ড. এ. খান
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
জাতীয় খাদ্যসংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে মসলা আজ বাংলাদেশের একটি গতিশীল, বহুমাত্রিক এবং কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বাজারে পরিণত হয়েছে। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যা, দ্রুত নগরায়ণ, আয়ের পরিবর্তন, ভোক্তাদের রুচির বিবর্তন এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের উল্লেখযোগ্য সম্প্রসারণ দেশের মসলার চাহিদাকে নতুনভাবে সংজ্ঞায়িত করেছে। ফলে বাংলাদেশের মসলা বাজার এখন একই সঙ্গে অভ্যন্তরীণ ভোগ, কৃষি উৎপাদন এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মতো একাধিক উপাদানের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ বর্তমানে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম মসলা ভোক্তা দেশ। দেশে বছরে প্রায় ১৩ লাখ টন মসলা ব্যবহৃত হয় এবং উৎপাদিত হয় প্রায় ৬ লাখ টন, যা বাংলাদেশকে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম মসলা উৎপাদনকারী দেশের অবস্থানে নিয়ে এসেছে। অভ্যন্তরীণ চাহিদা ও উৎপাদনের এই ব্যবধান সারা বছর মসলার প্রাপ্যতা নিশ্চিত করা, গুণগত মান বজায় রাখা এবং মূল্য স্থিতিশীল রাখার ক্ষেত্রে আমদানির গুরুত্বকে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে।
দেশে ব্যবহৃত অসংখ্য মসলার মধ্যে মরিচ, পেঁয়াজ, রসুন, আদা, হলুদ, জিরা, ধনিয়া, দারুচিনি, লবঙ্গ এবং এলাচ আমদানির ক্ষেত্রে প্রধান স্থান দখল করে আছে। এসব মসলার কিছু দেশে উৎপাদিত হলেও জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এবং খণ্ডিত কৃষি ব্যবস্থার কারণে উৎপাদন সবসময় স্থিতিশীল থাকে না, ফলে আমদানির প্রয়োজন দেখা দেয়। একই সঙ্গে মুদ্রার বিনিময়মূল্যজনিত ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরবরাহ ব্যবস্থার বিঘ্নও এসব মসলার আমদানিকে প্রভাবিত করে।
প্রতি বছর ১৩ দশমিক ৫৪ লাখ টন মসলার ঘাটতি এবং ৮ হাজার থেকে ৯ হাজার কোটি টাকার আমদানি ব্যয়ের চাপের কারণে সরকার ও বেসরকারি বিনিয়োগকারীরা দেশীয় মসলা চাষের পরিসর দ্রুত সম্প্রসারণে কাজ করছে। আমদানিনির্ভরতা কমাতে সরকার বহুমুখী উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। মসলা আমদানি কমানোর লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় কাঠামোগত ও আর্থিক সংস্কার মূলত তিনটি ক্ষেত্রে কেন্দ্রীভূত হয়েছে: (i) কৃষি সংস্কার, (ii) আর্থিক ও বাণিজ্য নীতি, এবং (iii) বাজার তদারকি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা।
কৃষি সংস্কার
উচ্চফলনশীল ও উন্নতমানের বীজ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সরকার গবেষণা ও উন্নয়ন কার্যক্রম জোরদার করেছে। আদা, হলুদ, রসুন এবং মরিচের মতো গুরুত্বপূর্ণ ফসলের জন্য উচ্চফলনশীল ও রোগপ্রতিরোধী জাত উদ্ভাবনে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বগুড়া মসলা গবেষণা কেন্দ্র স্থানীয় কৃষি ও জলবায়ু পরিবেশের উপযোগী ৫৮টি বিশেষায়িত মসলার জাত উদ্ভাবন করেছে। পেঁয়াজের ক্ষেত্রে বারি পেঁয়াজ-৪ ও বারি পেঁয়াজ-৬ জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে, যা শীত ও গ্রীষ্ম উভয় মৌসুমের জন্য উপযোগী এবং মৌসুমবহির্ভূত সরবরাহ সংকট মোকাবিলায় সহায়ক। মরিচের ক্ষেত্রে বিনামরিচ-২ এবং ইন্ডোসিএফ-২৫ উচ্চ ঝাল, রোগপ্রতিরোধী ও বাণিজ্যিক উৎপাদন উপযোগী সংকর জাত হিসেবে পরিচিত। একসময় দেশে জিরা চাষকে প্রায় অসম্ভব মনে করা হতো, অথচ বর্তমানে ১৭টি জেলায় বাণিজ্যিকভাবে জিরা উৎপাদন হচ্ছে এবং অনেক ক্ষেত্রে তা প্রচলিত ধান চাষের তুলনায় চার গুণ পর্যন্ত বেশি মুনাফা দিচ্ছে।
কাঠামোবদ্ধ ও অপ্রচলিত কৃষি পদ্ধতিও দ্রুত সম্প্রসারিত হচ্ছে। কুষ্টিয়ার বারিয়া এলাকার “মসলার গ্রাম”-এ জিও ব্যাগ ব্যবহার করে নিবিড়ভাবে আদা ও হলুদ চাষের মাধ্যমে পতিত জমির অপচয় শূন্যে নামিয়ে আনার চেষ্টা চলছে। পার্বত্য চট্টগ্রামের বান্দরবান ও রুমা অঞ্চলে স্বল্পফলনশীল জুম চাষ থেকে সরে এসে অধিক লাভজনক গোলমরিচ ও আদা উৎপাদনভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার দিকে অগ্রসর হওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি কৃষি প্রণোদনা প্যাকেজ চালু করেছে, যার মাধ্যমে প্রকৃত কৃষক এবং নতুন কৃষি উদ্যোক্তারা সহজ শর্তে ঋণ, ভর্তুকি এবং অর্থায়নের সুযোগ পাচ্ছেন। একই সঙ্গে বছরে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকার দেশীয় মসলা বাজারের চাহিদা পূরণের লক্ষ্যে সীমিত অঞ্চলের বাইরে সম্ভাবনাময় এলাকাগুলোতে বাণিজ্যিক চাষ সম্প্রসারণ করা হচ্ছে।
চুক্তিভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থার আওতায় বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলো জমি ইজারা নিচ্ছে অথবা ক্ষুদ্র কৃষকদের অর্থায়নের মাধ্যমে উন্নতমানের বীজ সরবরাহ করছে এবং উৎপাদিত ফসল ক্রয়ের নিশ্চয়তা দিচ্ছে। এর ফলে প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্পের জন্য কাঁচামালের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত হচ্ছে। সরকারও ক্ষুদ্র কৃষকদের জন্য সম্প্রদায়ভিত্তিক কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তুলতে এ ধরনের উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারে।
আর্থিক ও বাণিজ্য নীতি
২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটের পর সরকার সব ধরনের মসলার ওপর আরোপিত ৫ শতাংশ নিয়ন্ত্রক শুল্ক প্রত্যাহার করেছে। এর ফলে কাঁচামাল আমদানি কিছুটা সহজ হয়েছে, যদিও দেশীয় উৎপাদকদের স্বার্থ রক্ষার বিষয়টিও বিবেচনায় রাখা হয়েছে। মসলাসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহে উৎসে কর বিভিন্ন ক্ষেত্রে ১ থেকে ৫ শতাংশের পরিবর্তে ০ দশমিক ৫ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, যা সরবরাহ ব্যবস্থার ব্যয় কমাতে এবং মূল্যস্ফীতির চাপ হ্রাস করতে সহায়তা করবে।
মৌসুমি চাহিদা বৃদ্ধি কিংবা সরবরাহ সংকটের সময় বাজার স্থিতিশীল রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোকে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের জন্য ঋণপত্র বা এলসি খোলার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ শিথিল করার নির্দেশ দিয়েছে।
বাজার তদারকি ও নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থা
রাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মতো প্রতিষ্ঠানগুলো চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জসহ বিভিন্ন পাইকারি বাজার নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে, যাতে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, সিন্ডিকেটভিত্তিক মূল্যবৃদ্ধি এবং মজুতদারি প্রতিরোধ করা যায়। বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশন অতীতে উল্লেখ করেছে যে অতিরিক্ত উচ্চ শুল্ক অনেক সময় মসলা চোরাচালানকে উৎসাহিত করে, যার ফলে সরকার রাজস্ব হারায়। যৌক্তিক শুল্কনীতি এবং সীমান্ত নিয়ন্ত্রণ জোরদারের মাধ্যমে মসলা বাণিজ্যকে বৈধ ও করযোগ্য ব্যবস্থার আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
সরকারি ও বেসরকারি উভয় পর্যায়ে সংস্কার এবং নীতিগত পরিবর্তন দেশীয় মসলা উৎপাদন বাড়াতে এবং আমদানিনির্ভরতা কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। তবে দেশীয় উৎপাদনের পূর্ণ সুফল পেতে ফসল কাটার পর ক্ষয়ক্ষতি কমানো, আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং সরবরাহ ব্যবস্থার উন্নয়নও সমানভাবে জরুরি। একটি সমন্বিত কাঠামোর মধ্যে উচ্চফলনশীল স্থানীয় বীজ উৎপাদন ও লক্ষ্যভিত্তিক বিতরণ, চাষের আগে, চলাকালে এবং পরে কৃষকদের সহায়তা, ফসল সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং তথ্যনির্ভর সরবরাহ ব্যবস্থার মাধ্যমে ভোক্তা পর্যায়ে পণ্য পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা অন্তর্ভুক্ত থাকতে হবে।
