত্তম প্রতিবেশীর সঙ্গে প্রত্যর্পণ নিয়ে অমীমাংসিত বিরোধ সেই ঝুঁকি আরও বাড়াচ্ছে। ফলে ঋণ সংগ্রহ ও বিনিয়োগ আকর্ষণ করা বাংলাদেশের জন্য আরও ব্যয়বহুল হয়ে উঠতে পারে, এমন এক সময়ে যখন অর্থনীতির জন্য নতুন বিনিয়োগ অত্যন্ত জরুরি।
দিল্লির সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটলেই বাংলাদেশ ২০৩৪ সালের মধ্যে এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে পৌঁছে যাবে, এমন নয়। তবে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে সরকারের উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য এবং অর্থনীতির বাস্তব গতিপথের মধ্যকার ব্যবধান কিছুটা কমানো সম্ভব। সম্পর্কের দূরত্ব যত দীর্ঘ হবে, সেই ব্যবধানও তত বাড়তে পারে।
স্বস্তির মূল্য: দিল্লির হিসাব
এবার ভারতের অর্থনৈতিক দিকটি দেখা যাক। পরিসংখ্যানের হিসাবে দুই দেশের বর্তমান অচলাবস্থার প্রভাব ভারতের ওপর খুব বেশি নয়। বছরভেদে বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতের মোট বাণিজ্যের পরিমাণ প্রায় ১০ থেকে ১৩ বিলিয়ন ডলার। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ভারতের মোট বাণিজ্য ১.৭৪ ট্রিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে বাণিজ্যের অংশ দাঁড়ায় এক শতাংশেরও কম। বাংলাদেশে ভারতের প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগও তুলনামূলকভাবে সামান্য, যার পরিমাণ আনুমানিক ৮৭ থেকে ১০৫ মিলিয়ন ডলার। ভারতের সামগ্রিক অর্থনীতির তুলনায় এই অঙ্ক নগণ্য।
এই সীমিত অর্থনৈতিক প্রভাবের কারণে ভারত আপাতত অপেক্ষা করার সুযোগ পাচ্ছে। অর্থনৈতিক শক্তির বিচারে পাল্লা দিল্লির দিকেই ভারী, আর ভারত তা ভালোভাবেই জানে।
কিন্তু পরিসংখ্যানের আড়ালে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় রয়েছে। ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি, বরং অন্য দেশের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য বাড়লেও ভারত-বাংলাদেশ বাণিজ্যের প্রবৃদ্ধি থমকে গেছে। ২০২৬ সালে দীর্ঘ ১৬ বছরের মধ্যে প্রথমবারের মতো বাংলাদেশের বাণিজ্য অংশীদারদের তালিকায় ভারত তৃতীয় স্থানে নেমে এসেছে। চীন ও যুক্তরাষ্ট্র ভারতের আগে চলে গেছে।
এর অর্থ এই নয় যে ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের বাণিজ্য হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে গেছে। বরং বাংলাদেশ দেখেছে, বিকল্প অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বাড়িয়ে চলা সম্ভব, এমনকি কিছু ক্ষেত্রে তা লাভজনকও হতে পারে। ভারতীয় পণ্যের বিরুদ্ধে ভোক্তাদের বর্জন, চীনের প্রতিযোগিতামূলক দাম এবং বাংলাদেশের ভারতীয় সুতা আমদানিতে বিধিনিষেধ আরোপের পর কলকাতা হয়ে পণ্য পরিবহনে ভারত যে ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা প্রত্যাহার করেছে, এসব ঘটনাও বাণিজ্যিক সম্পর্কে প্রভাব ফেলেছে।
স্বল্পমেয়াদে বিকল্প বাজারের দিকে ঝোঁকা বাংলাদেশের জন্য কার্যকর হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এই পথ কতটা লাভজনক, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভৌগোলিকভাবে নিকটবর্তী ও নির্ভরযোগ্য প্রতিবেশী ভারতকে পাশ কাটিয়ে চীনের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়া কোনো পক্ষের জন্যই টেকসই কৌশল নয়।
আমার দৃষ্টিতে, বাণিজ্যের পরিসংখ্যানে ধরা পড়ে না এমন একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ হারাচ্ছে ভারত: বাংলাদেশের আস্থা এবং এই অঞ্চলে নিজের গ্রহণযোগ্যতা। বাংলাদেশের গুরুত্ব ভারতের কাছে কেবল আরেকটি বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে নয়। দুই দেশের অভিন্ন সীমান্ত, নদীব্যবস্থা এবং কয়েক দশকের নিরাপত্তা সহযোগিতা তাদের সম্পর্ককে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। শেখ হাসিনার সরকারের আমলে এই সহযোগিতা বিশেষভাবে দৃঢ় হয়েছিল।
ভারত যদি শেখ হাসিনাকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রশ্নে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ককে ঝুঁকির মুখে ফেলে, তবে ঢাকা আরও বেশি করে চীনের দিকে ঝুঁকতে পারে। অথচ দক্ষিণ এশিয়ায় চীনের প্রভাব সীমিত রাখতে ভারত কয়েক দশক ধরেই চেষ্টা করে আসছে। একজন পুরোনো মিত্রকে রক্ষা করার রাজনৈতিক মূল্য হয়তো আজ ভারতের কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছে, কিন্তু তার বিনিময়ে আগামী দিনে আরও গুরুত্বপূর্ণ এক প্রতিবেশীকে হারানোর ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। আমার মতে, শেখ হাসিনাকে বিচারের মুখোমুখি হতে দেওয়ার রাজনৈতিক মূল্য বাংলাদেশের সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখার কৌশলগত মূল্যকে ছাড়িয়ে যাওয়া উচিত নয়।
অনিশ্চয়তার অদ্ভুত চিত্র
সব দিক বিবেচনায় পরিস্থিতি অসম হলেও পুরোপুরি স্থবির নয়। আমার মতে, বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের প্রশ্নে ভারতের বর্তমান সতর্কতা দূরদর্শী নয়। একজন ব্যক্তিকে রক্ষা করার চেয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি সম্পর্ক বজায় রাখা ভারতের জন্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
এই মুহূর্তে ভারত সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছে। বাণিজ্যের পরিসংখ্যান তার পক্ষে, তাই আলোচনায় প্রথম পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদও কম। কিন্তু এই স্বস্তি চিরস্থায়ী হবে না। অচলাবস্থার প্রতিটি মাস বাংলাদেশকে চীনের আরও কাছে ঠেলে দিচ্ছে এবং দুই দেশের মধ্যে বছরের পর বছর ধরে গড়ে ওঠা আস্থা ক্ষয় করছে।
এই টানাপোড়েনে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে, তবে বাংলাদেশের ক্ষতি অনেক বেশি। প্রবৃদ্ধি কমছে, বিনিয়োগকারীরা সতর্ক থাকছেন, আর এক ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতির লক্ষ্য ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। ভারতের ক্ষতি তুলনামূলকভাবে কম হলেও তা উপেক্ষা করার মতো নয়। বাণিজ্যের সুযোগ কমছে, নিজের প্রতিবেশী অঞ্চলে প্রভাবও দুর্বল হচ্ছে।
দাবার এই বোর্ডে একসময় কাউকে না কাউকে প্রথম চাল দিতেই হবে। আপাতত দুই পক্ষই আগে নিজেদের অবস্থান প্রকাশ করতে চাইছে না। ফলে পুরো অঞ্চল আবারও এমন এক সমাধানের অপেক্ষায় রয়েছে, যা বারবার প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেও শেষ পর্যন্ত অধরাই থেকে যাচ্ছে।
তথ্যসূত্র
1. Between New York and New Delhi, Bangladesh Waits for Its Own Answers. Selim, . s.l. : The Oniket Bulletin, 2026. https://bulletin.oniket.org/chief_editor/between-new-york-and-new-delhi-bangladesh-waits-for-its-own-answers/.
2. Why India likely won’t return Hasina to face Bangladesh death penalty. Sharma, . s.l. : Al Jazeera, 2025. https://www.aljazeera.com/features/2025/11/18/why-india-likely-wont-return-hasina-to-face-bangladesh-death-penalty.
3. Why India Welcomes Sheikh Hasina’s Return to Power in Bangladesh. Pasricha, . s.l. : VOANews, 2024. https://www.voanews.com/a/why-india-welcomes-sheikh-hasina-s-return-to-power-in-bangladesh/7434039.html.
4. Treaty Between The Republic of India & People’s Republic of Bangladesh Relating to Extradition. Dhaka : s.n., 2013. https://www.mea.gov.in/Portal/LegalTreatiesDoc/BG13B1143.pdf.
5. US Becomes Bangladesh’s Second-Biggest Trading Partner, Pushing India To Third. Brij,. s.l. : Swarajyamag, 2026. https://swarajyamag.com/news-brief/us-becomes-bangladeshs-second-biggest-trading-partner-pushing-india-to-third.
6. The World Bank Group. World Bank Open Data. [Online] https://data.worldbank.org.
