মেহরান সাজ্জাদ
নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি
“বাংলাদেশের টেকসই কৃষি রূপান্তরের পথ” শীর্ষক লেখার ধারাবাহিকতায়। অনিকেত বুলেটিন, ৬ জুন ২০২৬।
মূল লেখাটিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের কৃষির পরবর্তী পর্যায়ের সাফল্য নির্ভর করবে শুধু উৎপাদন বাড়ানোর লক্ষ্য থেকে সরে এসে টেকসই ও অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃষির দিকে যাওয়ার ওপর। জমি ও সম্পদের মালিকানায় নারী ও পুরুষের বৈষম্য, খণ্ডিত জমি এবং তরুণদের কৃষি ছেড়ে চলে যাওয়ার প্রবণতাকে সেখানে এই পরিবর্তনের পথে বড় মানবসম্পদগত দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
বাংলাদেশের সঙ্গে মালয়েশিয়ার তুলনা করলে অন্তর্ভুক্তিমূলক কৃষি সংস্কারের জন্য কী ধরনের পরিবর্তন দরকার, আর বাংলাদেশের বর্তমান সংস্কার পরিকল্পনায় কোথায় ঘাটতি রয়েছে, তা আরও পরিষ্কারভাবে দেখা যায়। দুই দেশের কৃষির ভিত্তি এক নয়। মালয়েশিয়া বাংলাদেশের তুলনায় আগে কৃষির বাণিজ্যিক ও শিল্পভিত্তিক রূপান্তর ঘটিয়েছে এবং তাদের কৃষি অর্থনীতি গড়ে উঠেছে ভিন্ন ধরনের ফসলকে কেন্দ্র করে। সেই অভিজ্ঞতা বাংলাদেশের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আনে।
দুই দেশের ভিন্ন সূচনা
বাংলাদেশের কৃষির অগ্রগতি মূলত ছোট কৃষকের ধান চাষকে ঘিরে গড়ে উঠেছে। সময়ের সঙ্গে উৎপাদন বাড়াতে গিয়ে এই ব্যবস্থা দেশকে খাদ্যশস্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতার দিকে নিয়ে গেছে। কিন্তু একই সঙ্গে লাখো কৃষক ছোট ও বিচ্ছিন্ন জমিতে চাষ করেন, ফলে বাজারে দর-কষাকষির ক্ষমতা তাঁদের সীমিত।
মালয়েশিয়া ভিন্ন পথে এগিয়েছে। সেখানে বিশেষ করে পাম অয়েলকে কেন্দ্র করে বড় আকারের বাগানভিত্তিক কৃষি গড়ে ওঠে। বিভিন্ন প্রকল্পের মাধ্যমে ছোট কৃষকদেরও সেই ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। পুনর্বাসিত কৃষক পরিবারগুলোকে জমি, ঋণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণ সুবিধার সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
বাংলাদেশে খণ্ডিত জমিকে এখনো একটি সমাধানযোগ্য সমস্যা হিসেবে দেখা হয়। মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, জমি একত্রিত করলেও নতুন ধরনের বৈষম্য তৈরি হতে পারে। বড় আকারের বাগানভিত্তিক কৃষিতে অর্থনৈতিক সুবিধার বড় অংশ জমির মালিক ও বড় উৎপাদকদের হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি থাকে। ছোট কৃষক ও ভূমিহীন শ্রমিকরা সেখানে পিছিয়ে পড়তে পারেন।
নারী ও সম্পদের মালিকানা
বাংলাদেশের মূল লেখায় জমি, ঋণ ও কৃষি উপকরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে নারীর দীর্ঘস্থায়ী বৈষম্যকে একটি বড় দুর্বলতা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। সমান সুযোগ নিশ্চিত করার নীতির মাধ্যমে এই ব্যবধান কমানোর কথা বলা হয়েছে।
মালয়েশিয়াতেও একই ধরনের সমস্যা দেখা গেছে, যদিও তার রূপ কিছুটা ভিন্ন। দেশটির বিভিন্ন ছোট কৃষক প্রকল্পে জমির মালিকানা অনেক সময় পরিবারের পুরুষ সদস্যের নামে নিবন্ধিত হয়েছে। ফলে কৃষিকাজে নারীরা উল্লেখযোগ্য শ্রম দিলেও তাঁদের আনুষ্ঠানিক মালিকানা সীমিত থেকেছে। ছোট আকারের পাম অয়েল চাষ ও খাদ্যশস্য উৎপাদনেও এই চিত্র দেখা গেছে।
দুই দেশের অভিজ্ঞতার মধ্যে একটি মিল স্পষ্ট। কৃষি উৎপাদনের বৃদ্ধি অনেক সময় নারীর সমান অংশীদারত্ব নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয় আইন ও প্রশাসনিক সংস্কারের চেয়ে দ্রুত এগিয়েছে। ফলে নারী কৃষিতে অবদান রাখলেও সম্পদ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সমান অংশীদার হয়ে উঠতে পারেননি।
তরুণ, অভিবাসন ও মানবসম্পদ
বাংলাদেশের তরুণরা কৃষি ছেড়ে শহর ও বিদেশে কাজের দিকে যাচ্ছে। মালয়েশিয়াও এক প্রজন্ম আগে একই ধরনের পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। শিল্পায়নের সময় দেশটির গ্রামীণ তরুণদের বড় অংশ উৎপাদনশিল্প ও সেবা খাতে চলে যায়।
মালয়েশিয়া কৃষিতে যান্ত্রিকীকরণ বাড়ানোর পাশাপাশি কৃষিভিত্তিক ব্যবসা, কারিগরি শিক্ষা ও প্রশিক্ষণে বিনিয়োগ করেছে। রপ্তানিমুখী কৃষিপণ্যের সঙ্গে এসব প্রশিক্ষণকে যুক্ত করা হয়েছিল। ফলে কৃষিকাজে যুক্ত মানুষের সংখ্যা কমলেও উৎপাদনশীলতা ধরে রাখা সম্ভব হয়েছে।
বাংলাদেশের মূল লেখাতেও গ্রামীণ তরুণদের জন্য কারিগরি শিক্ষা, কৃষিভিত্তিক ব্যবসার প্রশিক্ষণ এবং ডিজিটাল দক্ষতা বাড়ানোর কথা বলা হয়েছে। তবে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা দেখায়, শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে কাজ হবে না। কৃষিতে সত্যিকারের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি করতে হবে। তরুণদের সামনে যদি কৃষিতে ভালো আয়ের পথ না থাকে, তাহলে প্রশিক্ষণ শেষ করে তাঁরাও অন্য খাতে চলে যাবেন।
টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যের সঙ্গে তুলনা
কৃষির সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত এসডিজির কয়েকটি লক্ষ্য, যেমন ক্ষুধা দূর করা, টেকসই উৎপাদন বাড়ানো এবং বৈষম্য কমানো, বাস্তবায়নে মালয়েশিয়ার অগ্রগতি তার মধ্যম আয়ের দেশের অবস্থান এবং আগের কাঠামোগত পরিবর্তনের সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে পাম অয়েলের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং শ্রমিকের অধিকার ও পরিবেশগত প্রভাব নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ের সমালোচনা দেশটির কৃষি রূপান্তরের কিছু সীমাবদ্ধতাও সামনে এনেছে।
বাংলাদেশ তার কৃষি রূপান্তরের তুলনামূলকভাবে আগের পর্যায়ে রয়েছে। খাদ্যনিরাপত্তায় অর্জিত অগ্রগতি ক্ষুধা ও খাদ্যসংক্রান্ত এসডিজি লক্ষ্য পূরণে সহায়তা করেছে। কিন্তু মূল লেখায়ও স্বীকার করা হয়েছে, অন্তর্ভুক্তিমূলক ও পরিবেশবান্ধব কৃষির ক্ষেত্রে এখনো বড় ঘাটতি রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়ানো, ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ এবং কৃষিঋণ ও জমিতে সমান সুযোগের প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
দুই দেশের তুলনা তাই শুধু কে কতটা এগিয়ে, সেই হিসাব নয়। দুই দেশের কৃষি রূপান্তরের পথ কাঠামোগতভাবেই আলাদা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে অন্তর্ভুক্তির ব্যর্থতা দীর্ঘস্থায়ী ছোট কৃষকের দারিদ্র্যকে আরও বাড়িয়ে দিতে পারে। মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতায় বড় কৃষি ব্যবস্থার মধ্যে সম্পদ কেন্দ্রীভূত হওয়ার ঝুঁকি বেশি স্পষ্ট।
বাংলাদেশের কোন সংস্কারগুলো আগে দরকার
এই তুলনা বাংলাদেশের জন্য কয়েকটি নির্দিষ্ট সংস্কারের প্রয়োজন সামনে আনে। জমির মালিকানা সুরক্ষিত করা এবং স্বেচ্ছায় জমি ইজারা দেওয়ার সুযোগ বাড়ানোর পাশাপাশি নারীর যৌথ মালিকানা নিশ্চিত করার বিষয়টিও নীতিতে স্পষ্টভাবে যুক্ত করা দরকার। মালয়েশিয়ার ছোট কৃষক প্রকল্পগুলোতে দীর্ঘদিন যে মালিকানা বৈষম্য ছিল, বাংলাদেশ সেই অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিতে পারে।
গ্রামীণ তরুণদের জন্য কারিগরি ও কৃষিভিত্তিক ব্যবসার প্রশিক্ষণের সঙ্গে বাস্তব আয় বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করতে হবে। সমবায়ের মাধ্যমে কৃষিপণ্য একত্র করা এবং প্রক্রিয়াজাতকরণে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। শুধু প্রশিক্ষণ দিয়ে যদি বাজার ও আয়ের সুযোগ তৈরি না করা হয়, তাহলে সেই প্রশিক্ষণ তরুণদের কৃষিতে ধরে রাখার বদলে অন্য খাতে যাওয়ার পথ আরও সহজ করে দিতে পারে।
ধানের বাইরে কৃষিপণ্যের বৈচিত্র্য বাড়ানোও মূল লেখার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তাব। তবে এখানে মালয়েশিয়ার অভিজ্ঞতা থেকে সতর্ক হওয়া দরকার। নতুন কৃষিপণ্য ও জলজ চাষের প্রসার যেন কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানের হাতে কেন্দ্রীভূত না হয়। ফল, মাছ, উচ্চমূল্যের কৃষিপণ্যসহ নতুন খাতের সম্প্রসারণের সুফল যেন বড় সংখ্যক ছোট কৃষক পান, সেই ব্যবস্থা করতে হবে।
কৃষি, স্বাস্থ্য, পানি ও পরিবেশকে নিয়ে সমন্বিত বহু পক্ষের প্ল্যাটফর্ম গঠনের যে পরিকল্পনা মূল লেখায় প্রস্তাব করা হয়েছে, সেখানেও নারী ও তরুণদের অংশগ্রহণ আলাদাভাবে মাপার ব্যবস্থা থাকা দরকার। এসডিজি অগ্রগতি পরিমাপের সময় শুধু উৎপাদন কত বাড়ল, তা দেখলে হবে না। সেই উৎপাদন বৃদ্ধির সুফল কারা পেলেন, সেই প্রশ্নও হিসাবের মধ্যে আনতে হবে।
উপসংহার
বাংলাদেশ ও মালয়েশিয়া ভিন্ন কৃষিভিত্তি, ভিন্ন ফসল এবং ভিন্ন অর্থনৈতিক বাস্তবতা থেকে কৃষির রূপান্তরের পথে এসেছে। কিন্তু দুই দেশের অভিজ্ঞতা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আনে। কৃষি উৎপাদন বাড়া বা কাগজে এসডিজির লক্ষ্য পূরণ হওয়া মানেই নারী, তরুণ ও ছোট কৃষকের জন্য সমান সুযোগ তৈরি হওয়া নয়।
বাংলাদেশের কৃষি সংস্কারের পরিকল্পনায় এসব ঘাটতি ইতিমধ্যে চিহ্নিত হয়েছে। এখন প্রয়োজন জমির অধিকার, কৃষিঋণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সংস্কারগুলো এমনভাবে সাজানো, যাতে কৃষির প্রবৃদ্ধির শুরু থেকেই অন্তর্ভুক্তি তার অংশ হয়ে থাকে। বৈষম্য ও সম্পদ কেন্দ্রীভবন তৈরি হওয়ার পর তা সংশোধনের চেষ্টা করার চেয়ে শুরু থেকেই কাঠামোর মধ্যে সমান অংশগ্রহণের সুযোগ রাখা অনেক বেশি কার্যকর।
তথ্যসূত্র:
