ফারাহ জেহির
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
ইউনিসেফ-সমর্থিত বাংলাদেশের প্রাথমিক শিক্ষা খাতের সাম্প্রতিক এক মূল্যায়ন একটি কাঠামোগত শিখন সংকটকে উন্মোচিত করেছে, যা কেবল স্কুলে ভর্তি বা প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত প্রথাগত উদ্বেগের অনেক ঊর্ধ্বে। প্রাপ্ত ফলাফল অনুযায়ী, পঞ্চম শ্রেণির প্রায় ৯১ শতাংশ শিক্ষার্থী গণিতে এবং ৬৫ শতাংশ বাংলায় ‘শিক্ষানবিশ’ যোগ্যতার স্তরে রয়েছে। এটি ইঙ্গিত দেয় যে, মাধ্যমিক শিক্ষার দ্বারপ্রান্তে থাকা অধিকাংশ শিশু ন্যূনতম শ্রেণি-উপযোগী দক্ষতা প্রদর্শনেও অক্ষম। এই পরিসংখ্যানগুলো কেবল দুর্বল পরীক্ষার ফলাফলকেই নির্দেশ করে না, বরং শিক্ষার সবচেয়ে গঠনমূলক বছরগুলোতে মৌলিক সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যর্থতাকেও তুলে ধরে।
বাংলাদেশ স্কুলে ভর্তির হার বৃদ্ধি, লিঙ্গ বৈষম্য হ্রাস এবং গ্রামীণ অঞ্চলে শিক্ষাগত অবকাঠামো বিস্তারে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত অগ্রগতি অর্জন করলেও, বর্তমান তথ্য একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত বৈপরীত্যকে স্পষ্ট করে তুলেছে: শিক্ষার গুণগত মানের তুলনায় স্কুলে অংশগ্রহণের হার অনেক বেশি দ্রুতগতিতে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানবসম্পদ উন্নয়নের অর্থবহ সূচক হিসেবে কেবল শিক্ষাগত সুযোগ বা প্রবেশাধিকার যথেষ্ট নয়, যদি শিক্ষার্থীরা পাঠ অনুধাবন, লিখিত প্রকাশ এবং গাণিতিক যুক্তির মতো মৌলিক দক্ষতাগুলো অর্জন না করেই প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করে।
দুর্বল মৌলিক শিখনের এই ধারাবাহিকতা কোনো বিচ্ছিন্ন কোভিড-পরবর্তী ঘটনা নয়। বহু বছর ধরে পরিচালিত ‘জাতীয় শিক্ষার্থী মূল্যায়ন’ প্রাথমিক স্তরের অর্জনে ক্রমাগত ঘাটতিগুলো প্রকাশ করে আসছে। তবে কোভিড-১৯ মহামারি শিক্ষাদানের ধারাবাহিকতা ব্যাহত করে, ডিজিটাল শিখন উপকরণের সুযোগ সীমিত করে এবং শহর-গ্রাম ও আর্থ-সামাজিক সক্ষমতার ভিত্তিতে বিদ্যমান বৈষম্যকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে। দীর্ঘস্থায়ী স্কুল বন্ধের ফলে সৃষ্ট ‘শিখন ক্ষতি’ নতুন কোনো দুর্বলতা তৈরির চেয়ে বরং পূর্বের দুর্বলতাগুলোকেই আরও ঘনীভূত করেছে।
এই ঘাটতিগুলোর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। তুলনামূলক শিক্ষা ব্যবস্থা সংক্রান্ত গবেষণাগুলো দেখায় যে, যেসব শিশু প্রাথমিক স্তরের শুরুতে মৌলিক সাক্ষরতা ও গাণিতিক দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হয়, পরবর্তী শ্রেণিগুলোতে তাদের একাডেমিক পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা অনেক কমে যায়। পাঠ্যক্রম ক্রমশ বিমূর্ত ও উচ্চতর বুদ্ধিবৃত্তিক চাহিদাসম্পন্ন হওয়ার ফলে, অমীমাংসিত শিখন ঘাটতিগুলো পুঞ্জীভূত হয়ে দীর্ঘমেয়াদী শিক্ষাগত বর্জনের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ফলস্বরূপ, প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরে উত্তীর্ণ হওয়া কেবল একটি দাপ্তরিক বা প্রশাসনিক বিষয়ে পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়, যেখানে প্রকৃত দক্ষতার কোনো প্রতিফলন থাকে না।
বেশ কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা এই সংকটকে আরও গভীর করছে। বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থা এখনো ব্যাপকভাবে পরীক্ষা-কেন্দ্রিক রয়ে গেছে, যেখানে পাঠদান প্রক্রিয়া প্রায়শই মুখস্থ বিদ্যা, পাঠ্যবইয়ের হুবহু পুনরুৎপাদন এবং প্রক্রিয়াগত স্মৃতির ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয়; ধারণাভিত্তিক বা বোধগম্য শিখন এখানে গৌণ। মূল্যায়ন কাঠামো অনেক সময় বিশ্লেষণী যুক্তি বা ব্যবহারিক সমস্যা সমাধানের দক্ষতার পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদী তথ্য ধারণক্ষমতাকে পুরস্কৃত করে। এর ফলে, শিক্ষার্থীরা মৌলিক বিষয়গুলোতে প্রকৃত দক্ষতা অর্জন না করেই পরবর্তী শ্রেণিতে উন্নীত হয়।
শ্রেণিকক্ষের সক্ষমতার চ্যালেঞ্জটিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। অনেক শিক্ষক জনাকীর্ণ পরিবেশে পর্যাপ্ত শিক্ষাগত সহায়তা ও বৈচিত্র্যপূর্ণ শিখন পদ্ধতির প্রশিক্ষণের অভাব এবং প্রতিকারমূলক শিখন উপকরণের সীমাবদ্ধতা নিয়ে কাজ করছেন। প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার্থীদের জন্য কোনো পদ্ধতিগত ডায়াগনস্টিক মূল্যায়নের অভাব থাকায়, পিছিয়ে পড়া শিক্ষার্থীদের ঘাটতিগুলো স্থায়ী হওয়ার আগেই তাদের শনাক্ত করার সুযোগ হ্রাস পাচ্ছে। অনেক সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় শিক্ষকদের অনিয়মিত উপস্থিতি, অভিভাবকদের নিরক্ষরতা, দুর্বল তদারকি ব্যবস্থা এবং প্রাক-প্রাথমিক প্রস্তুতির অভাবও শিখনের ধারাবাহিকতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
এই সংকট মোকাবিলায় এমন নীতিগত পদক্ষেপ প্রয়োজন যা কেবল স্বল্পমেয়াদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচির মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে না। প্রথমত, শিক্ষা খাতে সরকারি ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করতে হবে এবং সেই সঙ্গে বাজেট ব্যবহারের দক্ষতা নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশ এখনো দক্ষিণ এশিয়ায় জিডিপি-র অনুপাতে শিক্ষার জন্য সর্বনিম্ন বরাদ্দকারী দেশগুলোর একটি। দ্বিতীয়ত, পাঠ্যক্রম সংস্কারের ক্ষেত্রে কেবল বিষয়বস্তু মুখস্থ করার পরিবর্তে দক্ষতা-ভিত্তিক শিখন, সৃজনশীল চিন্তন এবং বাস্তব প্রয়োগকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তৃতীয়ত, শিক্ষক উন্নয়ন কর্মসূচিগুলোকে হতে হবে নিরবচ্ছিন্ন, অনুশীলন-নির্ভর এবং সরাসরি শ্রেণিকক্ষের পাঠদানের সাথে সম্পর্কিত। চতুর্থত, গ্রামীণ ও প্রান্তিক জেলাগুলোতে, যেখানে ‘শিখন দারিদ্র্য’ সবচেয়ে বেশি, সেখানে জরুরি ও লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।সর্বোপরি, শিক্ষা সংস্কার হতে হবে দাপ্তরিক সুবিধার পরিবর্তে তথ্য-প্রমাণ নির্ভর নীতি প্রণয়নের ওপর ভিত্তি করে। মৌলিক শিখন পুনরুদ্ধারে টেকসই প্রাতিষ্ঠানিক প্রতিশ্রুতি ছাড়া বাংলাদেশ এমন এক প্রজন্ম তৈরির ঝুঁকিতে পড়বে, যারা কাগজে-কলমে বছরের পর বছর স্কুলে কাটালেও উচ্চতর শিক্ষা, উৎপাদনশীল কর্মসংস্থান এবং অর্থবহ সামাজিক অংশগ্রহণের জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষতা থেকে বঞ্চিত থাকবে।
