নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়েছে ফলে স্বভাবিকভাবেই বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। এই জনগোষ্ঠীর অন্যান্য রোগ এবং জটিলতার পাশাপাশি পাল্লা দিয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে বয়সজনিত চক্ষুরোগ এবং দৃষ্টিহীনতার ঝুঁকি। অথচ দেশের বিদ্যমান স্বাস্থ্যব্যবস্থা এখনো প্রবীণদের চক্ষু চিকিৎসার প্রয়োজনীয়তা পূরণে যথেষ্ট প্রস্তুত নয়। ফলে লাখো মানুষ এমন সব রোগে দৃষ্টিশক্তি হারাচ্ছেন, যেগুলোর অধিকাংশই সময়মতো চিকিৎসার মাধ্যমে প্রতিরোধ বা নিরাময় করা সম্ভব। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণদের জন্য সহজলভ্য, সাশ্রয়ী ও সমতাভিত্তিক চক্ষু চিকিৎসা নিশ্চিত করা এখন বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। যে কোন বিষয় নিয়ে আলোচনার শুরুতেই তার বর্তমান অবস্থা জানা জরুরী। তাই আসুন শুরুতেই জেনে নেই বাংলাদেশের চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোতে বর্তমানে প্রবীণদের চোখের চিকিৎসার কতটুকু ব্যবস্থা রয়েছে এবং তা যথেষ্ট কিনা। আরও জেনে নেই কোন কোন সমস্যা এবং জটিলতায় প্রবীণদের চোখের স্বাস্থ্যসেবা বিঘ্নিত হচ্ছে।
প্রবীণদের চক্ষু স্বাস্থ্য: বর্তমান বাস্তবতা
বাংলাদেশে অন্ধত্বের প্রধান কারণ হলো ছানি (Cataract)। জাতীয় জরিপ অনুযায়ী, দ্বিপাক্ষিক অন্ধত্বের প্রায় ৭৯.৬ শতাংশের জন্য দায়ী এই রোগ। দেশে ৩০ বছর বা তদূর্ধ্ব বয়সী প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার অন্ধ ব্যক্তির অধিকাংশই অপারেশনের মাধ্যমে চিকিৎসাযোগ্য ছানিতে আক্রান্ত। তবে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রয়োজনীয় ছানি অপারেশনের আওতায় আসতে পারছেন মাত্র ৩২.৫ শতাংশ রোগী। অর্থাৎ, প্রতি তিনজন রোগীর মধ্যে প্রায় দুইজন চিকিৎসা সুবিধা থেকে বঞ্চিত থাকছেন। বরিশাল বিভাগে এ সেবার প্রাপ্তি সবচেয়ে কম। বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে অন্ধত্ব ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধিতার ঝুঁকি বাড়লেও নারী, গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, নিরক্ষর ব্যক্তি এবং শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। পরিসংখ্যান বলছে, পুরুষদের তুলনায় নারীদের মধ্যে অন্ধত্বের হার উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও সেবার সীমাবদ্ধতা
চক্ষু চিকিৎসা ব্যবস্থার অন্যতম বড় সমস্যা হলো সেবার কেন্দ্রীকরণ। গ্রামীণ পর্যায়ে কমিউনিটি ক্লিনিক বা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কার্যকর চক্ষু চিকিৎসা ব্যবস্থা প্রায় নেই বললেই চলে। অধিকাংশ সেবা সীমাবদ্ধ জেলা শহরভিত্তিক হাসপাতালগুলোতে। অনেক জেলা হাসপাতালের চক্ষু বিভাগে প্রয়োজনীয় পরীক্ষার যন্ত্রপাতি ও আধুনিক মাইক্রোসার্জারির সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। ১৭ কোটিরও বেশি মানুষের দেশে চক্ষু বিশেষজ্ঞ রয়েছেন মাত্র প্রায় ৬২৬ জন এবং মধ্যম পর্যায়ের চক্ষু সেবাকর্মী প্রায় ৬১৮ জন। চক্ষু রোগীদের জন্য হাসপাতাল শয্যার সংখ্যা মাত্র ২,৮২২। অন্যদিকে গ্লুকোমা, রেটিনাজনিত রোগ কিংবা বয়সজনিত ম্যাকুলার ডিজেনারেশনের মতো জটিল রোগের চিকিৎসা প্রধানত ঢাকা ও চট্টগ্রামকেন্দ্রিক। ফলে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের রোগীদের উন্নত চিকিৎসার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিতে হয়।
অর্থনৈতিক ও ভৌগোলিক প্রতিবন্ধকতা
বাংলাদেশে স্বাস্থ্য ব্যয়ের ৯০ শতাংশেরও বেশি নাগরিকদের নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করতে হয়। সার্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা না থাকায় প্রবীণ নাগরিকদের নিবন্ধন, চিকিৎসক ফি, ওষুধ, অপারেশন, চশমা, যাতায়াত, খাদ্য ও আবাসনের ব্যয় নিজেকেই বহন করতে হয়।
এক গবেষণায় দেখা গেছে, ৩৮ শতাংশ মানুষ কখনো চক্ষু চিকিৎসা নেননি এবং তাদের মধ্যে ৪৫ শতাংশের প্রধান কারণ ছিল আর্থিক অক্ষমতা। বিশেষ করে নারী, গ্রামীণ ও নিরক্ষর জনগোষ্ঠী অপারেশনের পর প্রয়োজনীয় চশমা পাওয়ার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছেন। ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতাও বড় সমস্যা। তৃতীয় স্তরের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা নিতে বহির্বিভাগের প্রায় ৭৪ শতাংশ এবং অপারেশন-পরবর্তী রোগীদের ৮৩ শতাংশকে গড়ে ৬৭ কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতে হয়। সরকারি তৃতীয় স্তরের চক্ষু হাসপাতাল মাত্র দুটি, একটি ঢাকায় এবং অন্যটি গোপালগঞ্জে। ফলে জটিল রোগে আক্রান্ত প্রবীণদের জন্য চিকিৎসা গ্রহণ অনেক সময় কষ্টসাধ্য, ব্যয়বহুল এবং বর্ষাকালে প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
প্রয়োজনীয় সংস্কার:
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য কার্যকর ও সমতাভিত্তিক চক্ষু চিকিৎসা নিশ্চিত করতে বেশ কয়েকটি মৌলিক সংস্কার জরুরি যেগুলো কার্যকরভাবেই দৃশ্যমান পরিস্থিতির আশাব্যঞ্জক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রথমত, চক্ষু চিকিৎসা, চশমা ও সাধারণ অপারেশন অন্তর্ভুক্ত করে সার্বজনীন স্বাস্থ্যবিমা বা আর্থিক সুরক্ষা কর্মসূচি চালু করতে হবে। দ্বিতীয়ত, উপজেলা পর্যায়ে স্থায়ী চক্ষু ইউনিট গড়ে তুলে প্রশিক্ষিত জনবল নিয়োগের মাধ্যমে প্রাথমিক চক্ষু সেবা সম্প্রসারণ করতে হবে। তৃতীয়ত, দুর্গম ও অনুন্নত এলাকায় স্যাটেলাইট চক্ষু ক্লিনিক চালুর মাধ্যমে নিয়মিত বিশেষজ্ঞ সেবা পৌঁছে দিতে হবে।
চতুর্থত, টেলি-অপথালমোলজি (Tele-Ophthalmology) ব্যবস্থার মাধ্যমে দূরবর্তী অঞ্চলের রোগীদের স্ক্রিনিং ও বিশেষজ্ঞ পরামর্শ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পঞ্চমত, গ্রামীণ ও সুবিধাবঞ্চিত এলাকায় কর্মরত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ও সেবাকর্মীদের জন্য বিশেষ আর্থিক প্রণোদনা চালু করা যেতে পারে। ষষ্ঠত, দরিদ্র প্রবীণ রোগীদের জন্য যাতায়াত ভাতা বা পরিবহন সহায়তা চালু করা জরুরি, যাতে অর্থের অভাবে চিকিৎসা গ্রহণ থেকে তারা বিরত না থাকেন।
সপ্তমত, ছানি অপারেশনের পর পুনর্বাসন সেবা জোরদার করতে হবে। প্রতিটি রোগীকে সাশ্রয়ী মূল্যে বা বিনামূল্যে চশমা প্রদান এবং নিয়মিত ফলো-আপ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। অষ্টমত, গ্লুকোমা, রেটিনা ও কর্নিয়া চিকিৎসাসহ বিশেষায়িত চক্ষু সেবাকে ঢাকা ও চট্টগ্রামের বাইরে আঞ্চলিক মেডিকেল কলেজ হাসপাতালগুলোতে সম্প্রসারণ করতে হবে।
নবমত, ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব নাগরিকদের জন্য জাতীয় পর্যায়ে জেরিয়াট্রিক (Geriatric) চক্ষু স্বাস্থ্য কর্মসূচি চালু করে নারী ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। দশমত, চক্ষু খাতে সরকারি বাজেট বৃদ্ধি, আধুনিক যন্ত্রপাতি সরবরাহ, হাসপাতাল শয্যা বৃদ্ধি এবং দক্ষ জনবল তৈরিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।
উপসংহার
দৃষ্টিশক্তি মানুষের অধিকার ও জীবনমানের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অথচ বাংলাদেশে লাখো প্রবীণ নাগরিক এখনো প্রতিরোধযোগ্য ও চিকিৎসাযোগ্য রোগের ক্ষেত্রেও অন্ধত্বের শিকার। আর্থিক অসাম্য, অবকাঠামোগত দুর্বলতা এবং সেবার ভৌগোলিক বৈষম্য তাদের মৌলিক স্বাস্থ্য অধিকারকে সীমিত করে রেখেছে। প্রবীণদের চক্ষু স্বাস্থ্যকে জাতীয় উন্নয়ন ও মানবিক কল্যাণের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করে প্রয়োজনীয় সংস্কার বাস্তবায়ন করা গেলে অন্ধত্বের বোঝা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। ন্যায়সঙ্গত ও সার্বজনীন স্বাস্থ্যব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য প্রবীণ নাগরিকদের দৃষ্টিশক্তি রক্ষা আর পিছিয়ে থাকার বিষয় নয়; এটি এখন সময়ের দাবি।
