মিও ওকালিন্দে
মালায়া বিশ্ববিদ্যালয়
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। দেশটি জাতিসংঘের স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতি কমিটির সুপারিশের পর বর্তমানে ধারণা করা হচ্ছে, ২০২৯ সালের নভেম্বর নাগাদ বাংলাদেশ এই তালিকা থেকে বেরিয়ে আসবে। একই সময়ে ২০৩০ সালের মধ্যে জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কাজও এগিয়ে চলছে।
বিশ্বব্যাংকের ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার মডেলভিত্তিক হিসাব অনুযায়ী, দেশের মোট কর্মশক্তির ৪৪ শতাংশের বেশি এখনো কৃষির সঙ্গে যুক্ত। অথচ ২০২৪ সালে মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষির অবদান ছিল মাত্র ১১ দশমিক ১৬ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশের এই দুই জাতীয় ও আন্তর্জাতিক লক্ষ্য যেখানে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে এক জায়গায় মিলিত হয়েছে, আবার যেখানে তাদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বৈপরীত্যও দেখা যাচ্ছে, সেই ক্ষেত্রটি হলো কৃষি। এই নিবন্ধে সেই চ্যালেঞ্জই বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশের কৃষির বর্তমান অবস্থান
গত তিন দশকে বাংলাদেশের খাদ্য উৎপাদনে যে অগ্রগতি হয়েছে, তা যেমন উদ্যাপনের দাবি রাখে, তেমনি গভীর পর্যালোচনারও প্রয়োজন রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় কৃষিনীতি ও খাদ্যনীতির অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল ধানে স্বয়ংসম্পূর্ণতা। সামগ্রিক উৎপাদনের বিচারে সেই লক্ষ্য অর্জিত হলেও শুধু মোট উৎপাদন দিয়ে মানুষের প্রকৃত খাদ্যনিরাপত্তা পরিমাপ করা যায় না।
বিশ্ব ক্ষুধা সূচকের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৯০ সালে বাংলাদেশের অপুষ্টির হার ছিল ৩২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা ২০২৩ সালে কমে ১১ দশমিক ৪ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। ২০২৫ সালের বিশ্ব ক্ষুধা সূচকে বাংলাদেশের স্কোর ১৯ দশমিক ২। ১২৩টি দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ৮৫তম। ২০০০ সালে বাংলাদেশের স্কোর ছিল ৩৪ দশমিক ৬। অর্থাৎ উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এখনো ‘মাঝারি মাত্রার ক্ষুধা’ শ্রেণিতে রয়েছে, ‘কম মাত্রার ক্ষুধা’ শ্রেণিতে নয়।
শিশুদের খর্বাকৃতি বা বয়সের তুলনায় কম উচ্চতার হারও ২০০৪ সালের ৫১ শতাংশ থেকে ২০১৮ সালের দিকে প্রায় ৩১ শতাংশে নেমে এসেছে। অর্থাৎ দুই দশক পরও প্রায় প্রতি তিনজন শিশুর একজন খর্বাকৃতির সমস্যায় ভুগছে। বাংলাদেশকে ‘স্বল্পোন্নত দেশগুলোর মধ্যে তুলনামূলকভাবে ভালো করছে’ বলে যে মূল্যায়ন করা হয়, তা অনেকাংশে বাংলাদেশের সাফল্যের চেয়ে স্বল্পোন্নত দেশগুলোর সামগ্রিক দুর্বল অবস্থার কথাই বেশি তুলে ধরে।
তবে এসব ইতিবাচক পরিসংখ্যানের আড়ালে এমন কিছু কাঠামোগত দুর্বলতা রয়েছে, যা সামগ্রিক উৎপাদনের হিসাব দিয়ে বোঝা যায় না। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় ২১ দশমিক ৯১ শতাংশ পরিবার মাঝারি মাত্রার খাদ্যনিরাপত্তাহীনতায় রয়েছে এবং শূন্য দশমিক ৮৩ শতাংশ পরিবার গুরুতর খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মুখোমুখি। অর্থাৎ প্রায় প্রতি পাঁচটি পরিবারের একটি নিয়মিতভাবে পর্যাপ্ত খাদ্য পাওয়ার নিশ্চয়তা থেকে বঞ্চিত।
খাদ্যনিরাপত্তাকে শুধু খাদ্যের প্রাপ্যতা দিয়ে নয়, বরং মানুষের খাদ্যে প্রবেশাধিকার ও তার যথাযথ ব্যবহারের ভিত্তিতে পরিমাপ করলে দেখা যায়, দেশের প্রায় ৩৫ শতাংশ মানুষ নির্ধারিত মানদণ্ডের নিচে রয়েছে। ফলে শুধু খাদ্য উৎপাদনের পরিমাণকে পুষ্টিকল্যাণের সূচক হিসেবে ব্যবহার করার সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কৃষির প্রবৃদ্ধির গতি কমেছে এবং মোট দেশজ উৎপাদনে কৃষির অংশও ক্রমাগত হ্রাস পাচ্ছে। অথচ একই সময়ে কৃষিতে কর্মরত মানুষের অনুপাত উল্টো বেড়েছে। ২০১৬ অর্থবছরে কৃষিতে কর্মরত মানুষের হার ছিল ৪০ দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২৪ সালে বেড়ে প্রায় ৪৪ দশমিক ৭ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
এটি গ্রামীণ অর্থনীতির প্রাণবন্ততার লক্ষণ নয়। বরং এর অর্থ হলো, অকৃষি খাত পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করতে না পারায় মানুষ আবার কৃষির দিকে ফিরে যাচ্ছে। এই বাধ্যতামূলক প্রত্যাবর্তন কৃষিতে শ্রমের অতিরিক্ত চাপ তৈরি করছে, অথচ পরিসংখ্যানে তা কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মতো দেখাচ্ছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২-এর মূল উদ্দেশ্য হলো ক্ষুধার অবসান, খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, পুষ্টির উন্নয়ন এবং টেকসই কৃষির প্রসার ঘটানো।বাংলাদেশ জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনার বিভিন্ন কাঠামোর সঙ্গে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রাগুলোকে যুক্ত করেছে। এর মধ্যে রয়েছে রূপকল্প ২০৪০ এবং বিভিন্ন মেয়াদি পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা। কৃষিপণ্য ও খাদ্যভিত্তিক মূল্যশৃঙ্খলে বৈচিত্র্য, খাদ্যনিরাপত্তা, উদ্যোক্তা সৃষ্টি এবং দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা বাড়াতে সরকারের অংশীদার প্রকল্প চালু হয়েছে। টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২ অর্জনে এখন পর্যন্ত এটি সরকারের অন্যতম উচ্চাভিলাষী প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ।
তবে তথ্য বলছে, টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২-এর কয়েকটি ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অগ্রগতি এখনো অসম। খাদ্যতালিকায় বৈচিত্র্যের অভাব তার অন্যতম উদাহরণ। কৃষিজমির প্রায় ৮০ শতাংশে ধান চাষ হয় এবং দেশের মোট ক্যালরি গ্রহণের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ আসে চাল থেকে। ফলে ডাল, তেলবীজ, ফলমূল ও শাকসবজির উৎপাদন এবং খাদ্যতালিকায় অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম।
অনেক অঞ্চলে মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ ১ শতাংশের নিচে নেমে গেছে। সাম্প্রতিক কৃষিবিষয়ক পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, ব্যবহৃত কীটনাশকের ৯৫ শতাংশের বেশি মাটির উপকারী অণুজীবের ক্ষতি করে। বিশ্বব্যাংকও ফসলের বৈচিত্র্য আনাকে বাংলাদেশের কৃষি খাতের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে চিহ্নিত করেছে। বাস্তবে এই বৈচিত্র্য আনার গতি প্রয়োজনের তুলনায় অনেক ধীর।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ ও কৃষির ঝুঁকি
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের পর বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সহায়তা সুবিধা হারাবে। এর মধ্যে রয়েছে অগ্রাধিকারমূলক বাজারসুবিধা এবং সহজ শর্তের অর্থায়ন। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে খাদ্যনিরাপত্তা, সার আমদানি এবং সংকট মোকাবিলায় বিশ্বব্যাংকের ১১০ কোটি মার্কিন ডলারের অনুমোদন দেখিয়ে দেয়, বর্তমানে বাংলাদেশ কী ধরনের আন্তর্জাতিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে পারে। উত্তরণের পর এ ধরনের সহায়তা পাওয়া আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
চামড়া, পাট ও প্রক্রিয়াজাত পণ্যের মতো কৃষি ও কৃষিভিত্তিক রপ্তানি পণ্য নগদ প্রণোদনা হারাবে। একই সঙ্গে প্রায় ৬ দশমিক ৭ শতাংশ পর্যন্ত শুল্ক বৃদ্ধির মুখোমুখি হতে পারে এবং রপ্তানি আয় প্রায় ৮ দশমিক ৭ শতাংশ কমে যেতে পারে। এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে জলবায়ু ঝুঁকি। বন্যা, লবণাক্ততা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো দুর্যোগের কারণে ইতোমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কৃষিকে আরও বেশি স্থিতিস্থাপকতা অর্জন করতে হবে। উপকূলীয় অঞ্চলের প্রায় ৮ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ এই ঝুঁকির সরাসরি প্রভাবের মধ্যে রয়েছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে জরুরি সংস্কার
বাংলাদেশের সামনে এগিয়ে যাওয়ার পথ শুরু হওয়া উচিত কৃষিতে ভর্তুকি বণ্টনের পদ্ধতি পুনর্বিবেচনার মধ্য দিয়ে। দীর্ঘদিন ধরে ধানকেন্দ্রিক কৃষিনীতি ধানের একফসলি চাষকে উৎসাহিত করেছে, যার ফলে ডাল, তেলবীজ, ফলমূল ও শাকসবজির মতো পুষ্টিকর ফসল পিছিয়ে পড়েছে। অধান ফসলের জন্য মানসম্মত বীজব্যবস্থা এবং উত্তম কৃষিচর্চা সনদে ভর্তুকি ও অন্যান্য সম্পদ পুনর্বিন্যাস করা গেলে পুষ্টির উন্নতির পাশাপাশি মাটির গুণমান পুনরুদ্ধারেও গতি আসতে পারে।
এর পাশাপাশি জমির বাজারকে আনুষ্ঠানিক কাঠামোর আওতায় আনা জরুরি। অনানুষ্ঠানিকভাবে জমি ইজারা দেওয়া এবং ক্রমাগত জমি খণ্ডিত হয়ে পড়া কৃষির উৎপাদনশীলতার বড় বাধাগুলোর মধ্যে রয়েছে। স্বচ্ছ ও ডিজিটালভাবে নিবন্ধিত ইজারা ব্যবস্থা মালিকানা হস্তান্তর ছাড়াই বড় পরিসরে জমি ব্যবহারের সুযোগ তৈরি করতে পারে।
অবকাঠামোগত ঘাটতিও এসব সমস্যাকে আরও গভীর করছে। পর্যাপ্ত হিমাগার, পরিবহন ও সংরক্ষণব্যবস্থা এবং খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় ফসল কাটার পর বিপুল পরিমাণ মূল্য নষ্ট হয়। এর ফলে অধিকাংশ ক্ষুদ্র কৃষকের কাছে ধানের বাইরে অন্য ফসলে বৈচিত্র্য আনা অর্থনৈতিকভাবে আকর্ষণীয় হয়ে ওঠে না।
কৃষি সম্প্রসারণ সেবার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। উন্নত কৃষিচর্চা গ্রহণের হার কম এবং কৃষকদের সংগঠিত করার কার্যকর ব্যবস্থা সীমিত। ফলে কৃষকেরা প্রয়োজনীয় পরামর্শ, অর্থায়ন ও বাজারের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। অংশীদার প্রকল্পের আওতায় কৃষক স্মার্ট কার্ড ব্যবস্থার মতো ডিজিটাল উদ্যোগ এবং সমবায় কাঠামো সম্প্রসারণ করা গেলে এই ব্যবধান অনেকটাই কমানো সম্ভব।
এর পাশাপাশি প্রতিটি কৃষি বিনিয়োগে জলবায়ু সহনশীলতা ও পুষ্টিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। মাটির জৈব পদার্থের পরিমাণ যেখানে ১ শতাংশের নিচে এবং জলবায়ু ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে, সেখানে কৃষি কর্মসূচিতে জলবায়ু সহনশীল জাত, সাশ্রয়ী ও দক্ষ সেচব্যবস্থা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় কার্যকর বীমা অন্তর্ভুক্ত করা প্রয়োজন।
সবশেষে, বাংলাদেশের কৃষিকে শুধু ক্যালরির চাহিদা পূরণের পর্যায় থেকে বেরিয়ে সুষম ও পর্যাপ্ত পুষ্টি নিশ্চিত করার পর্যায়ে নিয়ে যেতে হবে। এর জন্য কৃষি, স্বাস্থ্য এবং সামাজিক সুরক্ষা খাতের মধ্যে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। পাশাপাশি শুধু নির্দিষ্ট সময় পরপর পরিচালিত জরিপের ওপর নির্ভর না করে খাদ্য গ্রহণের পরিস্থিতি সম্পর্কে নিয়মিত ও তাৎক্ষণিক তথ্য সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
এসব সংস্কার ছাড়া স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ শেষ পর্যন্ত একটি পরিসংখ্যানগত মাইলফলক হয়েই থাকতে পারে, কাঠামোগত পরিবর্তন হয়ে উঠবে না। আর সেই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে কৃষি খাতকে এবং সেই ৪৪ শতাংশের বেশি কর্মজীবী মানুষকে, যাদের এমন একটি রূপান্তরের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি এখনো যথেষ্ট নয়।
তথ্য
