নাঈমা অনামিকা
কমিশনিং সম্পাদক, অনিকেত বুলেটিন
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত সামাজিক রীতি-নীতি ও প্রথাগত মূল্যবোধ নারীদের জীবন, অধিকার এবং সুযোগ-সুবিধার ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। বহু ক্ষেত্রে এসব সামাজিক নিয়ম নারীর ব্যক্তিস্বাধীনতা, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন এবং সামাজিক অংশগ্রহণকে সীমাবদ্ধ করে, যা মানবাধিকারের মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
একই সঙ্গে এসব বৈষম্যমূলক সামাজিক কাঠামো জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (SDGs), বিশেষ করে এসডিজি-৫ (লিঙ্গসমতা ও নারীর ক্ষমতায়ন) লক্ষ্য অর্জনের পথে অন্যতম বড় বাধা হিসেবে কাজ করছে। বিষয়টির বিস্তারিত আলোচনায় যে দিকটি সবার আগে আমাদের জানা প্রয়োজন, তা হল, গ্রামীণ নারীদের বর্তমান অবস্থান বা তাদের জীবন ব্যবস্থা। কেমন কাটছে তাদের জীবন, কোন কোন দিক থেকে তারা বৈষম্য, প্রতিবন্ধকতা এবং প্রতিকূলতার শিকার। আসুন জেনে নেই।
পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক কাঠামোর প্রভাব
বাংলাদেশের অধিকাংশ গ্রামীণ এলাকায় এখনো পিতৃতান্ত্রিক সামাজিক ব্যবস্থা প্রভাবশালী। এই ব্যবস্থায় পুরুষকে পরিবারের প্রধান সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী ও উপার্জনকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অন্যদিকে নারীদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ থাকে গৃহস্থালি কাজ ও পারিবারিক দায়িত্ব পালনের মধ্যে।
বিভিন্ন গবেষণা ও জরিপে দেখা গেছে, দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষ নারীদের নেতৃত্ব, ব্যবসা পরিচালনা কিংবা রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সক্ষমতা সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা পোষণ করেন। উদ্বেগজনক বিষয় হলো, অনেক নারীও দীর্ঘদিনের সামাজিকীকরণের ফলে নিজেদের সক্ষমতা সম্পর্কে একই ধরনের সীমাবদ্ধ মানসিকতা ধারণ করেন। ফলে বৈষম্যমূলক সামাজিক এই বিশ্বাসগুলোর প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এই মানসিকতা এবং পরিস্থিতির কারণে নারীদের চলাফেরা, শিক্ষা গ্রহণ, কর্মসংস্থান এবং জনজীবনে অংশগ্রহণের সুযোগ অনেক ক্ষেত্রে সীমিত হয়ে পড়ে।
মানবাধিকার লঙ্ঘনের বহুমাত্রিক চিত্র
গ্রামীণ নারীদের জীবনে সামাজিক বৈষম্যের প্রভাব শুধু সাংস্কৃতিক বা সামাজিক নয়; এটি মানবাধিকার লঙ্ঘনের একটি সুস্পষ্ট রূপ। নারীরা পুরুষদের তুলনায় বহুগুণ বেশি সময় অবৈতনিক গৃহস্থালি ও পরিচর্যামূলক কাজে ব্যয় করেন। শ্রমবাজারে নারীদের অংশগ্রহণ তুলনামূলকভাবে কম এবং একই ধরনের কাজের ক্ষেত্রেও তারা প্রায়শই কম মজুরি পেয়ে থাকেন। জমি ও সম্পত্তির মালিকানায় নারীদের অংশগ্রহণ অত্যন্ত সীমিত, যা তাদের অর্থনৈতিক স্বাধীনতা ও নিরাপত্তাকে দুর্বল করে।
অন্যদিকে, বাল্যবিবাহ এখনো গ্রামীণ সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা। অল্প বয়সে বিবাহের কারণে অসংখ্য কিশোরী শিক্ষাজীবন থেকে ছিটকে পড়ে এবং সেখান থেকেই তাদের সকল সম্ভাবনার বন্ধ হয়ে যায়। একই সঙ্গে এটি নারীর পরনির্ভরশীলতা ও লিঙ্গভিত্তিক বৈষম্যকে আরও শক্তিশালী করে। নারীর প্রতি সহিংসতাও একটি গুরুতর মানবাধিকার সংকট। শারীরিক, মানসিক ও যৌন নির্যাতনের ঘটনা বহু নারীকে প্রতিনিয়ত ঝুঁকির মধ্যে রাখছে। যদিও নারীর অধিকার সুরক্ষায় বিভিন্ন আইন প্রণয়ন করা হয়েছে, তবে আইন প্রয়োগের দুর্বলতা, সামাজিক চাপ এবং বিচারপ্রাপ্তির সীমাবদ্ধতা অনেক ভুক্তভোগীকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত করছে।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সংঘাত
গ্রামীণ নারীদের বর্তমান পরিস্থিতি জাতিসংঘ ঘোষিত একাধিক টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এসডিজি-৫ অনুযায়ী নারীর প্রতি সকল ধরনের বৈষম্য ও সহিংসতা বন্ধ করা, বাল্যবিবাহের মতো ক্ষতিকর প্রথার অবসান ঘটানো এবং অবৈতনিক গৃহস্থালি কাজের স্বীকৃতি নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
কিন্তু বাস্তবে গ্রামীণ এলাকায় এসব চ্যালেঞ্জ এখনো ব্যাপকভাবে বিদ্যমান। একইভাবে, এসডিজি-১ (দারিদ্র্য বিমোচন) অর্জন বাধাগ্রস্ত হয় যখন নারীরা ভূমি, ঋণ ও প্রযুক্তিগত সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। এসডিজি-৪ (মানসম্মত শিক্ষা) ক্ষতিগ্রস্ত হয় বাল্যবিবাহ ও দারিদ্র্যের কারণে মেয়েদের বিদ্যালয় ত্যাগের ফলে। আর এসডিজি-১০ (বৈষম্য হ্রাস) বাস্তবায়নও কঠিন হয়ে পড়ে যখন বিপুলসংখ্যক নারী অনানুষ্ঠানিক ও অনিরাপদ কর্মসংস্থানে সীমাবদ্ধ থাকেন। সঙ্গত কারণেই এই পর্যায়ে প্রশ্ন আসে, চলমান এই পরিস্থিতিকে পরিবর্তন এবং সংশোধনে করনীয় কি! কি ধরণের উদ্যোগ গ্রহণ করলে একটি ফলপ্রসূ ইতিবাচক পরিবর্তন আসতে পারে?
পরিবর্তনের সম্ভাব্য পথ ও করণীয়
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য বহুমাত্রিক ও সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। প্রথমত, শিক্ষা ব্যবস্থায় লিঙ্গসংবেদনশীলতা ও মানবাধিকারভিত্তিক মূল্যবোধ অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যাতে নতুন প্রজন্ম সমতাভিত্তিক সমাজ গঠনে ভূমিকা রাখতে পারে। দ্বিতীয়ত, স্থানীয় সম্প্রদায়, সামাজিক সংগঠন এবং ধর্মীয় নেতাদের সম্পৃক্ত করে নারীর অধিকার বিষয়ে ইতিবাচক সামাজিক সচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।
তৃতীয়ত, আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও বিচারব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক করতে হবে, যাতে নারী নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিরা দ্রুত ও ন্যায়সঙ্গত বিচার পান। চতুর্থত, নারীদের অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নের জন্য জমি, ঋণ, প্রযুক্তি ও বাজারে প্রবেশাধিকারের সুযোগ বাড়াতে হবে। পাশাপাশি গ্রামীণ মেয়েদের শিক্ষার ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করতে বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, দারিদ্র্য হ্রাস এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি জোরদার করা জরুরি।
উপসংহার
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজে প্রচলিত বৈষম্যমূলক সামাজিক রীতি-নীতি শুধু নারীর ব্যক্তিগত উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্ত করছে না; বরং তা মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং জাতীয় উন্নয়নের পথেও বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। নারীর সমঅধিকার নিশ্চিত না হলে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা অর্জনও অসম্ভব হয়ে উঠবে। তাই রাষ্ট্র, সমাজ এবং পরিবার, সব পর্যায়ে সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নারীবান্ধব সামাজিক পরিবেশ গড়ে তোলাই হতে পারে একটি ন্যায়ভিত্তিক, অন্তর্ভুক্তিমূলক বাংলাদেশের ভিত্তি।
