মিনহাজ-উস-সালেকীন ফাহমী
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় জাপানের মতো নীরব অথচ ধারাবাহিক অবদান রাখা অংশীদার খুব বেশি নেই। দীর্ঘদিন ধরে দেশটির অন্যতম বৃহৎ উন্নয়ন সহযোগী হিসেবে জাপান বাংলাদেশের অর্থনীতির ভৌত অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়ন করেছে। সড়ক, বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকা মেট্রোরেল থেকে মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর, নানা গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পে রয়েছে জাপানের সহযোগিতা। এখন সেই সম্পর্কের পরিধি বদলাচ্ছে। কংক্রিটের অবকাঠামো থেকে সহযোগিতা বিস্তৃত হচ্ছে ডিজিটাল ব্যবস্থাপনার দিকে। ২০২৬ সালের পরবর্তী অর্থনৈতিক বাস্তবতায় প্রবেশের প্রস্তুতি নেওয়ার সময় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ অর্থনীতির ভিত গড়ে দেবে সফটওয়্যার প্রকৌশল, ডিজিটাল সরকারি অবকাঠামো এবং সাইবার নিরাপত্তাব্যবস্থার মতো ক্ষেত্রগুলোতে জাপানের সহায়তা।
ভিত্তি: প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা ও পারস্পরিক প্রয়োজন
দীর্ঘদিনের অবকাঠামো অর্থায়ন ও কারিগরি সহযোগিতার মধ্য দিয়ে দুই দেশের মধ্যে যে প্রাতিষ্ঠানিক আস্থা গড়ে উঠেছে, তার ওপরই দাঁড়িয়ে আছে ডিজিটাল খাতে সহযোগিতার নতুন পর্ব। জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) স্মার্ট বাংলাদেশ আইসিটি ২০৪১ মহাপরিকল্পনা প্রণয়নে সহায়তা করেছে। জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি গড়ে তোলার জাতীয় লক্ষ্যকে বাস্তব কর্মপরিকল্পনায় রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে এই উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি খাতে দুই দেশের সমঝোতা স্মারক সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করেছে। এতে ছয়টি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে: মানবসম্পদ উন্নয়ন, উদ্ভাবন ও গবেষণা, ডিজিটাল সাক্ষরতা, ডিজিটাল অর্থনীতি, সাইবার নিরাপত্তা এবং চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রযুক্তি।
এই সহযোগিতায় সবচেয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতি এসেছে দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির ক্ষেত্রে। জাইকা, বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিল (বিসিসি) এবং বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব সফটওয়্যার অ্যান্ড ইনফরমেশন সার্ভিসেসের (বেসিস) যৌথ উদ্যোগে পরিচালিত বি-টপএসই কর্মসূচির আওতায় মধ্যপর্যায়ের বাংলাদেশি পেশাজীবীদের উন্নত সফটওয়্যার প্রকৌশল প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। লক্ষ্য হলো এমন দক্ষ সিস্টেম আর্কিটেক্ট তৈরি করা, যাঁরা জটিল ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের নকশা প্রণয়ন ও পরিচালনা করতে পারবেন। বাংলাদেশের আউটসোর্সিং খাতে দীর্ঘদিন ধরে এই উচ্চপর্যায়ের দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে।
এই সহযোগিতির স্থায়িত্বের মূল কারণ দাতব্য সহায়তা নয়, বরং দুই দেশের পারস্পরিক প্রয়োজন। জাপানে তরুণ প্রকৌশলীর ঘাটতি বাড়ছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের কম্পিউটিং বিষয়ে স্নাতকদের একটি অংশ দেশে উপযুক্ত কর্মসংস্থান খুঁজে পাচ্ছেন না। এক দেশের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অন্য দেশের সম্ভাবনার সঙ্গে মিলে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
পরিবর্তনশীল রাজনৈতিক বাস্তবতায় ধারাবাহিকতা
বাংলাদেশের প্রযুক্তিগত সহযোগিতাকে রাজনীতি থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জাপান ছিল বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ উন্নয়ন অংশীদার। দুই দেশের নেতারাই প্রকাশ্যে এই সম্পর্ককে বন্ধুত্বের আদর্শ উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেছেন। ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তন সেই ঘনিষ্ঠতার জন্য নতুন পরীক্ষা তৈরি করে। তবে জাপানের রাষ্ট্রদূত অন্তর্বর্তী সরকারকে আশ্বস্ত করেন যে দুই দেশের বন্ধুত্ব অটুট রয়েছে। এ সময় প্রশিক্ষণ ও সক্ষমতা বৃদ্ধির কর্মসূচিও অব্যাহত থাকে। ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর দায়িত্ব নেওয়া নির্বাচিত সরকারও জাপানের সঙ্গে যোগাযোগ ও সহযোগিতা বজায় রেখেছে। মন্ত্রীপর্যায়ে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ নিয়ে আলোচনা চলেছে।
জাপানের কাজের ধরন বুঝতে পারলে এই ধারাবাহিকতার ব্যাখ্যা পাওয়া যায়। দেশটির সহযোগিতা সাধারণত দীর্ঘমেয়াদি, প্রকল্পভিত্তিক এবং রাজনৈতিক মতাদর্শের শর্তের তুলনায় বাস্তব উন্নয়ন লক্ষ্যের ওপর বেশি নির্ভরশীল। সহায়তার সঙ্গে রাজনৈতিক দাবি জুড়ে দেওয়া অংশীদারদের তুলনায় এই পদ্ধতি আলাদা। বাংলাদেশের জন্য এমন পূর্বানুমানযোগ্যতা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দীর্ঘমেয়াদি প্রযুক্তিগত প্রকল্পের সাফল্য নির্ভর করে নীতির ধারাবাহিকতা, দক্ষতা উন্নয়ন এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার ওপর।
বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে জাপান: কৌশলগত ভারসাম্যের সুযোগ
বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক বৃহৎ শক্তিগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রেখে এগোতে হয়। চীন দ্রুত অবকাঠামো নির্মাণ ও বড় অঙ্কের অর্থায়নের সুযোগ দেয়। ভারতের সঙ্গে রয়েছে ভৌগোলিক নৈকট্য, গভীর অর্থনৈতিক সম্পর্ক ও নিরাপত্তাসংক্রান্ত স্বার্থ। পশ্চিমা অংশীদারেরা বাজারে প্রবেশাধিকার, সুশাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেয়। এই প্রেক্ষাপটে জাপানের অবস্থান স্বতন্ত্র। বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে দেশটি এসব শক্তির সঙ্গে সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতায় না গিয়ে সহযোগিতার নিজস্ব পরিসর তৈরি করেছে। ফলে ডিজিটাল নেটওয়ার্ক, তথ্যব্যবস্থা ও সাইবার নিরাপত্তায় কোনো একটি দেশের প্রযুক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এড়াতে জাপানের সঙ্গে অংশীদারত্ব বাংলাদেশের জন্য কৌশলগত ভারসাম্য রক্ষার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
তবে এই ভারসাম্য বজায় রাখা সহজ হবে না। ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণের প্রক্রিয়া বাণিজ্যচুক্তি ও বাজারসুবিধা নিয়ে নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ৩০০টির বেশি জাপানি কোম্পানি কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এসব প্রতিষ্ঠানের জন্য স্থিতিশীল নীতিমালা, সহজ বিনিয়োগপ্রক্রিয়া এবং কার্যকর প্রশাসনিক ব্যবস্থা জরুরি। তাই সব বড় শক্তির সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য বজায় রাখার পাশাপাশি ঢাকাকে বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ গড়ে তোলা ও প্রয়োজনীয় সংস্কার এগিয়ে নিতে হবে।
বাস্তব সুফল পেতে প্রয়োজন নীতিগত সংস্কার
বাংলাদেশের জন্য এই অংশীদারত্বের সম্ভাব্য সুফল সুস্পষ্ট। দক্ষতা হস্তান্তরের মাধ্যমে সফটওয়্যার ও ডিজিটাল সেবা খাতের মান বাড়তে পারে, খুলতে পারে উচ্চমূল্যের রপ্তানি কাজের সুযোগ। বাণিজ্যের জন্য সমন্বিত একক সেবাব্যবস্থার মতো উদ্যোগ শুল্কায়ন ও ব্যবসায়িক কার্যক্রমকে দ্রুত এবং সহজ করতে পারে। সাইবার নিরাপত্তায় জাপানের অভিজ্ঞতা সরকারি ডিজিটাল সেবার সুরক্ষা জোরদার করতে সহায়ক হতে পারে। উৎপাদন ও প্রযুক্তি খাতে জাপানি বিনিয়োগ কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং উন্নত মাননিয়ন্ত্রণ ও কর্মপ্রক্রিয়ার চর্চা বিস্তারে ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি, জাপানে বাংলাদেশি প্রকৌশলীদের কাজের সুযোগ বাড়লে দেশে রেমিট্যান্স আসবে, তাঁদের আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা অর্জনের পথও প্রসারিত হবে। সেই অভিজ্ঞতা দেশে ফিরে কাজে লাগানোর সুযোগ তৈরি করাও জরুরি।
এই সম্ভাবনাকে ব্যাপক ও দীর্ঘস্থায়ী সুফলে রূপ দিতে বাংলাদেশকে ছয়টি বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিগত পদক্ষেপ নিতে হবে।
উচ্চতর প্রযুক্তি শিক্ষাকে মূলধারায় আনা: জাপানের প্রশিক্ষণ কর্মসূচিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যক্রম ও জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কৌশলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। এতে সুবিধা কেবল অল্পসংখ্যক পেশাজীবীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না; বৃহত্তর শিক্ষার্থী ও কর্মজীবী জনগোষ্ঠীও উপকৃত হবে।
প্রকৌশলীদের আন্তর্জাতিক কর্মসংস্থানের কাঠামো গড়া: জাপানে বাংলাদেশি প্রকৌশলী পাঠানোর জন্য ভাষাশিক্ষা, স্বীকৃত যোগ্যতা ও পেশাগত মানদণ্ডসহ একটি সুস্পষ্ট ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। এতে জাপানের দক্ষ জনবলের চাহিদা এবং বাংলাদেশের কর্মসংস্থানের প্রয়োজনের মধ্যে কার্যকর সংযোগ স্থাপন করা সম্ভব হবে।
বিনিয়োগপ্রক্রিয়া সহজ করা: লাইসেন্স ও অনুমোদনপ্রক্রিয়া সংক্ষিপ্ত করতে হবে, চুক্তি বাস্তবায়নের নিশ্চয়তা বাড়াতে হবে এবং কর ও শুল্কনীতিতে পূর্বানুমানযোগ্যতা নিশ্চিত করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে এসব সংস্কার অপরিহার্য।
তথ্য সুরক্ষা ও সাইবার নিরাপত্তার আইন শক্তিশালী করা: ব্যক্তিগত তথ্য সুরক্ষা এবং সাইবার নিরাপত্তা বিষয়ে কার্যকর আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন করতে হবে। সংবেদনশীল তথ্য ব্যবস্থাপনায় দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠান এবং সরকারি সংস্থার আস্থা তৈরির জন্য নির্ভরযোগ্য আইনি কাঠামো প্রয়োজন।
প্রযুক্তি হস্তান্তরকে প্রকল্পের বাধ্যতামূলক শর্ত করা: প্রকল্পচুক্তিতে স্থানীয় প্রতিষ্ঠান ও বিশ্ববিদ্যালয়কে অংশীদার হিসেবে যুক্ত করতে হবে। প্রযুক্তি, জ্ঞান ও দক্ষতা হস্তান্তরের সুস্পষ্ট শর্ত থাকলে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও অর্জিত সক্ষমতা দেশে কাজে লাগানো যাবে।
ডিজিটাল সরকারি অবকাঠামোর সমন্বয় জোরদার করা: জাইকার প্রকল্প, বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের অগ্রাধিকার এবং বেসরকারি খাতের প্রয়োজনের মধ্যে সমন্বয় করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় সরকারি সংস্থাকে কার্যকর দায়িত্ব দিতে হবে। পাশাপাশি স্মার্ট বাংলাদেশ লক্ষ্যগুলোর বিপরীতে অগ্রগতির তথ্য নিয়মিত প্রকাশ করা প্রয়োজন, যাতে দুই দেশের সরকারই নিজেদের অঙ্গীকার বাস্তবায়নের অগ্রগতি যাচাই করতে পারে।
সামনের পথ
রাজনৈতিক পরিবর্তনের মধ্যেও বাংলাদেশ ও জাপানের অংশীদারত্ব টিকে আছে, কারণ এই সম্পর্ক দুই দেশের স্বার্থের সঙ্গে যুক্ত। তবে আগামী দিনের সাফল্য নির্ভর করবে বাংলাদেশ কতটা দক্ষতার সঙ্গে পারস্পরিক সদিচ্ছাকে প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার ও বাস্তব সক্ষমতায় রূপ দিতে পারে, তার ওপর।
বাংলাদেশ যদি প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করতে পারে, তাহলে জাপান কেবল উন্নয়ন সহায়তাদাতা হিসেবে নয়, বরং একটি প্রতিযোগিতামূলক, নিরাপদ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল অর্থনীতি গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি অংশীদার হিসেবেও ভূমিকা রাখতে পারবে। কংক্রিটের অবকাঠামো দেশের উন্নয়নের দৃশ্যমান ভিত্তি তৈরি করেছে। এখন সেই ভিত্তির ওপর জ্ঞান, প্রযুক্তি ও দক্ষতার এমন এক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ গড়ে তোলার পালা, যার সুফল দেশের অর্থনীতি ও মানুষের জীবনে দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলবে।
