এ টি এম আশফিকুর রহমান
নেটওয়ার্ক সিস্টেম অ্যাডমিনিস্ট্রেটর, লন্ডন চার্চিল কলেজ
একটি হাইটেক পার্কের উদ্দেশ্য হলো উদ্যোক্তারা সেখানে এসে বিদ্যুৎ চালু করবেন, গ্যাসের সংযোগ পাবেন এবং উৎপাদন শুরু করবেন। কিন্তু উদ্বোধনের পাঁচ বছর পরও সিলেট হাইটেক পার্ক সেই প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারেনি।
দ্য ডেইলি স্টার-এর সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদন অনুযায়ী, পার্কটিতে ২০ হাজার কর্মসংস্থানের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে কাজ পেয়েছেন প্রায় ৪০০ জন। বিনিয়োগ এসেছে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা, যেখানে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ১৫০০ কোটি টাকা। জমি বা জায়গা বরাদ্দ পাওয়া ১৪টি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে চালু রয়েছে মাত্র দুটি। এই অভিজ্ঞতা দেখিয়ে দিয়েছে, প্রয়োজনীয় পরিবেশ নিশ্চিত করার আগেই প্রকল্প নির্মাণ করলে তার পরিণতি কী হতে পারে।
অবকাঠামো আছে, প্রয়োজনীয় সুবিধা নেই
সিলেট শহর থেকে প্রায় ২২ কিলোমিটার উত্তরে কোম্পানীগঞ্জে ১৭১ একর জমির ওপর পার্কটি গড়ে তোলা হয়েছে। ২০১৬ সালে ৩৩৬ কোটি টাকা ব্যয়ে প্রকল্পটি অনুমোদন করা হয়। ২০২১ সালের ডিসেম্বরে উদ্বোধনের সময় এর লক্ষ্য ছিল সিলেটে শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করা, তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলোর নৈকট্যকে কাজে লাগানো। কিন্তু শিল্প পরিচালনার মৌলিক সুবিধাগুলোই এখনো নিশ্চিত হয়নি।
সবচেয়ে বড় সমস্যা গ্যাসের সংযোগ। পার্কটির প্রধান উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান র্যাংস ইলেকট্রনিকস ২০২৫ সালে ৩২ একর জমিতে উৎপাদন শুরু করে। প্রতিষ্ঠানটি ২০২২ সালে শিল্পকারখানার জন্য গ্যাসের আবেদন করলেও তা প্রত্যাখ্যাত হয়। পার্ক কর্তৃপক্ষ ২০২৫ সালের নভেম্বরে আবার আবেদন করে, সেটিও প্রত্যাখ্যাত হয়। ২০২৬ সালের এপ্রিলে নতুন করে আবেদন করা হলেও এখনো সিদ্ধান্ত মেলেনি। প্রতিষ্ঠানটির দাবি, বর্তমানে তারা উৎপাদনক্ষমতার প্রায় ৩০ শতাংশ ব্যবহার করতে পারছে এবং শুধু রেফ্রিজারেটর তৈরি করছে। বছরে তাদের লোকসান প্রায় ৬০ কোটি টাকা।
বিদ্যুৎ সরবরাহও নির্ভরযোগ্য নয়। গ্রামীণ বিদ্যুতায়ন লাইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ আসে। ভারী বৃষ্টিতে প্রায়ই দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ থাকে না। বিকল্প সরবরাহব্যবস্থা না থাকায় রক্ষণাবেক্ষণের সময় উৎপাদন কয়েক দিন বন্ধ রাখতে হয়। অন্য চালু প্রতিষ্ঠানটি একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রশিক্ষণকেন্দ্র। দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, শিক্ষার্থী আকর্ষণে অসুবিধা এবং সন্ধ্যার পর নিরাপত্তার উদ্বেগ তাদের কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করছে। জ্ঞানভিত্তিক শিল্পের জন্য বিদ্যুতের পাশাপাশি যোগাযোগ, যাতায়াত ও নিরাপত্তাও অপরিহার্য।
নীতির প্রতিশ্রুতি, বাস্তবায়নের ঘাটতি
কর্তৃপক্ষ গ্যাস সংযোগ, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, কর অবকাশ, যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্কছাড় এবং মুনাফা দেশে ফেরত পাঠানোর সুযোগ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। কিন্তু এসব সুবিধার বেশ কয়েকটি বাস্তবায়িত হয়নি। সরকারি নথিপত্র সংগ্রহের জন্য এক জায়গায় সব সেবা পাওয়ার যে ব্যবস্থা চালুর কথা ছিল, তা-ও কার্যকর হয়নি। ফলে উদ্যোক্তাদের সাধারণ নিয়মে একেকটি সরকারি দপ্তরে আলাদাভাবে যোগাযোগ করতে হচ্ছে।
প্রতিষ্ঠানগুলোর অভিযোগ, নির্মাণের প্রথম তিন বছর ভাড়া না নেওয়া এবং পরে যুক্তিসংগত ভাড়া নির্ধারণের আশ্বাস দেওয়া হলেও শুরু থেকেই ভাড়া দিতে হয়েছে। এই অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক দুর্বলতা তুলে ধরে। হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ জমি বরাদ্দ দিতে পারে, কিন্তু গ্যাসের অনুমোদন নির্ভর করে জ্বালানি খাতের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ওপর, আর বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করে বিদ্যুৎ বিতরণকারী সংস্থা। সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে সমন্বয় না থাকলে বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারেন, কাগজে থাকা সুবিধার সঙ্গে বাস্তবের ব্যবধান কতটা।
চাহিদার আগেই অবকাঠামো নির্মাণ
সিলেট হাইটেক পার্কের মূল সমস্যা পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা ও দায়িত্বশীলতার অভাব। জমি উন্নয়ন, ভবন নির্মাণ ও বরাদ্দ দেওয়ার কাজ আগে হয়েছে, কিন্তু কারখানা চালানোর জন্য অপরিহার্য পরিষেবাগুলো নিশ্চিত করা হয়নি। শহর থেকে দূরবর্তী অবস্থানও বিনিয়োগ আকর্ষণে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পার্কটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকও দূরত্বকে একটি সীমাবদ্ধতা হিসেবে স্বীকার করেছেন। দক্ষ কর্মী, নির্ভরযোগ্য যাতায়াত এবং বড় বিনিয়োগকারী আকৃষ্ট করার সুস্পষ্ট পরিকল্পনা ছাড়াই প্রকল্পটির উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল।
দুর্বল প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনাও সংকটের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। দ্য ডেইলি স্টার-এর ২০২৪ সালের নভেম্বরের এক অনুসন্ধানে দেখা যায়, আগের সরকারের ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচির আওতায় ৮৫০০ কোটি টাকা ব্যয়ের ১৫টি তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি প্রকল্পে ত্রুটিপূর্ণ পরিকল্পনা, দুর্নীতি ও বাস্তবায়নের দুর্বলতা ছিল। সিলেটের অভিজ্ঞতা সেই বৃহত্তর সমস্যারই প্রতিফলন, যেখানে প্রকল্প উদ্বোধনকে সাফল্যের মাপকাঠি ধরা হয়, কর্মসংস্থান ও উৎপাদনকে নয়।
বিনিয়োগ ফিরিয়ে আনার উপায়
২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়া বিএনপি নেতৃত্বাধীন সরকার পার্কটি পুনরুজ্জীবিত করার জন্য একটি কমিটি গঠন করেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য, যিনি একজন মন্ত্রীও, জুন মাসে পার্কটি পরিদর্শন করেন। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয়নি। আগামী ৪ নভেম্বর এ বিষয়ে একটি উচ্চপর্যায়ের বৈঠক হওয়ার কথা রয়েছে। বৈঠকের পর কথার বদলে কার্যকর পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, গ্যাস সংযোগের বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সিদ্ধান্ত নিতে হবে। জাতীয় সরবরাহব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে গ্যাস দেওয়া সম্ভব না হলে তা স্পষ্ট করে জানাতে হবে এবং সংকুচিত বা তরলীকৃত গ্যাস সরবরাহের মতো বিকল্প বিবেচনা করতে হবে, যাতে উদ্যোক্তারা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা করতে পারেন।
দ্বিতীয়ত, পার্কের জন্য পৃথক বিদ্যুৎ সরবরাহ লাইন, বিকল্প বিদ্যুৎব্যবস্থা এবং ভবনের ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। তৃতীয়ত, এক জায়গায় সরকারি সেবা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করতে হবে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের প্রতিনিধিদের পার্কে নিয়োজিত করে অনুমোদনের জন্য নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া দরকার।
চতুর্থত, ভাড়া ছাড়ের যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তা পর্যালোচনা করে ন্যায্য সমাধান করতে হবে। নির্মাণের সময়কাল ও উৎপাদন শুরুর অগ্রগতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে ভাড়া পুনর্নির্ধারণ করা যেতে পারে।
পঞ্চমত, অব্যবহৃত জমি ও স্থবির প্রকল্পগুলো পর্যালোচনা করা জরুরি। যেসব প্রতিষ্ঠান নির্মাণ শুরু করেনি বা কাজ বন্ধ রেখেছে, তাদের নির্দিষ্ট সময়সীমা দিতে হবে। নির্ধারিত সময়ে অগ্রগতি না হলে জমি প্রকৃত বিনিয়োগকারীদের বরাদ্দ দেওয়া উচিত। সিলেটের প্রবাসী উদ্যোক্তাদেরও বিনিয়োগে উৎসাহিত করা যেতে পারে।
ষষ্ঠত, শহরের সঙ্গে নির্ভরযোগ্য যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং পার্কের আশপাশে পর্যাপ্ত আলো ও নিরাপত্তা টহলের ব্যবস্থা করা দরকার। সবশেষে, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ ও চালু প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা নিয়ে প্রতিবছর একটি অগ্রগতি প্রতিবেদন প্রকাশ করা উচিত। এতে প্রকল্পের সাফল্য সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পাওয়া যাবে।
নীতির বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা
সিলেট হাইটেক পার্কে এখনো ৭৬ একরের বেশি জমি অব্যবহৃত রয়েছে। পাশাপাশি একটি উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানও সেখানে কাজ করছে। অর্থাৎ, ঘুরে দাঁড়ানোর সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যায়নি। তবে তার জন্য বহু বছর আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতিগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।
দেশের অন্যান্য বিনিয়োগকারীরাও এই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নেবেন। সরকার নিজেই নির্মাণ করা একটি পার্কে গ্যাস ও বিদ্যুৎ নিশ্চিত করতে না পারলে ভবিষ্যতের প্রকল্পে বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জন কঠিন হবে। তাই সিলেট হাইটেক পার্ককে সচল করা শুধু একটি প্রকল্প উদ্ধারের প্রশ্ন নয়। বিনিয়োগকারীদের কাছে দেওয়া প্রতিশ্রুতি যে বাস্তবে রক্ষা করা যায়, তা প্রমাণ করারও পরীক্ষা।
