নাঈমা অনামিকা
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
সম্প্রতি দ্যা ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত সুমিত বণিকের ‘রিথিংকি হেলথকেয়ার ফর চিলড্রেন ইন দ্যা সিএইচটি’ শীর্ষক লেখাটি নতুন করে পার্বত্য চট্টগ্রামের শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার বিষয়টি সামনে এনেছে। দুর্গম পাহাড়ি জনপদে বাস করা অগণিত শিশুদের স্বাস্থ্যসেবার নিশ্চয়তা কতটুকু এবং এ ব্যাপারে আসলেই কি করণীয় তা নতুন করে ভাববার সময় এসেছে।
বাস্তবতার নিরিখে যদি আমরা ভাবি, বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের বিস্তীর্ণ পাহাড়ি জনপদে একটি শিশুর অসুস্থতা শুধু একটি পারিবারিক দুর্ভোগ নয়; এটি হয়ে ওঠে সময়, দূরত্ব, দারিদ্র্য এবং স্বাস্থ্যব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার এক কঠিন পরীক্ষা। বিশেষ করে বান্দরবান-এর দুর্গম এলাকাগুলোতে শিশুর অসুস্থতা মানেই একটি পরিবারের জন্য অনিশ্চয়তা, উদ্বেগ এবং সংগ্রামের সূচনা। সম্প্রতি আলীকদম-এ শিশু মৃত্যুর ঘটনা এবং হাম-সদৃশ রোগের আশঙ্কা এই বাস্তবতাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।
পার্বত্য চট্টগ্রামের ম্রো, মারমা ও অন্যান্য ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মানুষের জন্য স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া এখনো একটি বড় চ্যালেঞ্জ। অনেক পরিবারকে নিকটবর্তী স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পৌঁছাতে ঘণ্টার পর ঘণ্টা হাঁটতে হয় দুর্গম পাহাড়ি পথ পেরিয়ে। কোথাও নৌকায়, কোথাও মোটরসাইকেলে, আবার কোথাও শুধুই পায়ে হেঁটে যেতে হয়। এই দীর্ঘ যাত্রা শুধু সময়সাপেক্ষ নয়; এর আর্থিক ব্যয়ও অনেক পরিবারের সাধ্যের বাইরে। ফলে অনেকেই বাধ্য, নিরুপায় হয়ে স্থানীয় ও ঐতিহ্যগত চিকিৎসাপদ্ধতির ওপর নির্ভর করেন, যা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই যথেষ্ট নয়।
গতানুগতিক ভাবে এই সমস্যাটির সমাধান সহজ মনে হতে পারে, আরও হাসপাতাল নির্মাণ, চিকিৎসক নিয়োগ কিংবা অবকাঠামো সম্প্রসারণ। কিন্তু পার্বত্য অঞ্চলের ভৌগোলিক বাস্তবতা এতটাই ভিন্ন যে প্রচলিত এসব সমাধান সবসময় কার্যকর হয় না। এক্ষেত্রে পাহাড়ের জীবনযাত্রা, যোগাযোগব্যবস্থা এবং বাস্তব প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিয়ে আলাদা কৌশল প্রয়োজন।
এই সংকট মোকাবিলার সবচেয়ে কার্যকর উপায় হতে পারে স্বাস্থ্যসেবাকে মানুষের কাছে, দ্বারে পৌঁছে দেওয়া। নিয়মিত মোবাইল স্বাস্থ্য ইউনিট চালুর মাধ্যমে টিকাদান, মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা এবং প্রাথমিক চিকিৎসা সুবিধা সরাসরি দুর্গম ইউনিয়নগুলোতে পৌঁছে দেওয়া সম্ভব। স্বাস্থ্যকর্মীরা নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী উপস্থিতি স্থানীয় জনগণের মধ্যে আস্থা তৈরি হবে এবং তারা প্রয়োজনের সময় সেবা নিতে উৎসাহিত হবেন।
অন্যদিকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মধ্য থেকেই স্বাস্থ্যকর্মী তৈরি করাও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। স্থানীয় তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে কমিউনিটি স্বাস্থ্যকর্মী হিসেবে গড়ে তোলা গেলে তারা সহজেই রোগের প্রাথমিক লক্ষণ শনাক্ত করতে পারবেন এবং প্রয়োজন হলে দ্রুত রোগীকে রেফার করতে পারবেন। স্থানীয় ভাষা ও সংস্কৃতি সম্পর্কে জানার কারণে তাদের প্রতি মানুষের আস্থাও বেশি থাকবে।
তবে সবচেয়ে বড় সংকটগুলোর একটি হলো জরুরি পরিবহন ব্যবস্থা। কোনো শিশুর অবস্থা হঠাৎ খারাপ হলে দ্রুত চিকিৎসাকেন্দ্রে নেওয়ার সুযোগ প্রায়ই থাকে না। পাহাড়ি পথে যাতায়াত যেমন কষ্টকর, তেমনি ব্যয়বহুলও। এই বাস্তবতায় মোটরবাইক অ্যাম্বুলেন্স, কমিউনিটিভিত্তিক জরুরি তহবিল এবং দ্রুত যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি।
ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ব্যবস্থাকেও এখানে একেবারে ফেলে দেয়া যাবেনা বরং গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। স্থানীয় জনগোষ্ঠীর আস্থা দীর্ঘদিন ধরে এই ব্যবস্থার ওপর প্রতিষ্ঠিত। তাই তাদের বাদ না দিয়ে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার সঙ্গে এর সমন্বয় ঘটাতে পারলে ইতিবাচক ফল পাওয়া সম্ভব। ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসকদের ঝুঁকিপূর্ণ লক্ষণ শনাক্তকরণে প্রশিক্ষণ দিলে তারা দ্রুত রোগীকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে পাঠাতে সহায়তা করতে পারবেন।
স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও প্রয়োজন ভিন্নধর্মী উদ্যোগ।এক্ষেত্রে ভাষা অনেক বড় একটি বিষয়। শহুরে ভাষা বা প্রচলিত প্রচারণা পাহাড়ি মানুষের কাছে অনেক সময় কার্যকর হয় না। স্থানীয় ভাষা, গল্প বলার পদ্ধতি এবং কমিউনিটিকেন্দ্রিক যোগাযোগব্যবস্থা ব্যবহার করলে স্বাস্থ্যবার্তা আরও সহজে গ্রহণযোগ্য হবে।
সবশেষে আমি বলব, পার্বত্য চট্টগ্রামের জন্য প্রয়োজন বিশেষায়িত স্বাস্থ্যনীতি। সারাদেশের জন্য একক স্বাস্থ্যকৌশল এই অঞ্চলের বাস্তবতায় যথেষ্ট বা কিছু ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। বিশেষ বাজেট, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সরকারি-বেসরকারি সমন্বিত কার্যকরী উদ্যোগ ছাড়া এই সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
আলীকদম-এর একটি শিশুর জীবন তার জন্মস্থানের কারণে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে না। স্বাস্থ্যসেবা কোনো বিলাসিতা নয়, এটি একটি মৌলিক অধিকার। তাই পার্বত্য অঞ্চলের শিশুদের জন্য প্রয়োজন এমন একটি স্বাস্থ্যব্যবস্থা, যা শুধু চিকিৎসা দেয় না, বরং সময় অনুযায়ী সঠিক অর্থেই তাদের পাশে দাঁড়ায়।
আরও পড়ুন… গণস্বাস্থ্য কার্যক্রম- বর্তমান এবং ভবিষ্যৎ
হামের ভয়াবহ বিস্তার বিদ্যমান: টিকাদান চললেও কেন থামছে না সংক্রমণ
