আমিরা হায়দার
স্বতন্ত্র স্থপতি
২৬ আগস্টের ভোতেকোশি বিপর্যয়ে নেপালের হিমালয়সংলগ্ন অঞ্চলে ৯০০ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু এবং ৪ হাজারেরও বেশি মানুষের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা শুধু উজানের একটি দেশের জাতীয় দুর্যোগ নয়। বাংলাদেশের জন্যও এই ঘটনা বড় ধরনের ভৌগোলিক সতর্কসংকেত। নেপালের উপত্যকাগুলো দিয়ে বরফ, পাথর ও ধ্বংসাবশেষের যে ভয়াবহ স্রোত নেমে এসেছে, সেই একই নদীগুলো শেষ পর্যন্ত গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকা ব্যবস্থায় গিয়ে মিশেছে। আর এই নদীজালই ১৭ কোটির বেশি মানুষের জীবন ও জীবিকার ভিত্তি, একই সঙ্গে বড় ধরনের বন্যাঝুঁকির উৎস। একই বিষয় নিয়ে আমার আগের লেখার ধারাবাহিকতায় এই নিবন্ধটি প্রকাশ করা হলো।
ভাটির প্রবাহপথ: বাংলাদেশে বন্যার পানি যেভাবে প্রবেশ করে
বাংলাদেশের মোট অববাহিকা এলাকার প্রায় ৯৩ শতাংশ দেশের সীমানার বাইরে। ফলে পানিবিজ্ঞানের দিক থেকে বাংলাদেশ বিশ্বের সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। দেশের ভেতরে এই বিপুল জলপ্রবাহ মূলত তিনটি প্রধান নদীপথ দিয়ে প্রবেশ করে।
ব্রহ্মপুত্র, বাংলাদেশের ভেতরে যাকে যমুনা বলা হয়, কুড়িগ্রাম ও লালমনিরহাটের দিক দিয়ে উত্তরে প্রবেশ করে। গঙ্গা, বাংলাদেশের অংশে পদ্মা নামে পরিচিত, চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর দিক দিয়ে পশ্চিম সীমান্ত অতিক্রম করে। অন্যদিকে মেঘনা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে সুরমা ও কুশিয়ারা নদীর মতো আন্তঃসীমান্ত প্রবাহকে সঙ্গে নিয়ে সিলেট অঞ্চলে প্রবেশ করে।
প্রতিটি নদী ব্যবস্থার পানির উৎসও ভিন্ন। তিব্বতের তুষারগলা পানি এবং হিমালয়ের মৌসুমি বৃষ্টির প্রবাহে পুষ্ট ব্রহ্মপুত্র বর্ষাকালে বন্যার পানির সবচেয়ে বড় অংশ বহন করে। গঙ্গা পশ্চিম হিমালয় ও গাঙ্গেয় সমভূমির পানি নিষ্কাশন করে। আর মেঘনা মেঘালয় পাহাড় এবং বরাক অববাহিকার বিপুল বৃষ্টির পানি বহন করে।
চাঁদপুরের কাছে এই নদীগুলো একে অপরের সঙ্গে মিলিত হয়ে বঙ্গোপসাগরের দিকে প্রবাহিত হয়। ফলে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ ভূমি নিয়ে গঠিত বিস্তীর্ণ বন্যাপ্রবণ সমভূমির বড় অংশই পানিতে তলিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল: কোথায় পানি প্রথমে ও সবচেয়ে বেশি আঘাত হানে
বন্যার ঝুঁকি নদী ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এবং এর প্রভাবও অনেকটা অনুমানযোগ্য। যমুনার উজান অংশের প্রবাহপথে থাকা কুড়িগ্রাম, রংপুর ও গাইবান্ধা ব্রহ্মপুত্রের পানির ঢলের প্রথম ধাক্কা সামলায়। আরও ভাটিতে নদীর শাখা প্রশাখায় বিভক্ত প্রবাহ প্রায় নিয়মিতভাবে সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও টাঙ্গাইলকে বিপর্যস্ত করে। পদ্মার তীরবর্তী রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জও দীর্ঘদিন ধরে বন্যার ঝুঁকিতে রয়েছে।
মেঘনা অববাহিকার হাওর অঞ্চল, বিশেষ করে সুনামগঞ্জ, সিলেট, হবিগঞ্জ ও নেত্রকোনা, অনেকটা বাটির মতো নিচু ভূমি। ফলে সেখানে পানি দ্রুত জমে এবং সহজে নামতে পারে না। দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের খুলনা, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরা আবার একসঙ্গে একাধিক ঝুঁকির মুখে পড়ে। নদীর বন্যার সঙ্গে যুক্ত হয় জলোচ্ছ্বাস এবং লবণাক্ত পানির অনুপ্রবেশ।
এই সব অঞ্চলের একটি অভিন্ন সমস্যা হলো নদীর তলদেশে পলি জমে উচ্চতা বেড়ে যাওয়া। ফলে নদীর পানি ধারণক্ষমতা কমে যায় এবং পানি সহজেই আশপাশের জনবসতিপূর্ণ এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে।
নদীর তলদেশে পলি জমা ও নদীভাঙনের ভয়াবহতা
বাংলাদেশের নদীর তলদেশ ও তীর প্রতিনিয়ত বাড়তে থাকা চাপের মুখে রয়েছে। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা দিয়ে হিমালয় থেকে প্রতিবছর এক বিলিয়ন টনেরও বেশি পলি নেমে আসে। বদ্বীপের দিকে ভূমির ঢাল কমে আসার সঙ্গে সঙ্গে এই পলি নদীর তলদেশে জমা হতে থাকে।
দীর্ঘদিনের এই পলি জমার ফলে নদীর তলদেশ আশপাশের বন্যাভূমির তুলনায় উঁচু হয়ে যায়। ফলে নদীগুলো এক ধরনের উঁচু প্রবাহপথে পরিণত হয় এবং পানি উপচে পড়ার ঝুঁকি বাড়ে। শুধু যমুনাই বছরে প্রায় ৫০ কোটি টন পলি বহন করে। নদীর বারবার গতিপথ পরিবর্তন এবং শাখা প্রশাখায় বিভক্ত হয়ে পড়ার পেছনেও এই বিপুল পলিপ্রবাহ বড় ভূমিকা রাখে।
পদ্মা, যমুনা ও মেঘনার ভাঙনে প্রতিবছর হাজার হাজার হেক্টর কৃষিজমি নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে। ধ্বংস হচ্ছে অবকাঠামো, বাস্তুচ্যুত হচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। পদ্মার পশ্চিমমুখী গতিপথের পরিবর্তনে মানিকগঞ্জ ও ফরিদপুরের বহু বসতি নদীগর্ভে হারিয়েছে। যমুনা প্রতিবছর আনুমানিক ৩ হাজার থেকে ৫ হাজার হেক্টর জমি ভাঙনের কবলে ফেলে।
এর সঙ্গে যদি হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যার মতো অস্বাভাবিক পানির ঢল যুক্ত হয়, তখন আগে থেকেই দুর্বল ও পানিতে পরিপূর্ণ নদীতীর বড় ধরনের চাপ সামলাতে পারে না। ফলে নদীভাঙন ও তীরধস খুব দ্রুত এবং অনেক সময় স্থায়ীভাবে ঘটে যেতে পারে।
যে পথে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে গ্রামীণ মানুষ
বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬৩ শতাংশ গ্রামে বসবাস করে। এই জনগোষ্ঠীর বড় অংশ নদীর তীরবর্তী বন্যাপ্রবণ এলাকা, চরাঞ্চল এবং নদীভাঙনপ্রবণ অঞ্চলে বসবাস করে, যেখানে বন্যার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
এই মানুষগুলো শুধু মৌসুমি বন্যার পানিতে আক্রান্ত হন না। নদীভাঙনের কারণে তাদের ঘরবাড়ি, কৃষিজমি ও স্থানীয় অবকাঠামো হারিয়ে যায়। অনেক পরিবার বারবার বাস্তুচ্যুত হয়ে শহরের বস্তিতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। কেউ কেউ কোনো সামাজিক নিরাপত্তা ছাড়াই অনিশ্চিত মজুরির কাজে যুক্ত হয়ে পড়ে।
রংপুর ও কুড়িগ্রামের চরাঞ্চলের মানুষ, সুনামগঞ্জের হাওরকেন্দ্রিক কৃষক এবং খুলনার বদ্বীপ অঞ্চলের জেলে সম্প্রদায়ের সংকটের জায়গাটি অনেকটা একই। তারা এমন জায়গায় বসবাস করেন যেখানে পানি সবার আগে পৌঁছে, নদীর তীর সবচেয়ে কাছে এবং সরকারি সুরক্ষা অবকাঠামো সবচেয়ে দুর্বল।
প্রতিরোধের প্রস্তুতি: এখনই যা করতে হবে
বাংলাদেশের এখন নেপাল, ভারত ও চীনের সঙ্গে সমন্বিত আন্তঃসীমান্ত আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। শুধু সাধারণ বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস যথেষ্ট নয়। হিমবাহের হ্রদ ভেঙে আকস্মিক বন্যা এবং বরফধসের মতো ঘটনা শনাক্ত করার জন্য আলাদা ব্যবস্থা প্রয়োজন। কারণ পরিষ্কার আকাশের দিনেও পাহাড়ের কোনো অংশ ধসে পড়তে পারে, অথচ প্রচলিত বৃষ্টিনির্ভর পূর্বাভাস ব্যবস্থা এমন বিপর্যয়ের সংকেত দিতে পারে না।
নদীতীর সুরক্ষায় ভূবস্ত্র ব্যবহার করে শক্তিশালী বাঁধ, পানি চলাচলের উপযোগী নদীপ্রবাহ স্থিতিশীলকরণ এবং ভেটিভার ঘাস ও বাঁশের মতো উদ্ভিদভিত্তিক প্রকৌশল ব্যবস্থা আরও বিস্তৃত করা দরকার। শুধু কংক্রিটের বাঁধ নির্মাণ করলে অনেক সময় ভাঙনের চাপ ভাটির দিকে সরিয়ে দেওয়া হয়। নমনীয় ও পানি চলাচল উপযোগী কাঠামো নদীর শক্তি শোষণ করতে তুলনামূলকভাবে বেশি কার্যকর হতে পারে।
নদীর তলদেশে জমা পলির প্রকৃত পরিমাণ বিবেচনায় নিয়ে খনন কার্যক্রমও বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বাহাদুরাবাদ, হার্ডিঞ্জ ব্রিজ ও ভৈরব বাজারের মতো গুরুত্বপূর্ণ নদীসংযোগস্থলে নদীর গভীরতা ও পানি ধারণক্ষমতা পুনরুদ্ধার করা জরুরি।
উচ্চমাত্রার বিশদ উপগ্রহচিত্র ব্যবহার করে দুর্যোগপ্রবণ এলাকার মানচিত্রও নিয়মিত হালনাগাদ করতে হবে। এর মাধ্যমে নতুন করে তৈরি হওয়া হিমবাহের হ্রদ এবং উজানের অস্থিতিশীল পাহাড়ি ঢাল শনাক্ত করা সম্ভব। এই তথ্য কোনো একটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে আঞ্চলিক তথ্য বিনিময় ব্যবস্থার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব দেশের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া প্রয়োজন।
নদীভাঙনের কারণে বাস্তুচ্যুত মানুষের জন্য জাতীয় পর্যায়ে একটি সুস্পষ্ট নীতি থাকা দরকার। কোনো পরিবার নদীভাঙনে সব হারানোর পর শহরের বস্তিতে ঠাঁই নেওয়ার আগে পরিকল্পিত পুনর্বাসন, জীবিকা পুনর্গঠন এবং জমির ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে।
সিলেট অববাহিকার হাওর এলাকার বাঁধগুলোও আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। নিয়ন্ত্রিতভাবে পানি নিষ্কাশনের জন্য নিয়ন্ত্রক ফটক স্থাপন করা যেতে পারে। পুরো এলাকা সম্পূর্ণভাবে পানি আটকে রাখার চেষ্টা অনেক সময় বড় বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
হিমালয় বাংলাদেশের নীতিনির্ধারকদের জন্য অপেক্ষা করছে না। বরফ ও হিমবাহের জগতে হয়তো পরবর্তী বন্যার ঢেউ ইতিমধ্যেই তৈরি হচ্ছে। পানি বাংলাদেশের ভূমিতে পৌঁছানোর পর ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ খুব সীমিত। তাই দুর্যোগ আসার আগেই প্রস্তুতি, আঞ্চলিক সহযোগিতা এবং নদী ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
তথ্যসূত্র:
