ফারাহ জেহির
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
গত মঙ্গলবার, ১৩ অক্টোবর বগুড়ার পল্লী উন্নয়ন একাডেমীতে ৪৯তম বিসিএস সাধারণ শিক্ষা ক্যাডারের কর্মকর্তাদের ওরিয়েন্টেশন কোর্সের উদ্বোধন শেষে শিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহসানুল হক মিলন এসএসসিতে ফেল করা শিক্ষার্থীদের বিষয়ে নতুন একটি পরিকল্পনার কথা জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, সর্বোচ্চ দুই বিষয়ে অকৃতকার্য শিক্ষার্থীরা ফল প্রকাশের ১৫ দিনের মধ্যে আবার পরীক্ষায় বসবে। এরপরও যারা পাস করতে পারবে না, তাদের কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নিয়ে যাওয়া হবে। মন্ত্রী বলেন, বছরের পর বছর ফেল করার ধারা চলতে দেওয়া যাবে না, আর যারা পাস করেছে তাদের পাশাপাশি ঝরে পড়া শিক্ষার্থীদের কথাও ভাবতে হবে।
পুনঃপরীক্ষার জন্য এক বছর অপেক্ষার দীর্ঘ সময় কমিয়ে আনার উদ্যোগ সমর্থনযোগ্য। তবে পরিকল্পনার দ্বিতীয় অংশটি আরও খতিয়ে দেখা দরকার।
বৈশ্বিক কাঠামো কী বলে
ইউনেসকো ও টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষা ও প্রশিক্ষণকে (টিভেট) মানসম্মত শিক্ষারই অংশ হিসেবে দেখে, নিচু মানের আলাদা কোনো ধারা হিসেবে নয়। এসডিজি ৪-এর তিনটি লক্ষ্যমাত্রায় এর উল্লেখ আছে। লক্ষ্যমাত্রা ৪.৩ সাশ্রয়ী ও মানসম্মত কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও উচ্চশিক্ষায় সবার জন্য সমান সুযোগের অঙ্গীকার করে। লক্ষ্যমাত্রা ৪.৪-এর উদ্দেশ্য কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতাসম্পন্ন তরুণ ও প্রাপ্তবয়স্কের সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো। লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫ বৈষম্য দূর করা এবং প্রতিবন্ধী ব্যক্তিসহ সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠীর জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা বলে। এসডিজি ৮ এর সঙ্গে যোগ করেছে শোভন কাজ ও তরুণদের কর্মসংস্থানের সংযোগ।
ইউনেসকোর ২০২২ থেকে ২০২৯ মেয়াদের টিভেট কৌশল এর ওপরই দাঁড়িয়ে আছে। কৌশলটিতে অন্তর্ভুক্তি, সবুজ ও ডিজিটাল রূপান্তর এবং কর্মসংস্থানযোগ্যতার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থীর অগ্রগতির পথ নিয়ে ইউনেসকোর নির্দেশনায় দেশগুলোকে বলা হয়েছে, বৃত্তিমূলক ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে যাতায়াতের পথ খোলা রাখতে হবে, যাতে একজন শিক্ষার্থী এক ধারা থেকে অন্য ধারায় যেতে পারে এবং অর্জিত ক্রেডিট সঙ্গে নিতে পারে। পুরো কাঠামোর মূল কথা হলো শিক্ষার্থীর নিজের পছন্দ এবং আজীবন শেখার সুযোগ। পরীক্ষার ফল দিয়ে শিশুদের আলাদা করে দেওয়া এর লক্ষ্য নয়।
বর্তমান প্রস্তাবের ফাঁক
মন্ত্রীর বক্তব্য অনুযায়ী, দুবার এসএসসিতে ফেল করলে শিক্ষার্থীকে বৃত্তিমূলক ধারায় পাঠানো হবে। এখানেই নীতিটি বৈশ্বিক কাঠামো থেকে সরে যায়।
প্রথমত, এতে বৃত্তিমূলক শিক্ষা ফেল করাদের গন্তব্যে পরিণত হয়। কারিগরি শিক্ষার সামাজিক মর্যাদা নিয়ে বাংলাদেশে আগে থেকেই সমস্যা আছে। ব্যর্থতার কারণে বদলি এই অবস্থা আরও গভীর করবে। শিক্ষার্থীদের গায়ে “ফেল করে সরে যাওয়া” ছাপ পড়তে পারে, যা ডেকে আনে উপহাস, লজ্জা ও আত্মবিশ্বাসের ঘাটতি। অথচ এই বয়সে আত্মবিশ্বাস ও সম্মান দুটিই খুব জরুরি।
দ্বিতীয়ত, এতে শিক্ষার্থীর স্বপ্নকে উপেক্ষা করা হয়। এদের অনেকেই কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে চায়। পরীক্ষার ফলের জোরে চাপিয়ে দেওয়া বদলি তাদের সেই সুযোগ কেড়ে নেয় এমন সময়ে, যখন তারা সবচেয়ে বেশি অরক্ষিত।
তৃতীয়ত, পুনঃপরীক্ষার স্বল্প সময় কাজে আসবে তখনই, যখন এর পেছনের ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে। ফেল করার ধাক্কা সামলাতে যে শিক্ষার্থীর সময় লাগছে, তার জন্য পনেরো দিন খুব কম। ওই সময়ে পাঠদান ও সহায়তার মানের ওপরই ফলাফল নির্ভর করবে।
চতুর্থত, এক বা দুই বিষয়ে ফেল করা একজন শিশুর মেধা ও সম্ভাবনার সামান্যই বোঝায়। মন্ত্রী নিজেই বলেছেন, এক নম্বরের জন্য পাস ও ফেলের মধ্যে কতটা পার্থক্য, তা তিনি জানেন না। এমন সামান্য ব্যবধানের ভিত্তিতে একটি শিশুকে ভিন্ন জীবনপথে পাঠিয়ে দেওয়ার নীতি দুর্বল ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়।
কীভাবে গড়ে তোলা উচিত
বৃত্তিমূলক শিক্ষায় যাওয়াকে স্বেচ্ছাধীন করা: পুনঃপরীক্ষায় অকৃতকার্য হলে শিক্ষার্থীকে একাধিক বিকল্প দিতে হবে: ওই বিষয়গুলো আবার পড়া, কারিগরি ধারায় ভর্তি হওয়া, কিংবা সেতুবন্ধ কর্মসূচিতে যোগ দেওয়া। সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষার্থী ও তার পরিবার, পরামর্শদাতার সহায়তায়।
আগে থেকেই পছন্দের সুযোগ তৈরি করা: নিম্ন মাধ্যমিক স্তর থেকেই ব্যবহারিক বিষয় চেনার সুযোগ দেওয়া এবং অষ্টম শ্রেণির শেষে ক্যারিয়ার পরামর্শের ব্যবস্থা করা উত্তম পথ। তাহলে কারিগরি কাজে যাদের দক্ষতা, তারা আগ্রহ নিয়েই সে পথে আসবে। ইউনেসকোর আদর্শও তা-ই, আর সামাজিক কলঙ্ক ঠেকানোর সেরা উপায়ও এটাই।
চলাচলের পথ খোলা রাখা: বাংলাদেশে জাতীয় কারিগরি ও বৃত্তিমূলক যোগ্যতা কাঠামো এবং জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন নীতি রয়েছে। এগুলোর আওতায় ক্রেডিট স্থানান্তরের নিশ্চয়তা থাকা চাই, যাতে বৃত্তিমূলক সনদ থেকে ডিপ্লোমা, তারপর ডিগ্রিতে যাওয়া যায় এবং আগ্রহ বদলালে সাধারণ শিক্ষায় ফেরা যায়। নইলে বৃত্তিমূলক ধারা এক অন্ধগলিতে পরিণত হবে, ইউনেসকো ঠিক এই বিপদের কথাই বলে আসছে।
মান নিশ্চিত করতে বিনিয়োগ: বৃত্তিমূলক প্রতিষ্ঠানে প্রশিক্ষিত শিক্ষক, শিল্পের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মশালা, নিয়োগকর্তাদের সঙ্গে শিক্ষানবিশির ব্যবস্থা এবং কর্মসংস্থানের নির্ভরযোগ্য তথ্য দরকার। ভালো কাজের পথ চোখে দেখতে পেলে তবেই পরিবারগুলো এই ধারা বেছে নেবে। এতে এসডিজি ৮-এর লক্ষ্যও পূরণ হয়।
মর্যাদা রক্ষা করা: ভর্তির সময় নথিপত্রে বা সরকারি ভাষায় ব্যর্থতার কোনো তকমা থাকা চলবে না। স্কুল ও স্থানীয় প্রশাসনকে কারিগরি শিক্ষাকে নিজস্ব মূল্যের পথ হিসেবে তুলে ধরতে হবে, সঙ্গে থাকবে দক্ষ পেশাজীবীদের প্রকাশ্য স্বীকৃতি।
শিক্ষার্থীদের খোঁজ রাখা: ফেল করা শিক্ষার্থীরা কোথায় যায়, মন্ত্রীর এই প্রশ্ন যথার্থ। মন্ত্রণালয়ের উচিত পুনঃপরীক্ষার ফল, ঝরে পড়া এবং পরবর্তী গন্তব্যের তথ্য প্রতি বছর প্রকাশ করা, যেখানে লিঙ্গ, দারিদ্র্য ও প্রতিবন্ধিতার বিষয়ে আলাদা নজর থাকবে। লক্ষ্যমাত্রা ৪.৫ এ-ই দাবি করে।
ন্যায্য পথের সন্ধানে
পুনঃপরীক্ষার প্রস্তাব অপচয় হওয়া বছরের সংখ্যা কমাতে পারে, আর শক্তিশালী কারিগরি খাত দেশের প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা নিজেরা চাইলে কারিগরি শিক্ষায় এলে দুটি লক্ষ্যই ভালোভাবে পূরণ হয়। দুই বিষয়ে ফেল করা একটি শিশু জীবনে ব্যর্থ হয়নি, ব্যবস্থার উচিত তাকে সে কথা না বোঝানো।
মানবিক ও অর্থনৈতিকভাবে বিচক্ষণ সংস্কার কেমন হতে পারে, বাংলাদেশের সামনে তা দেখানোর সুযোগ আছে। বৃত্তিমূলক শিক্ষা যদি খোলা দরজাসহ একটি সম্মানজনক পছন্দ হয়ে ওঠে, তাহলে প্রতিভাবানরা সেখানে আসবে। আর যদি তা পাস করতে না পারাদের আশ্রয় হয়েই থাকে, তাহলে আজকের কলঙ্ক সঙ্গে নিয়েই চলতে হবে।
তথ্যসূত্র:
https://www.google.com/url?sa=t&source=web&rct=j&url=https://www.youtube.com/watch%3Fv%
3Ds5mb7MxMt0Y&ved=0ahUKEwjps_3i38qXAxWp3wIHHf
WtBhQQz40FCAQ&opi=89978449&usg=AOvVaw1Z3Vbo_Z6m-xo0z1cTtqHi
