শেখ সেলিম
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
দুর্ভিক্ষের দ্বারপ্রান্ত থেকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ ধান উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করেছে। দীর্ঘদিন ধরে এই সাফল্য প্রশংসিত হয়ে আসছে। তবে সেই অর্জনের সামনে এখন আরও কঠিন একটি প্রশ্ন দাঁড়িয়েছে: ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্যের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ কি পারবে, যখন কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমেই কমছে?
এই প্রশ্নের উত্তর বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের অগ্রগতিকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে। বিশেষ করে ক্ষুধা নির্মূলের লক্ষ্য নির্ধারণকারী টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ২ বা এসডিজি ২ অর্জনের ক্ষেত্রে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে নীল অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনাও খুঁজছে বাংলাদেশ। সেই বৃহত্তর আলোচনাকে সামনে আনাই এই লেখার উদ্দেশ্য।
জমি ও মানুষের হিসাব
বর্তমানে প্রায় ১৭ কোটি মানুষের বসবাস বাংলাদেশে। আয়তন ১ লাখ ৪৮ হাজার বর্গকিলোমিটারের সামান্য কম। ফলে বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ বৃহৎ দেশ। জন্মহারের বিভিন্ন অনুমান অনুযায়ী, ২০৫০ সালে দেশের জনসংখ্যা প্রায় ২০ কোটি ২০ লাখ থেকে ২১ কোটি ৫০ লাখের মধ্যে হতে পারে। অর্থাৎ ভবিষ্যতে বর্তমানের তুলনায় আরও কয়েক কোটি মানুষের খাদ্যের চাহিদা মেটাতে হবে।
অন্যদিকে, কৃষির জন্য উপযোগী জমির পরিমাণ স্থির নেই, বরং কমছে। বিভিন্ন গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে, ২০৩০ সালের মধ্যে আবাদযোগ্য জমি প্রায় ১০ শতাংশ এবং ২০৫০ সালের মধ্যে সর্বোচ্চ ২০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে। দ্রুত নগরায়ণ, শিল্পের বিস্তার, নদীভাঙন এবং উপকূলীয় এলাকায় মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধিই এর প্রধান কারণ।
জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং কৃষিজমি কমে যাওয়ার এই প্রবণতা বাংলাদেশের খাদ্যনিরাপত্তার মূল চ্যালেঞ্জকে স্পষ্ট করে। বিভিন্ন মডেলভিত্তিক হিসাব বলছে, ২০১০ থেকে ২০৫০ সালের মধ্যে চাল, গম ও ভুট্টার সম্মিলিত চাহিদা প্রায় এক-চতুর্থাংশ বাড়তে পারে। অথচ জমি, পানি ও মাটির সীমাবদ্ধতা দেশের অভ্যন্তরীণ উৎপাদন বাড়ানোর পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে।
বাংলাদেশে চালের উৎপাদন উদ্বৃত্ত থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। তবে গম, ডাল, ভোজ্যতেলসহ অন্যান্য খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে আমদানিনির্ভরতা অব্যাহত থাকবে। ফলে উৎপাদনশীলতা উল্লেখযোগ্যভাবে না বাড়লে খাদ্য আমদানির ব্যয়ও ক্রমে বাড়তে থাকবে।
অন্যভাবে বললে, আবাদযোগ্য জমি বাড়িয়ে প্রকৃত খাদ্যনিরাপত্তা অর্জন করা সম্ভব হবে না। কারণ নতুন করে কৃষির আওতায় আনার মতো জমি খুবই সীমিত। বরং বর্তমানে ব্যবহৃত জমি থেকে আরও বেশি পুষ্টি ও খাদ্যশক্তি উৎপাদন করতে হবে। পাশাপাশি খাদ্যাভ্যাসেও পরিবর্তন আনতে হবে, বিশেষ করে অতিরিক্ত চালনির্ভরতা কমিয়ে।
এসডিজি ২ ও বাস্তবতার হিসাব
২০৩০ সালের মধ্যে ক্ষুধা নির্মূল, সবার জন্য নির্ভরযোগ্য খাদ্যপ্রাপ্তি নিশ্চিত, পুষ্টির মান উন্নত এবং টেকসই কৃষি ব্যবস্থা গড়ে তোলার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে এসডিজি ২। বাংলাদেশ ধারাবাহিক পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা এবং দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্প ২০৪১-এর মধ্যেও এসব লক্ষ্যকে অন্তর্ভুক্ত করেছে। ১৯৯০-এর দশকের পর থেকে দেশে অপুষ্টিতে আক্রান্ত মানুষের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। খাদ্যশস্যের সামগ্রিক উৎপাদন বৃদ্ধিও এই অগ্রগতির বড় কারণ।
তবে দেশে ধান উৎপাদনে প্রায় স্বয়ংসম্পূর্ণতার যে চিত্র দেখা যায়, তার আড়ালে পরিবারভিত্তিক খাদ্যপ্রাপ্তির ক্ষেত্রে বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তা পরিমাপের প্রচলিত সূচক অনুযায়ী, উল্লেখযোগ্যসংখ্যক পরিবার এখনো মাঝারি বা তীব্র খাদ্যনিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছে।
শিশুদের খর্বাকৃতি বা বয়সের তুলনায় কম উচ্চতার হার কমলেও পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এখনো এই সমস্যায় আক্রান্ত। এই পরিসংখ্যান শুধু ক্যালরির ঘাটতি নয়, দীর্ঘমেয়াদি পুষ্টিহীনতারও ইঙ্গিত দেয়।
জনসংখ্যা ও কৃষিজমির বর্তমান প্রবণতা বিবেচনায় নিলে শুধু উৎপাদন বাড়ার মাধ্যমে প্রকৃত পুষ্টি নিশ্চিত করার ঘাটতি পূরণ হবে না। ২০৫০ সালের মধ্যে এসডিজি ২-এর লক্ষ্য বিশ্বাসযোগ্যভাবে অর্জন করতে হলে একসঙ্গে কয়েকটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি প্রয়োজন।
প্রথমত, ধানসহ প্রধান ও অপ্রধান সব ধরনের ফসলের হেক্টরপ্রতি উৎপাদন বাড়াতে হবে। দ্বিতীয়ত, ধাননির্ভরতা কমিয়ে ফসল ও খাদ্যাভ্যাসে প্রকৃত বৈচিত্র্য আনতে হবে। তৃতীয়ত, ফসল কাটার পর খাদ্য অপচয় কমাতে হবে। চতুর্থত, খাদ্যনিরাপত্তাহীন পরিবারগুলোর জন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা আরও শক্তিশালী করতে হবে।
শুধু ধান উৎপাদনে স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে খাদ্যনিরাপত্তার মাপকাঠি হিসেবে বিবেচনা করা যথেষ্ট নয়। বরং এমন ধারণা দেশের প্রকৃত অগ্রগতির চিত্রকে অতিরঞ্জিত করার ঝুঁকি তৈরি করে।
দ্বিতীয় সম্ভাবনার ক্ষেত্র নীল অর্থনীতি
এই জায়গাতেই সমুদ্রের বিষয়টি সামনে আসে। ২০১২ সালে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের বিশাল একচেটিয়া অর্থনৈতিক অঞ্চল ব্যবহারের সুযোগ তৈরি হয়। এরপর থেকে খাদ্য ও অর্থনৈতিক নিরাপত্তার নতুন ক্ষেত্র হিসেবে নীল অর্থনীতিকে গুরুত্ব দিতে শুরু করেছে সরকার।
সাম্প্রতিক বাজেটে নীল অর্থনীতি গবেষণা তহবিল গঠন এবং সামুদ্রিক খাতের উন্নয়নে বৃহত্তর অর্থায়নের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ২০৩০ সালের মধ্যে মৎস্য ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানি থেকে প্রায় ১০০ কোটি ডলার আয়ের লক্ষ্য ধরা হয়েছে।
পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার জাহাজ, মাতারবাড়ীতে আধুনিক বন্দর এবং মাছের প্রজনন ও সংরক্ষণের জন্য নতুন সামুদ্রিক সংরক্ষিত এলাকা গড়ে তোলা।
মিঠাপানি ও অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোর একটি। বিশেষজ্ঞরা গভীর সমুদ্রে মাছ আহরণ, সামুদ্রিক জীবপ্রযুক্তি এবং সামুদ্রিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণে বিলিয়ন ডলারের সম্ভাবনা দেখছেন।
এই বিষয়টি টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা ১৪-এর সঙ্গে সরাসরি যুক্ত হলেও এসডিজি ২-এর ক্ষেত্রেও এর গুরুত্ব কম নয়। সঠিকভাবে পরিচালিত নীল অর্থনীতি স্থলভিত্তিক খাদ্যপণ্যের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে প্রোটিনের উৎসে বৈচিত্র্য আনতে পারে, গ্রামীণ মানুষের জীবিকার সুযোগ বাড়াতে পারে এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় সক্ষমতা তৈরি করতে পারে।
তবে যথাযথ ব্যবস্থাপনা ছাড়া নীল অর্থনীতির সম্প্রসারণ বঙ্গোপসাগরের মৎস্যসম্পদের অতিরিক্ত আহরণের বর্তমান প্রবণতাকেই আরও তীব্র করতে পারে।
যে সরকারি পদক্ষেপগুলো সবচেয়ে জরুরি
বর্তমান পরিস্থিতিতে সরকারের তিনটি পদক্ষেপ বিশেষ গুরুত্ব পাওয়ার দাবি রাখে।
প্রথমত, কৃষি ভর্তুকির একটি বড় অংশ শুধু ধান উৎপাদনে কেন্দ্রীভূত না রেখে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর উপকরণ, মানসম্মত বীজ এবং ডাল, তেলবীজ ও সবজি চাষের মতো বহুমুখী কৃষিতে উৎসাহ দিতে হবে। কারণ কৃষিজমির পরিমাণ বাড়ানোর সুযোগ এখন আর বাস্তবসম্মত নয়।
দ্বিতীয়ত, বৈজ্ঞানিক ভিত্তিতে এবং নির্ধারিত আহরণসীমার মাধ্যমে সামুদ্রিক মৎস্যসম্পদ ব্যবস্থাপনা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে হবে। এর সঙ্গে নিয়মিত ও তাৎক্ষণিক মৎস্যসম্পদের মজুত মূল্যায়নের ব্যবস্থাও থাকতে হবে। নীল অর্থনীতির সম্প্রসারণ যেন খাদ্য ও আয় বাড়ায়, বঙ্গোপসাগরের সম্পদ নিঃশেষ না করে, সেই নিশ্চয়তা জরুরি।
তৃতীয়ত, কৃষিপণ্য সংরক্ষণ, হিমাগারভিত্তিক সরবরাহব্যবস্থা এবং খাদ্যনিরাপত্তার অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। ফসল কাটার পর খাদ্যের অপচয় কমানোর পাশাপাশি স্থল ও সমুদ্র উভয় উৎসের বৈচিত্র্যময় উৎপাদনকে বাজার ও ভোক্তার কাছে পৌঁছে দেওয়ার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন।
এই তিনটি ক্ষেত্রে অগ্রগতি ছাড়া বাংলাদেশের চিত্তাকর্ষক খাদ্য উৎপাদনের পরিসংখ্যান হয়তো কেবল একটি সংখ্যা হয়ে থাকবে। সেই সংখ্যা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার প্রকৃত সংকটের সমাধান না করে বরং তা আড়াল করার ঝুঁকি তৈরি করবে।
প্রায় ২৫ কোটি মানুষের দেশে পরিণত হওয়ার পথে বাংলাদেশকে তাই শুধু কত টন খাদ্য উৎপাদন হচ্ছে, সেই হিসাবের বাইরে তাকাতে হবে। কত মানুষ পর্যাপ্ত ও পুষ্টিকর খাদ্য পাচ্ছে, কৃষিজমি কতটা টেকসই থাকছে এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য খাদ্য ও জীবিকার নিরাপত্তা কতটা নিশ্চিত করা যাচ্ছে, সেই প্রশ্নগুলোই এখন সামনে আনতে হবে।
তথ্যসূত্র:
