অধ্যাপক ড. তানভীর ফিতিন আবির
ড্যাফোডিল বিশ্ববিদ্যালয়
চট্টগ্রাম বন্দরের নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্ব ডিপি ওয়ার্ল্ডের হাতে তুলে দিতে বাংলাদেশ ও প্রতিষ্ঠানটির মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তি দেশের বাণিজ্যিক সক্ষমতা বাড়াতে পারে। তবে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা মানেই কম পরিবহন ব্যয় কিংবা দেশীয় ব্যবসার উন্নতি নয়। অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে মূল প্রশ্ন হলো, পরিচালনগত দক্ষতা বৃদ্ধির সুফল রপ্তানিকারক, আমদানিকারক, শ্রমিক ও ভোক্তাদের কাছে পৌঁছাবে কি না, নাকি সেই সুফল টার্মিনালের আয়েই সীমাবদ্ধ থাকবে।
প্রথম আলোতে প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী, চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের মালিকানাধীন নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল ১৫ বছরের জন্য পরিচালনার অধিকার দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত প্রায় ৬০০ কোটি টাকা বিনিয়োগ করা হয়েছে এবং আগামী ১০ বছরে আধুনিকায়নের জন্য আরও এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে। চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার পরিবহনের প্রায় ৪৪ শতাংশ সম্পন্ন হয় এই টার্মিনালের মাধ্যমে। পরিসংখ্যানগুলো চুক্তিটির গুরুত্ব তুলে ধরে। তবে ঘোষিত বিনিয়োগ আর বাস্তবে সম্পন্ন বিনিয়োগ এক নয়। একইভাবে, প্রত্যাশিত সুফলের কথাও যথাযথ তথ্য দিয়ে প্রমাণ করতে হবে।
বাংলাদেশের রপ্তানিনির্ভর অর্থনীতিতে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার দক্ষতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ) সংকলিত ২০২৫–২৬ অর্থবছরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের পণ্য রপ্তানি থেকে আয় হয়েছে ৪৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার, যার মধ্যে তৈরি পোশাক খাতের অবদান ৩৮.৭ বিলিয়ন ডলার। অর্থাৎ, মোট পণ্য রপ্তানি আয়ের প্রায় ৮০.৬২ শতাংশ এসেছে তৈরি পোশাক থেকে (বিজিএমইএ, তথ্যসূত্রে প্রকাশের তারিখ উল্লেখ নেই)। উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় আমদানি করা উপকরণ এবং তৈরি পণ্য রপ্তানির ক্ষেত্রে যেকোনো বিঘ্ন অর্থনীতিতে প্রভাব ফেলে। আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে মূল্য, গুণমান ও বিধিবিধান মেনে চলার পাশাপাশি সময়মতো পণ্য সরবরাহের নিশ্চয়তাও জরুরি।
এই চুক্তির সবচেয়ে বড় সম্ভাব্য সুফল হতে পারে অনিশ্চয়তা কমানো। কারখানাগুলো যদি দ্রুত পণ্য খালাস করতে পারে, জাহাজ ও পণ্য পরিবহনের সময়সূচি আরও ভালোভাবে সমন্বয় করতে পারে এবং পণ্য চলাচলের তথ্য সহজে জানতে পারে, তাহলে বাড়তি মজুত ধরে রাখার প্রয়োজন কমতে পারে। পণ্য দ্রুত পৌঁছালে পাওনা আদায়ের প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত হতে পারে, ব্যবসার চলতি মূলধন কম সময়ের জন্য আটকে থাকবে এবং জরুরি পরিবহন ব্যয়ও কমতে পারে। ঋণ পাওয়ার সুযোগ সীমিত এমন ছোট ও মাঝারি ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের জন্য এসব সুবিধা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এগুলো চুক্তির সম্ভাব্য অর্থনৈতিক সুফল, এখনো প্রমাণিত ফলাফল নয়।
অতীতের তথ্য সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ ধারণা দেয়। বিশ্বব্যাংকের এক গবেষণায় বাংলাদেশের চামড়ার জুতা খাতে দেশীয় সরবরাহব্যবস্থার ব্যয় বিক্রয়মূল্যের ৪.৫ শতাংশ এবং উদ্যানতাত্ত্বিক পণ্যের ক্ষেত্রে ৪৭.৯ শতাংশ বলে অনুমান করা হয়েছিল। একই গবেষণায় চট্টগ্রাম বন্দরে রপ্তানি পণ্যের গড় কনটেইনার অবস্থানকাল চার দিন এবং আমদানি পণ্যের ক্ষেত্রে ১১ দিন উল্লেখ করা হয় (Herrera Dappe et al., 2020)। এসব পরিসংখ্যান পুরোনো। বর্তমান পরিস্থিতির পরিমাপ হিসেবে এগুলো ব্যবহার করা ঠিক হবে না। বরং তথ্যগুলো দেখায়, সরবরাহব্যবস্থার সংস্কার কেন জরুরি এবং পরিবর্তনের অগ্রগতি যাচাই করতে নতুন ভিত্তিমূলক তথ্য সংগ্রহ করা কেন প্রয়োজন।
তবে টার্মিনালের দক্ষতা বাড়ালেই পুরো সরবরাহব্যবস্থার সমস্যার সমাধান হবে না। পণ্য জাহাজ থেকে নামানোর পরও শুল্কায়ন ও খালাসের প্রক্রিয়া, পণ্য পরিদর্শন, সড়কের যানজট, বন্দরে যাতায়াতের পরিবহনব্যবস্থা এবং প্রয়োজনীয় নথিপত্রের কারণে বিলম্ব হতে পারে। আধুনিক ক্রেন দিয়ে দ্রুত পণ্য নামানো সম্ভব হলেও ধীরগতির শুল্ক প্রক্রিয়া কিংবা অনিশ্চিত ট্রাক চলাচল সেই সুবিধা নষ্ট করে দিতে পারে। তাই বাংলাদেশের বাণিজ্যপ্রক্রিয়ার প্রতিটি ধাপে সমন্বিত সংস্কার প্রয়োজন। অন্যথায়, নিউমুরিং টার্মিনালের ভেতরে দক্ষতা বাড়লেও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোর সামগ্রিক ব্যয় খুব সামান্যই কমতে পারে।
বিশ্বের সামুদ্রিক বাণিজ্য পরিস্থিতিও বিষয়টির গুরুত্ব তুলে ধরে। জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার (আঙ্কটাড) রিভিউ অব মেরিটাইম ট্রান্সপোর্ট ২০২৪ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক পণ্য বাণিজ্যের পরিমাণের ৮০ শতাংশের বেশি সমুদ্রপথে পরিবাহিত হয়। লোহিত সাগর, সুয়েজ খাল ও পানামা খালকেন্দ্রিক বিঘ্নের কারণে জাহাজের যাত্রাপথ দীর্ঘ হওয়া এবং পরিবহন ব্যয় বাড়ার বিষয়টিও প্রতিবেদনে উঠে এসেছে (UNCTAD, 2024)। উন্নত টার্মিনাল বাংলাদেশকে এমন বিঘ্ন মোকাবিলায় আরও সক্ষম করে তুলতে পারে। তবে আন্তর্জাতিক সংঘাত, ভূরাজনৈতিক ঝুঁকি কিংবা জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তের কারণে সৃষ্ট ভাড়া ও সময়ের অনিশ্চয়তা এককভাবে কোনো টার্মিনালের পক্ষে দূর করা সম্ভব নয়।
চুক্তির আর্থিক দিকটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। প্রথম আলোতে প্রকাশিত ব্যবসাবিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কনটেইনার হ্যান্ডলিং থেকে পাওয়া নির্দিষ্ট রাজস্বের ৬৭ শতাংশ বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছে থাকবে (প্রথম আলো, ২০২৬)। তবে রাজস্বের অংশ পাওয়ার বিষয়টি মুনাফা ভাগাভাগির সমান নয়। একইভাবে, রাজস্বের নির্দিষ্ট অংশ সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে থাকলেই জনস্বার্থ নিশ্চিত হয়েছে, এমন সিদ্ধান্তেও পৌঁছানো যায় না। চুক্তির মূল্যায়নের জন্য প্রযোজ্য মাশুল, পরিচালনাগত দায়িত্ব, বিনিয়োগের সময়সূচি এবং কোন পক্ষ কী ধরনের ঝুঁকি বহন করবে, সেসব বিষয়ে স্পষ্ট ধারণা থাকা প্রয়োজন। শুরুতে পাওয়া অর্থ তাৎক্ষণিক আয় দিতে পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে সাশ্রয়ী ও নির্ভরযোগ্য সেবা নিশ্চিত করাই এই ধরনের চুক্তির প্রকৃত পরীক্ষা।
চুক্তিটির সুফল সব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে কি না, সেই প্রশ্নও গুরুত্বপূর্ণ। পণ্য পরিবহনের সক্ষমতা বাড়লে এবং সময়সূচি আরও নির্ভরযোগ্য হলে রপ্তানিকারক, আমদানিকারক, পরিবহন প্রতিষ্ঠান ও গুদাম পরিচালনাকারীরা উপকৃত হতে পারেন। অন্যদিকে, উপঠিকাদারদের আরও কঠোর ক্রয়নীতি ও সরবরাহসংক্রান্ত শর্ত পূরণ করতে হতে পারে। ছোট ব্যবসায়ীদের জন্য নতুন ডিজিটাল ব্যবস্থার সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়াও কঠিন হতে পারে। তাই দ্রুত নিবন্ধন ও অন্তর্ভুক্তির সুযোগ, স্বচ্ছ ক্রয়প্রক্রিয়া এবং সেবাদাতাদের জন্য ন্যায্য শর্ত নিশ্চিত করতে হবে। দেশীয় সরবরাহকারীদের প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়ার বাস্তব সুযোগ থাকতে হবে, তবে সেই সুযোগ যেন শেষ পর্যন্ত গ্রাহকদের ওপর বাড়তি ব্যয়ের বোঝা না চাপায়।
শ্রমিকদের স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়াও অর্থনৈতিক মূল্যায়নের অপরিহার্য অংশ। পরিচালনপদ্ধতির পরিবর্তন ও স্বয়ংক্রিয় প্রযুক্তির ব্যবহার কর্মসংস্থান, প্রয়োজনীয় দক্ষতা এবং দর-কষাকষির ক্ষমতার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে। এ ক্ষেত্রে বাস্তবসম্মত রূপান্তর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন, যেখানে দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা, শ্রমিকদের সঙ্গে পরামর্শ এবং অভিযোগ নিষ্পত্তির কার্যকর ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকবে। এসব বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা না থাকলে অসন্তোষ, অবিশ্বাস ও কর্মক্ষেত্রে বিঘ্ন তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে সরকারি মালিকানার অধীনে পরিচালিত টার্মিনালে সিদ্ধান্ত গ্রহণের ওপর নজরদারি, বাণিজ্যিক তথ্যের যথাযথ ব্যবস্থাপনা এবং জরুরি পরিস্থিতিতে কার্যক্রম সচল রাখার পরিকল্পনাও কার্যকর হতে হবে।
পরিচালনাগত পরিবর্তন শুরুর আগেই মূল্যায়নের ভিত্তি নির্ধারণ করা প্রয়োজন। জাহাজের অপেক্ষার সময়, কনটেইনারের অবস্থানকাল, বন্দরে ট্রাকের প্রবেশ ও বের হতে লাগা সময়, যন্ত্রপাতির সচলতা, প্রযোজ্য মাশুল এবং গ্রাহকদের অভিযোগের তথ্য সংগ্রহ করে প্রকাশ করতে হবে। এসব তথ্যের ত্রৈমাসিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা যেতে পারে। শুধু গড় সময় জানালে চলবে না; মধ্যক এবং অস্বাভাবিক দীর্ঘ বিলম্বের তথ্যও প্রকাশ করা দরকার। কারণ, গড় হিসাবের আড়ালে দীর্ঘ সময় ধরে আটকে থাকা পণ্যের সমস্যা চাপা পড়ে যেতে পারে।
কর্মদক্ষতার পরিবর্তন মূল্যায়নের সময় পণ্যের পরিমাণ ও ধরন, শুল্কসংক্রান্ত নীতির পরিবর্তন এবং অন্যান্য প্রাসঙ্গিক বিষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। নতুন পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণের পর কোনো সূচকে উন্নতি দেখা গেলেই সেই উন্নতির সম্পূর্ণ কৃতিত্ব পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানের, এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যাবে না। পরিবর্তনের প্রকৃত কারণ নির্ধারণে তথ্যভিত্তিক ও নিরপেক্ষ মূল্যায়ন প্রয়োজন।
বাংলাদেশে এই চুক্তির সাফল্য নির্ধারিত হওয়া উচিত বাস্তব সুফল ও জবাবদিহির ভিত্তিতে। বিনিয়োগ গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু বিনিয়োগের ঘোষণা বা আশাবাদ দিয়ে সাফল্য বিচার করা যায় না। প্রমাণই হতে হবে মূল্যায়নের ভিত্তি। ব্যবসার সামগ্রিক ব্যয় কমছে কি না, পণ্য সরবরাহ আরও নির্ভরযোগ্য হচ্ছে কি না, ছোট ও বড় প্রতিষ্ঠান ন্যায্য সুযোগ পাচ্ছে কি না এবং শ্রমিক ও জনস্বার্থ কার্যকরভাবে সুরক্ষিত থাকছে কি না, সেসব প্রশ্নের উত্তর দিতে হবে পরিমাপযোগ্য তথ্যের মাধ্যমে। গুরুত্বপূর্ণ একটি টার্মিনালের ব্যবস্থাপনা বদলেই চুক্তির লক্ষ্য পূরণ হবে না। এর প্রকৃত সার্থকতা নির্ভর করবে বাংলাদেশের সামগ্রিক বাণিজ্যব্যবস্থায় কতটা স্থায়ী, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিমাপযোগ্য উন্নতি আনা সম্ভব হলো, তার ওপর।
তথ্যসূত্র:
Bangladesh Garment Manufacturers and Exporters Association. (n.d.). Export performance. Retrieved October 12, 2026, from https://www.bgmea.com.bd/page/Export_Performance
Herrera Dappe, M., Kunaka, C., Lebrand, M., & Weisskopf, N. (2020). Moving forward: Connectivity and logistics to sustain Bangladesh’s success. World Bank. https://doi.org/10.1596/978-1-4648-1507-2
Prothom Alo. (2026, October 8). 15 bochhor New Mooring Terminal porichalona korbe Dubaiyer DP World, chukti soi [Dubai’s DP World to operate New Mooring Terminal for 15 years; agreement signed]. https://www.prothomalo.com/business/xkter5hxpt
United Nations Conference on Trade and Development. (2024). Review of maritime transport 2024: Navigating maritime chokepoints. United Nations. https://unctad.org/publication/review-maritime-transport-2024
