শেখ সেলিম
অনিকেত রিসার্চ গ্রুপ
দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সম্পর্কের একটি হলো বাংলাদেশ ও ভারতের সম্পর্ক, যা এখন এক নির্ণায়ক পর্যায়ে পৌঁছেছে। নয়াদিল্লিতে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ-ভারত বাণিজ্যবিষয়ক যৌথ কর্মগোষ্ঠীর ১৬তম বৈঠকে ঢাকা স্পষ্ট ভাষায় অনুরোধ জানিয়েছে, নিম্ন আয়ের দেশের মর্যাদা থেকে উত্তরণের পরও যেন ভারতের বাজারে বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক প্রবেশাধিকার বহাল থাকে।
বাণিজ্যের নিয়মকানুন বদলাতে চলেছে। এই সময়ে রপ্তানি প্রতিযোগিতা রক্ষার বৃহত্তর চেষ্টারই অংশ এই অনুরোধ। এ লেখায় দুই দেশের বাণিজ্যের বর্তমান অবস্থা তুলে ধরা হয়েছে। আলোচনার ফলাফল বাংলাদেশের ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য কী অর্থ বহন করে, তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। আর বাংলাদেশের অর্থনীতি এবং ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে শক্তিশালী করতে পারে, এমন প্রধান সংস্কারগুলোও চিহ্নিত করা হয়েছে।
পাশের বাজার, সম্ভাবনা অফুরান
বাংলাদেশের বড় বাণিজ্য অংশীদারদের মধ্যে ভারত অন্যতম, আর আঞ্চলিক আমদানির সবচেয়ে বড় উৎসও দেশটি। তুলা, সুতা, মসলা, খাদ্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল প্রতিদিন সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশের কারখানা ও ঘরে ঘরে পৌঁছায়। বিপরীতে বাংলাদেশ ভারতে পাঠায় তৈরি পোশাক, পাটজাত পণ্য, প্রক্রিয়াজাত খাদ্য, প্লাস্টিক ও ওষুধ। ভৌগোলিক অবস্থান দুই পক্ষেরই সুবিধা করে দিয়েছে। কম সময়ে পণ্য পৌঁছানো যায়, পরিবহন খরচ কম, সাংস্কৃতিক পরিচিতিও আছে। ফলে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের পক্ষে বাণিজ্য করা সহজ হয়।
তবু বাণিজ্যের ভারসাম্য একপেশে। বাংলাদেশ ভারত থেকে যত কেনে, বিক্রি করে তার চেয়ে অনেক কম। নীতিনির্ধারকদের কাছে এই ঘাটতি বহুদিনের উদ্বেগের কারণ। চাহিদা তো আগে থেকেই আছে, তাই ঘাটতি কমাতে হলে আসল কাজ হলো বাংলাদেশি পণ্য ভারতীয় ক্রেতাদের কাছে নির্বিঘ্নে পৌঁছানোর পথের বাধাগুলো সরানো।
সুবিধা কমে আসছে, রপ্তানি আয় বাঁচানোর প্রশ্ন
নিম্ন আয়ের দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ জাতীয় গর্বের বিষয়। কিন্তু এর বাণিজ্যিক মূল্যও দিতে হবে, কারণ শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত অনেক সুবিধা ক্রমে হারিয়ে যাবে। ভারতের বাজারে সাফটা চুক্তির আওতায় বাংলাদেশ এখন যে শুল্কসুবিধা পায়, তা ধরে রাখার অনুরোধ করেছে ঢাকা। রপ্তানিকারকদের জন্য শূন্য শুল্ক আর স্বাভাবিক শুল্কের ব্যবধানই অনেক সময় ঠিক করে দেয় একটি ক্রয়াদেশ হাতে আসবে নাকি হাতছাড়া হবে। পোশাক প্রস্তুতকারক, পাটকল মালিক ও খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকারীরা কাজ করেন অল্প মুনাফার ওপর ভর করে। শুল্ক সামান্য বাড়লেও ক্রেতারা ভিয়েতনাম বা শ্রীলঙ্কার প্রতিযোগীদের দিকে ঝুঁকতে পারেন।
অগ্রাধিকারমূলক সুবিধা অব্যাহত থাকলে ব্যবসায়ীরা নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়া, পণ্যের বৈচিত্র্য আনা ও উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর সময় পাবেন। একই সঙ্গে বার্তাও যাবে যে বাংলাদেশের অগ্রগতিকে ভারত প্রতিযোগিতার হুমকি হিসেবে নয়, আঞ্চলিক সাফল্য হিসেবে দেখছে।
শুল্কের বাইরের বাধা দূর করা
আলোচনা শুধু শুল্কে সীমাবদ্ধ থাকেনি। স্থলবন্দর নিষেধাজ্ঞা ও অশুল্ক বাধা তুলে নেওয়ার ওপর জোর দিয়েছে বাংলাদেশ। রপ্তানিকারকদের জন্য এসব বাধা অনেক ক্ষেত্রে শুল্কের চেয়েও ক্ষতিকর। পরীক্ষার শর্ত, সনদ পেতে দেরি এবং অসংগতিপূর্ণ প্রক্রিয়ায় খরচ বাড়ে, অনিশ্চয়তাও তৈরি হয়। ঢাকা পণ্যের মানদণ্ডে সামঞ্জস্য, পারস্পরিক স্বীকৃতি এবং ভারতীয় মান সংস্থার (বিআইএস) সনদ পাওয়ার প্রক্রিয়া সহজ করার দাবি জানিয়েছে। কারণ বারবার অনুমোদন নেওয়ার খরচ ছোট রপ্তানিকারকদের জন্য বিশেষভাবে বোঝা হয়ে দাঁড়ায়।
পাটজাত পণ্য ও পিইটি ফিল্মের ওপর আরোপিত অ্যান্টি-ডাম্পিং শুল্ক প্রত্যাহারের আহ্বানও জানিয়েছে বাংলাদেশ। পাটশিল্পের ওপর কৃষক, ব্যবসায়ী ও মিলশ্রমিক সবাই নির্ভর করেন। তাই এসব বিরোধের নিষ্পত্তি হলে ভারতের বাজারে বিনিয়োগ করা উৎপাদকদের আস্থা ফিরবে।
সীমান্ত ও যোগাযোগের উন্নয়ন
নীতির পাশাপাশি অবকাঠামোর ওপরও বাণিজ্য নির্ভর করে। ভারতের স্থল শুল্ক স্টেশনগুলো উন্নয়নের প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। প্রস্তাবে আছে ভালো সংযোগ সড়ক, পার্কিং ইয়ার্ড, গুদাম এবং পরিদর্শন ও কোয়ারেন্টিন সুবিধা। সীমান্তে জট লাগলে ট্রাক আটকে থাকে, পচনশীল পণ্য নষ্ট হয়, খরচ বাড়ে দুই পক্ষেরই। দ্রুত পণ্য ছাড় হলে বাংলাদেশি পণ্যের প্রতিযোগিতা-সক্ষমতা বাড়বে।
নেপাল ও ভূটানে যাওয়ার জন্য ভারতীয় ভূখণ্ড দিয়ে ট্রাক চলাচলের সুযোগ বাড়ানোর কথাও বলছে ঢাকা। তাতে আরও দুটি বাজারের দরজা খুলবে। আখাউড়া-আগরতলা পথ, রেল যোগাযোগ এবং সীমান্ত হাট নিয়েও আলোচনা হয়েছে। সীমান্ত হাট ছোট পরিসরের বাণিজ্য ও স্থানীয় মানুষের জীবিকা টিকিয়ে রাখে।
ভারতের অগ্রাধিকার ও সমঝোতার সুযোগ
আলোচনা একতরফা ছিল না। ভারতও নিজেদের দাবি তুলেছে। এর মধ্যে আছে কিছু স্থলবন্দর দিয়ে সুতা ও অন্যান্য পণ্য বাংলাদেশে রপ্তানিতে বিধিনিষেধ তুলে নেওয়া এবং দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলের রাজ্যগুলো থেকে রপ্তানির পথে থাকা বাধা। এসব উদ্বেগ গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা উচিত। বাংলাদেশের স্পিনার ও পোশাক প্রস্তুতকারকেরা ভারতীয় সুতার ওপর নির্ভরশীল, তাই সুতা পাওয়ার নিশ্চয়তা বাংলাদেশের শিল্পের জন্যও লাভজনক। দুই পক্ষ যদি পারস্পরিকভাবে বিধিনিষেধ শিথিল করে ভারসাম্যপূর্ণ সমঝোতায় পৌঁছায়, তাহলে আস্থা বাড়বে। দুই সরকারই নিজ নিজ ব্যবসায়ী সমাজের সামনে জোরালো বক্তব্য রাখতে পারবে।
সম্পর্কের চেহারা বদলে দিতে পারে পাঁচ সংস্কার
কয়েকটি সংস্কারের সম্ভাবনা বিশেষভাবে চোখে পড়ে। উত্তরণের পরও সাফটার শুল্কসুবিধা ধরে রাখা গেলে এই স্পর্শকাতর সময়ে রপ্তানি আয় ও কর্মসংস্থান সুরক্ষিত থাকবে। মানদণ্ডে সামঞ্জস্য এবং সনদের পারস্পরিক স্বীকৃতি মিললে নিয়মপালনের খরচ কমবে, পণ্য দ্রুত পৌঁছাবে। স্থলবন্দরের নিষেধাজ্ঞা তুলে নিয়ে শুল্ক স্টেশন আধুনিক করলে বাণিজ্যের বাস্তব সক্ষমতা বাড়বে। অ্যান্টি-ডাম্পিং বিরোধের সমাধান হলে পাটের মতো খাতে স্থিতিশীলতা ফিরবে। আর ট্রানজিট ও যোগাযোগের পরিধি বাড়লে উপ-অঞ্চলের অর্থনৈতিক বন্ধন আরও দৃঢ় হবে।
এসব সংস্কার এগোলে বাংলাদেশের বাণিজ্যের জন্য ফল হবে হাতেনাতে। রপ্তানিকারকেরা কম খরচ ও বেশি নিশ্চয়তা পাবেন, আমদানিকারকেরা কাঁচামালের সরবরাহ পাবেন আরও সহজে, আর সীমান্তের ছোট ব্যবসায়ীরা উন্নত সুবিধার সুফল পাবেন। সময়ের সঙ্গে আরও উন্মুক্ত বাণিজ্য সম্পর্ক লজিস্টিকস, গুদামজাতকরণ ও উৎপাদন খাতে বিনিয়োগ টেনে আনতে পারে। এতে যেসব অঞ্চলের কর্মসংস্থান দরকার, সেখানে নতুন কাজের সুযোগ তৈরি হবে। শক্তিশালী বাণিজ্য অংশীদারত্ব অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যের প্রবণতাও কমাবে, ফলে আরও বেশি লেনদেন আসবে আনুষ্ঠানিক ও করযোগ্য অর্থনীতির আওতায়।
আলোচনা থেকে স্থায়ী সহযোগিতায়
যৌথ কর্মগোষ্ঠী হয়তো তুলনামূলক ছোট একটি মঞ্চ, কিন্তু বাস্তব সমস্যার সমাধান হয় এখানেই। দুই প্রতিনিধিদলই প্রস্তাব তুলে ধরতে এবং একে অপরের উদ্বেগ শুনতে ইচ্ছুক, যা আশাব্যঞ্জক। অর্থনৈতিক মর্যাদা বদলের সময়েও ভারতের বাজার খোলা রাখতে চায় বাংলাদেশ। আর স্থিতিশীল বাংলাদেশে ভারত পাবে একজন নির্ভরযোগ্য প্রতিবেশী এবং ক্রমবর্ধমান ভোক্তা বাজার।
বাণিজ্য সম্পর্ক সহযোগিতার অভ্যাস গড়ে তোলে, যা জ্বালানি, পরিবহন ও নিরাপত্তা পর্যন্ত ছড়ায়। দুই সরকার এসব সংস্কারে প্রতিশ্রুতি রক্ষা করলে অংশীদারত্ব আরও টেকসই হবে এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাংলাদেশকে উত্তরণের পথ পার করাতে সাহায্য করবে।
