মো. আওলাদ হোসাইন
ইউনিভার্সিটি অব ওয়েস্ট লন্ডন, যুক্তরাজ্য
বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতি নিয়ে আলোচনা হলেই সাধারণত বঙ্গোপসাগর, সমুদ্রবন্দর, নৌপরিবহন ও গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার প্রসঙ্গ সামনে আসে। অথচ দেশের অধিকাংশ জেলারই সমুদ্র উপকূল নেই, কিন্তু পানির অভাবও নেই। সুনামগঞ্জ ও কিশোরগঞ্জে রয়েছে বিস্তীর্ণ হাওর, যশোর ও কুষ্টিয়ায় অশ্বক্ষুরাকৃতির হ্রদ বা বাঁওড়, নাটোর ও পাবনায় বিল। ময়মনসিংহ, রংপুর ও রাজশাহীর মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে অসংখ্য নদী। গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে আছে লাখ লাখ পুকুর। বর্ষায় বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পানিতে ডুবে সাময়িক মৎস্যক্ষেত্রে পরিণত হয়। এসব জলাশয় ও জলাভূমি অর্থনৈতিক সম্পদ, যার সম্ভাবনা কাজে লাগাতে পারে সমুদ্র অর্থনীতির ধারণা।
এই নিবন্ধের মূল বক্তব্য হলো, বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির সম্ভাবনা শুধু উপকূলীয় অঞ্চলে সীমাবদ্ধ নয়। সমুদ্র থেকে দূরের জেলাগুলোর নদী, হাওর, বাঁওড়, বিল, পুকুর ও প্লাবনভূমিও খাদ্য উৎপাদন, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বাড়াতে পারে। সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে কী ধরনের নীতিগত উদ্যোগ প্রয়োজন, তা নিয়েই এখানে আলোচনা করা হয়েছে।
মৎস্যসম্পদই মূল ভিত্তি
দেশের মাছের চাহিদার বড় অংশ পূরণ হয় অভ্যন্তরীণ জলাশয়ে মাছ ধরা ও চাষের মাধ্যমে। আর এই উৎপাদনে উপকূলহীন জেলাগুলোর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ময়মনসিংহ, যশোর ও বগুড়ায় পুকুরে মাছ চাষের ফলে রুই, কাতলা, তেলাপিয়া ও পাঙাশের মতো মাছ বহু পরিবারের নিয়মিত খাবারে পরিণত হয়েছে। এখন চ্যালেঞ্জ শুধু উৎপাদনের পরিমাণ বাড়ানো নয়, বরং উৎপাদনশীলতা ও মাছের বাজারমূল্যও বাড়ানো।
অনুমোদিত হ্যাচারি থেকে উন্নত মানের পোনা সংগ্রহ, মাছের উপযোগী খাদ্য ব্যবহার এবং বায়োফ্লক ও পুনঃসঞ্চালনভিত্তিক জলচাষের মতো আধুনিক পদ্ধতি ছোট জলাশয় থেকেও উৎপাদন বাড়াতে পারে। নদী ও জলাধারে খাঁচায় মাছ চাষের সুযোগ ভূমিহীন পরিবারগুলোকেও মাছ উৎপাদনে যুক্ত করতে পারে। সৌরবিদ্যুৎচালিত পানির পাম্প ও অক্সিজেন সরবরাহের যন্ত্র ব্যবহারে জ্বালানি খরচ কমানো সম্ভব। যেখানে বিদ্যুৎ সরবরাহ অনিয়মিত, সেখানে এসব প্রযুক্তি মাছ চাষকে আরও লাভজনক করে তুলতে পারে।
জীবন্ত সম্পদ হিসেবে জলাভূমি
হাওর, বাঁওড় ও বিল একই সঙ্গে মাছ, হাঁস, জলজ উদ্ভিদ ও পর্যটনের সম্ভাবনা তৈরি করে। সঠিক ব্যবস্থাপনায় একটি হাওর বর্ষায় মাছ, শুষ্ক মৌসুমে ধান এবং সারা বছর হাঁস পালনের সুযোগ দিতে পারে। অন্যদিকে, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে পরিচালিত বাঁওড় থেকে অর্জিত আয়ও তাঁদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া সম্ভব।
পানিফল, মাখনা ও শৌখিন মাছ চাষ থেকেও বাড়তি আয় হতে পারে। মাছের প্রজনন ও বংশবিস্তার রক্ষায় অভয়াশ্রম গড়ে তোলা এবং নির্দিষ্ট মৌসুমে মাছ ধরা বন্ধ রাখার ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ। জলাভূমিকে ভরাট করে অন্য কাজে ব্যবহারের অপেক্ষায় থাকা জমি হিসেবে দেখলে চলবে না। এগুলো এমন একেকটি জীবন্ত বাস্তুতন্ত্র, যা উৎপাদন, জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় একসঙ্গে ভূমিকা রাখে।
অভ্যন্তরীণ নৌপথে পণ্য পরিবহনও তুলনামূলক সাশ্রয়ী। নদীর নাব্যতা রক্ষায় পরিকল্পিত খনন এবং আধুনিক নৌটার্মিনাল গড়ে তোলা গেলে পণ্য পরিবহনের ব্যয় কমবে, মহাসড়কের ওপর চাপও হ্রাস পাবে। বর্ষায় নৌকায় রাতযাপন, শীতকালে পাখি দেখা এবং গ্রামের পথে ঘুরে বেড়ানোর মতো পর্যটন আয়োজন এমন অনেক এলাকাতেও দর্শনার্থী টানতে পারে, যেগুলো এখনো প্রচলিত পর্যটন মানচিত্রের বাইরে।
জলাশয় ঘিরে কর্মসংস্থানের বিস্তার
অভ্যন্তরীণ জলাশয়নির্ভর সমুদ্র অর্থনীতি শুধু পুকুরে মাছ চাষের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মাছের খাদ্য উৎপাদনের কারখানা, হ্যাচারি, বরফকল, হিমাগার, প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, প্যাকেটজাতকরণ ও পরিবহনসহ পুরো সরবরাহব্যবস্থায় কর্মসংস্থানের সুযোগ রয়েছে। এসব কাজে নারী ও তরুণদের যুক্ত করা গেলে তাঁদের অনেকেরই কাজের সন্ধানে শহরে পাড়ি দেওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে।
শুকনো ও প্রক্রিয়াজাত মাছ, হিমায়িত মাছ এবং শৌখিন মাছের জন্য দেশের বড় শহর ও বিদেশের বাজারে চাহিদা রয়েছে। তবে সেই বাজারে টিকে থাকতে পণ্যের গুণমান নিশ্চিত করা জরুরি। ডিজিটাল বাণিজ্যিক মাধ্যম ব্যবহার করে উৎপাদকদের সঙ্গে ক্রেতাদের সরাসরি যোগাযোগ তৈরি করা গেলে মধ্যস্বত্বভোগীদের হাতে আয়ের বড় অংশ চলে যাওয়ার প্রবণতাও কমানো সম্ভব।
বাধা দূর করতে প্রয়োজন কার্যকর উদ্যোগ
সম্ভাবনা থাকলেও বাধার অভাব নেই। ট্যানারি ও শিল্পকারখানার বর্জ্য, অপরিশোধিত পয়োনিষ্কাশনের পানি এবং কৃষিতে ব্যবহৃত রাসায়নিক নদীদূষণ বাড়ায় ও মাছের ক্ষতি করে। অবৈধ দখল ও পলি জমে জলাশয়ের আয়তন কমছে। শুষ্ক মৌসুমে অনেক নদীতে পানির প্রবাহও উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পায়।
সরকারি জলমহাল ইজারা দেওয়ার প্রচলিত ব্যবস্থায় অনেক সময় প্রভাবশালী দরদাতারা সুবিধা পান, অথচ যেসব জেলে এসব জলাশয়ের ওপর নির্ভর করে জীবিকা নির্বাহ করেন, তাঁরা বঞ্চিত হন। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে আকস্মিক বন্যা, খরা ও অতিরিক্ত তাপের ঝুঁকিও বাড়ছে। এর সঙ্গে দুর্বল হিমায়ন ও সংরক্ষণব্যবস্থা, ঋণ পাওয়ার সীমিত সুযোগ এবং কারিগরি প্রশিক্ষণের অভাব ছোট উৎপাদকদের অগ্রগতিতে বাধা সৃষ্টি করছে। মাছ চাষে অতিরিক্ত অ্যান্টিবায়োটিক ও রাসায়নিকের ব্যবহার খাদ্যনিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলছে এবং রপ্তানির বাজারেও গ্রহণযোগ্যতা কমাতে পারে। এসব সমস্যা মোকাবিলায় কয়েকটি পদক্ষেপ জরুরি।
প্রথমত, সরকারি জলমহাল ইজারার নীতিতে সংস্কার আনতে হবে, যাতে প্রকৃত জেলে ও তাঁদের সমবায় সমিতিগুলো স্বচ্ছ শর্তে অগ্রাধিকার পায়। দ্বিতীয়ত, দূষণবিরোধী আইন কার্যকরভাবে প্রয়োগ করতে হবে এবং শিল্পবর্জ্য নদীতে ফেলার আগে পরিশোধন নিশ্চিত করতে হবে। অবৈধ দখল উচ্ছেদ, নদী ও জলাভূমির পুনরুদ্ধার এবং সেগুলোর জন্য কার্যকর আইনি সুরক্ষা নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
তৃতীয়ত, গবেষণা, মাঠপর্যায়ের পরামর্শসেবা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। বিশেষ করে নারীদের জন্য প্রশিক্ষণের সুযোগ সম্প্রসারণ করলে উন্নত চাষপদ্ধতি আরও বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে। চতুর্থত, পর্যাপ্ত জামানত না থাকলেও ক্ষুদ্র উৎপাদকদের জন্য সাশ্রয়ী ঋণ ও বীমার ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। এসব সুবিধা এমন ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত করা যেতে পারে, যা দায়িত্বশীল উৎপাদন ও পরিবেশ সুরক্ষাকে উৎসাহিত করে।
পঞ্চমত, উৎপাদন এলাকার কাছাকাছি হিমায়ন, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে, যাতে মাছ নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি ও পরিবহন ব্যয় কমে। সবশেষে, মৎস্য, পানি, পরিবহন ও পর্যটনবিষয়ক সরকারি সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন। কারণ, একটি নদী একই সঙ্গে এসব খাতের প্রয়োজন মেটায়। এক খাতের সিদ্ধান্ত যেন অন্য খাতের ক্ষতির কারণ না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশের সমুদ্র অর্থনীতির বিকাশ শুধু উপকূলের ওপর নির্ভর করতে পারে না। দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয় ইতিমধ্যেই মানুষের খাদ্যের জোগান দিচ্ছে। সঠিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা গেলে এসব জলাশয় আরও বেশি মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি করতে পারে, রপ্তানি আয় বাড়াতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় দেশের সক্ষমতা শক্তিশালী করতে পারে।
একটি হাওর বন্যার পানি ধরে রেখে ভাটির জনপদকে সুরক্ষা দিতে পারে। পুনরুদ্ধার করা একটি বাঁওড় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর পুনরায় পূরণ করতে এবং আশপাশের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করতে পারে। অন্যদিকে, প্রবহমান নদী পলি বহন করে কৃষিজমির উর্বরতা বাড়ায়। এসব পরিবেশগত সেবার মূল্য মাছ বা অন্যান্য জলজ সম্পদ বিক্রি করে পাওয়া আয়ের হিসাবের বাইরে। তাই বাজারদরে জলজ সম্পদের মূল্য যতটা দেখা যায়, অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের প্রকৃত অবদান তার চেয়ে অনেক বেশি।
এই সম্ভাবনা কাজে লাগাতে দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন জরুরি। নদী, হাওর ও পুকুরকে নিষ্কাশন করে ফেলার কিংবা অবহেলায় ফেলে রাখার মতো বাধা হিসেবে না দেখে জীবন্ত সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। পরিকল্পনা প্রণয়নের সময় জলাভূমির পরিবেশগত গুরুত্বকে মূল্য দিতে হবে, সেগুলো সংরক্ষণকারী স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে উৎসাহিত করতে হবে এবং সাফল্যের মাপকাঠি হিসেবে শুধু উদ্ধার করা জমির পরিমাণ নয়, দীর্ঘমেয়াদি উৎপাদন ও পরিবারের আয়কেও গুরুত্ব দিতে হবে।
একই সঙ্গে জেলে সম্প্রদায়, নারী ও তরুণদের পরিকল্পনার কেন্দ্রে রাখতে হবে। কোনো জলাশয়ের ওপর যাঁদের জীবন ও জীবিকা প্রতিদিন নির্ভর করে, সেই জলাশয় রক্ষায় তাঁরাই সবচেয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন, যদি তাঁদের প্রবেশাধিকার ও অধিকার সুরক্ষিত এবং ন্যায্য হয়।
এখনই উদ্যোগ নেওয়ার উপযুক্ত সময়। নিরাপদ, উৎস অনুসরণযোগ্য এবং দায়িত্বশীল পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাছের চাহিদা বাড়ছে। যথাযথ সনদ ও মাননিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সুযোগও বাড়ানো সম্ভব। একই সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তন পানিসম্পদের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনাকে জাতীয় নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে পরিণত করেছে।
বাংলাদেশ যদি এই পরিবর্তনের পথে এগিয়ে যায়, তাহলে সমুদ্র থেকে দূরের জেলাগুলোই দেশের সমুদ্র অর্থনীতির সবচেয়ে সম্ভাবনাময় নতুন ক্ষেত্রগুলোর মধ্যে জায়গা করে নিতে পারে।
