ফারাহ জেহির
নির্বাহী সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
চলতি বছর এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার নেমে এসেছে ৬২ দশমিক ২৫ শতাংশে, আগের বছর যা ছিল ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশ। ফল যা-ই হোক, প্রতিটি শিক্ষার্থীর সামনে এরপর আসে একই প্রশ্ন: এবার কোন পথে? কোন কলেজে ভর্তি হবে, বিজ্ঞান, মানবিক বা ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগের কোনটি বেছে নেবে, নাকি কারিগরি শিক্ষায় যাবে, এসব সিদ্ধান্ত তাকে নিতে হয় কিশোর বয়সেই। কলেজের দুই বছর পেরোলে এইচএসসির পর আবার আসে বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি প্রশিক্ষণ বা কর্মজীবনের বড় সিদ্ধান্ত। অথচ বাংলাদেশে স্কুল ও কলেজ, অর্থাৎ মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক উভয় স্তরেই সরকারি উদ্যোগে গড়া, নিয়মিত ও সর্বজনীন কোনো ক্যারিয়ার গাইডেন্স বা মেন্টরিং ব্যবস্থা নেই। শিক্ষার্থীরা সাধারণত আত্মীয়স্বজন, বন্ধু বা কোচিং সেন্টারের পরামর্শে এগিয়ে যায়।
সংখ্যায় সংকটের চিত্র
বিদ্যমান ব্যবস্থার প্রধান দুর্বলতা হলো, শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও তার অধীন সংস্থাগুলো মূলত পাঠ্যক্রম, পরীক্ষা ও প্রশাসন নিয়ে কাজ করে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ক্যারিয়ার ক্লাব বা অতিথি বক্তার আয়োজন করে, তবে তা প্রতিষ্ঠানপ্রধানের ব্যক্তিগত আগ্রহের ওপর নির্ভর করে। প্রশিক্ষিত কাউন্সেলর নিয়োগ বাধ্যতামূলক নয়। ঢাকার নামী স্কুলেও পূর্ণকালীন ক্যারিয়ার কাউন্সেলর নেই বলে গণমাধ্যমে প্রতিবেদন এসেছে।
এর প্রভাব পরিসংখ্যানে স্পষ্ট। বাংলাদেশ শিক্ষাতথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০২৩ সালে মাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার ছিল ৩২ দশমিক ৮৫ শতাংশ। ছেলেদের ক্ষেত্রে তা ৩০ দশমিক ৬৩ এবং মেয়েদের ক্ষেত্রে ৩৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ। ২০১০ সালের ৫৫ শতাংশের তুলনায় এটি উন্নতি হলেও প্রতি তিনজনের একজনের বেশি শিক্ষার্থী এখনো মাধ্যমিক শেষ করতে পারছে না। ব্যানবেইসের খসড়া তথ্যে উচ্চমাধ্যমিক স্তরে ঝরে পড়ার হার চার বছরে ১৮ শতাংশ থেকে ২১ শতাংশের বেশিতে উঠেছে। একই তথ্যে দেখা যায়, ২০১৯ সালে মাধ্যমিকে শিক্ষার্থী ছিল ৯২ লাখ ৩০ হাজারের বেশি, ২০২৩ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে ৮১ লাখ ৬৬ হাজারে।
বাল্যবিবাহের চিত্রও উদ্বেগজনক। ইউনিসেফ, ইউএন উইমেন ও প্ল্যান ইন্টারন্যাশনালের ২০২৫ সালের প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সী নারীদের ৫১ দশমিক ৪ শতাংশ আঠারো বছরের আগে বিবাহিত হয়েছেন, যা এশিয়ায় সর্বোচ্চ। বিবিএসের নমুনা জরিপে এই হার তুলনামূলক কম, ২০২৩ সালে ৪১ দশমিক ৬ শতাংশ। জরিপ পদ্ধতির পার্থক্যের কারণে সংখ্যা ভিন্ন হলেও প্রবণতা একই। কারিগরি শিক্ষার ক্ষেত্রে সরকারের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে ভর্তির হার ৩০ শতাংশে তোলা। সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০২০ সালে হার ১৬ শতাংশের কাছাকাছি পৌঁছানোর পর প্রবৃদ্ধি থমকে আছে। এসএসসি (ভোকেশনাল) স্তরে ৪ লাখ ৯৭ হাজার আসনের মধ্যে তিন লাখের বেশি ফাঁকা থেকেছে। সঠিক তথ্য ও পরামর্শের অভাবে অভিভাবক ও শিক্ষার্থীরা এই পথকে ভরসাযোগ্য মনে করছেন না।
বিশ্বের অভিজ্ঞতা ও টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট
অনেক দেশ এই শূন্যতা পূরণ করেছে আইন ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে। ফিনল্যান্ডে মৌলিক শিক্ষার অংশ হিসেবে শিক্ষা ও ক্যারিয়ার পরামর্শ বাধ্যতামূলক এবং স্কুলে প্রশিক্ষিত স্টাডি কাউন্সেলর কাজ করেন। সিঙ্গাপুরের শিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রাথমিক স্তর থেকেই ধাপে ধাপে শিক্ষা ও ক্যারিয়ার গাইডেন্স কর্মসূচি চালায়। ইংল্যান্ডের স্কুলগুলোর নিরপেক্ষ ক্যারিয়ার পরামর্শ দেওয়ার আইনি দায়িত্ব আছে, প্রতিটি স্কুলে থাকেন একজন ক্যারিয়ার লিডার এবং গ্যাটসবি বেঞ্চমার্ক নামের মানদণ্ডে কাজের মূল্যায়ন হয়।
টেকসই উন্নয়ন অভীষ্টের (এসডিজি) কাঠামোয় বিষয়টি সবচেয়ে সরাসরি যুক্ত এসডিজি ৪ বা মানসম্মত শিক্ষার সঙ্গে। লক্ষ্য ৪.৩ কারিগরি, বৃত্তিমূলক ও উচ্চশিক্ষায় সমান সুযোগের কথা বলে, আর লক্ষ্য ৪.৪ কর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা হওয়ার উপযোগী দক্ষতাসম্পন্ন তরুণ বাড়ানোর কথা বলে। এসডিজি ৮-এর লক্ষ্য ৮.৬ শিক্ষা, কর্ম বা প্রশিক্ষণের বাইরে থাকা তরুণদের অনুপাত কমাতে চায়। বিবিএসের তথ্য উদ্ধৃত করে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশ জানিয়েছে, দেশের প্রায় ৩৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ তরুণ পড়াশোনা বা কাজ কোনোটিতেই নেই, নারীদের মধ্যে তা ৬০ শতাংশের বেশি। বাল্যবিবাহ রোধে প্রাসঙ্গিক এসডিজি ৫-এর লক্ষ্য ৫.৩, কিশোরদের মানসিক সুস্থতায় এসডিজি ৩-এর লক্ষ্য ৩.৪।
করণীয়: ধাপে ধাপে জাতীয় কাঠামো
প্রথমত, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীনে একটি জাতীয় নির্দেশনা নীতিমালা প্রয়োজন, যেখানে ষষ্ঠ থেকে দ্বাদশ শ্রেণির প্রতিটি ধাপের দায়িত্ব নির্দিষ্ট থাকবে। ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শ্রেণিতে আগ্রহ ও দক্ষতা চিহ্নিতকরণ, নবম শ্রেণিতে বিভাগ নির্বাচনের আগে পরামর্শ, আর একাদশ ও দ্বাদশে উচ্চশিক্ষা, কারিগরি পথ ও কর্মসংস্থানের তথ্য দেওয়া যেতে পারে।
দ্বিতীয়ত, জনবল গড়তে হবে। শুরুতে বিদ্যমান শিক্ষকদের মধ্য থেকে বাছাই করে শিক্ষক প্রশিক্ষণ কলেজ ও জাতীয় শিক্ষা ব্যবস্থাপনা একাডেমির মাধ্যমে সনদ প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়। প্রান্তিক এলাকায় উপজেলাভিত্তিক ভ্রাম্যমাণ কাউন্সেলর নিয়োগ করলে ব্যয়ও সীমিত থাকবে। তৃতীয়ত, শ্রমবাজারের চাহিদা, ভর্তির নিয়ম, বৃত্তি ও কারিগরি প্রতিষ্ঠানের তথ্য নিয়ে একটি জাতীয় ডিজিটাল পোর্টাল তৈরি করা দরকার।
চতুর্থত, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়, কারিগরি শিক্ষা বোর্ড ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের নিয়ে মেন্টরিং নেটওয়ার্ক গড়া সম্ভব। একজন সফল প্রকৌশলী বা উদ্যোক্তার সঙ্গে সরাসরি কথা বলার সুযোগ গ্রামের শিক্ষার্থীর কাছে বইয়ের চেয়ে বেশি অনুপ্রেরণাদায়ক হতে পারে। পঞ্চমত, সিদ্ধান্তের বড় অংশ যেহেতু পরিবারে নেওয়া হয়, তাই বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটি ও অভিভাবক সমাবেশে নিয়মিত অধিবেশন করে কারিগরি শিক্ষা ও বিকল্প পেশা নিয়ে ভুল ধারণা দূর করতে হবে। কারিগরি খাতে শিক্ষক সংকটের বিষয়টিও সমান জরুরি, কারণ সিপিডির তথ্যমতে অনুমোদিত ১৫ হাজার শিক্ষকপদের অর্ধেকের বেশি শূন্য।
কয়েকটি জেলায় পরীক্ষামূলক কর্মসূচি চালিয়ে ঝরে পড়ার হার, কারিগরি শিক্ষায় ভর্তি ও শিক্ষার্থীর মানসিক স্বাস্থ্যের সূচক তুলনামূলকভাবে মাপা উচিত। ব্যানবেইস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকেরা মূল্যায়নে যুক্ত থাকলে প্রমাণভিত্তিক সম্প্রসারণ সহজ হবে।
একজন কিশোরের সঠিক সময়ে সঠিক পরামর্শ পাওয়া ব্যক্তিগত সৌভাগ্যের বিষয় হয়ে থাকা উচিত নয়। এটি রাষ্ট্রীয় নিশ্চয়তার অংশ হওয়া দরকার। পরীক্ষার ফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীর পথ চেনানোর দায়িত্বও শিক্ষা ব্যবস্থাকে নিতে হবে।
তথ্যসূত্র
1- IANS, “Bangladesh tops in child marriage rate in Asia: UNICEF” (report by UNICEF, UN Women and Plan International, March 2025). https://morungexpress.com/bangladesh-tops-in-child-marriage-rate-in-asia-unicef
2- Asia News Network, “An alarming uptick in child marriage in Bangladesh” (Bangladesh Sample Vital Statistics 2023). https://asianews.network/an-alarming-uptick-in-child-marriage-in-bangladesh/
3- Centre for Policy Dialogue, “Technical education hit by teacher shortage, falling enrolment.” https://cpd.org.bd/?p=51340
4- Finland: Eurydice, “Guidance and counselling in early childhood and school education: Finland” (https://eurydice.eacea.ec.europa.eu/eurypedia/finland/guidance-and-counselling-early-childhood-and-school-education); Finnish National Agency for Education, “Criteria for Good Guidance” (2023), summarised at https://www.iccdpp.org/criteria-for-good-guidance-finland/. Singapore: Ministry of Education, “Education and Career Guidance” (https://www.moe.gov.sg/education-in-sg/our-programmes/education-and-career-guidance/overview) and SkillsFuture Singapore, “ECG FAQ” (https://www.skillsfuture.gov.sg/ecg/education-and-career-guidance-faq). England: Department for Education, “Careers guidance and access for education and training providers” (statutory guidance, May 2025), as summarised by Careers & Enterprise Company and other sources.
5- ActionAid Bangladesh, “Reimagining primary and compulsory education in Bangladesh,” 16 May 2024. https://actionaidbd.org/post/default/reimagining-primary-and-compulsory-education-bangladesh
6- United Nations, Transforming Our World: The 2030 Agenda for Sustainable Development (SDGs 3, 4, 5 and 8).
